১০ জুলাই ২০২৬, ২১:৩০

মাদ্রাসায় এমপিওভুক্ত শিক্ষক ১৪, আড়াইশ শিক্ষার্থীর মধ্যে আসে ১০-১২ জন, ২ ক্লাসে মিলল ৩ ছাত্রী

শামসুন্নাহার মোহাম্মদিয়া মহিলা দাখিল মাদ্রাসা  © টিডিসি ফটো

কাগজে-কলমে শত শত শিক্ষার্থীর নাম থাকলেও বাস্তবে শ্রেণিকক্ষ প্রায় ফাঁকা। কোথাও শিক্ষকের চেয়ে শিক্ষার্থী কম, কোথাও আবার নেই একজন শিক্ষার্থীও। তবু মাস শেষে নিয়মিত সরকারি কোষাগার থেকে বেতন-ভাতা তুলছেন শিক্ষকরা। জামালপুরের কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরেজমিন অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, কাগুজে শিক্ষার্থী দেখিয়ে সরকারি অর্থ অপচয় এবং শিক্ষা কার্যক্রমে চরম অনিয়মের উদ্বেগজনক চিত্র।

সরেজমিনে জেলা শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরের বীর গোবিন্দবাড়ি এলাকার শামসুন্নাহার মোহাম্মদিয়া মহিলা দাখিল মাদ্রাসায় গিয়ে দেখা যায়, গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতির পরপরই কয়েকজন শিক্ষক দ্রুত শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করে পাঠদান শুরু করেন। তবে সে সময়ও প্রতিষ্ঠানটির কয়েকটি কক্ষ তালাবদ্ধ ছিল।

ষষ্ঠ শ্রেণির কক্ষে গিয়ে দেখা যায়, একজন শিক্ষক একজন শিক্ষার্থীকে পাঠদান করছেন। পাশের আরেকটি কক্ষে একটি বেঞ্চে বসে তিনজন শিক্ষার্থী অঙ্কের ক্লাস করছে। নবম ও দশম শ্রেণিতেও উপস্থিতি ছিল খুবই কম। সেখানে একজন শিক্ষক দুইজন ছাত্রীকে পাঠদান করছিলেন।

প্রতিষ্ঠানটির বাইরে দৃষ্টিনন্দন প্রবেশদ্বার ও সীমানা প্রাচীর থাকলেও ভেতরের চিত্র ছিল ভিন্ন। অধিকাংশ শ্রেণিকক্ষের অবকাঠামো জরাজীর্ণ। কোথাও জানালা নেই, আবার কোথাও দরজা ভাঙা অবস্থায় দেখা গেছে।

এই মাদ্রাসায় সরকারি বেতনভুক্ত এমপিও শিক্ষক আছেন ১৪ জন। কিন্তু বাস্তবে প্রতিদিন যতজন শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকে, তা শিক্ষকের সংখ্যার চেয়েও কম। অথচ নথিপত্রে এখানে ২৩৬ জন শিক্ষার্থী দেখানো হয়েছে। প্রতিদিন সব মিলিয়ে ক্লাসে উপস্থিত থাকেন ১০ থেকে ১২ জন শিক্ষার্থী।

সরেজমিনে দেখা যায়, এমপিওভুক্ত কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চেয়ে নন-এমপিও প্রতিষ্ঠানের দৃশ্যপট আরও উদ্বেগজনক। জামালপুর শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে উপজেলার শাহবাজপুরের উত্তর কৈডোলা স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসায় গিয়ে দেখা যায় এক জরাজীর্ণ চিত্র। দূর থেকে দেখলে মনে হবে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত বা দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত কোনো ঘর। জরাজীর্ণ টিনের ঘরে নেই কোনো আসবাবপত্র বা ব্ল্যাকবোর্ড, নেই কোনো পাঠদান কার্যক্রম। অথচ সরকারি নথিপত্রে এই মাদ্রাসায় শতাধিক শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত দেখানো হয়েছে। এই ভুয়া শিক্ষার্থী সংখ্যার ওপর ভিত্তি করেই প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে এমপিওভুক্তির (মাসিক পেমেন্ট অর্ডার) জন্য আবেদন জানিয়েছে।

অনুপস্থিতির বিষয়টি স্বীকার করে শামসুন্নাহার মোহাম্মদিয়া মহিলা দাখিল মাদ্রাসার সুপার লুৎফর রহমান বলেন, প্রতিষ্ঠানটিতে এখনো সরকারি ভবন হয়নি। জরাজীর্ণ টিনশেড ঘরেই পাঠদান করতে হয়। বৃষ্টি হলে ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে, ফলে অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাসে আসে না। তবে কোনো কোনো দিন শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি তুলনামূলক ভালো থাকে।

শাহবাজপুরের উত্তর কৈডোলা স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসায় গিয়ে কোনো শিক্ষককে পাওয়া যাইনি। সাইনবোর্ডে দেওয়া নাম্বারে যোগাযোগ করার চেষ্টা হলেও কারো সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

মানবাধিকার কর্মী জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, শিক্ষা বিভাগের নিয়মিত পরিদর্শন ও কার্যকর তদারকির অভাবেই এমন অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছে। প্রশাসনের উচিত দ্রুত ছাত্রসংখ্যা কম বা কার্যত শিক্ষার্থীশূন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা করে সেগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণে আনা। কোনো প্রতিষ্ঠান সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী পরিচালিত না হলে তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা, এমনকি এমপিও সুবিধা বাতিলের বিষয়টিও বিবেচনা করা উচিত।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে জামালপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক ও শিক্ষা) আফসানা তাসলিম বলেন, কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম, শিক্ষার্থী উপস্থিতি নিয়ে অসংগতি বা কাগজে-কলমে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানোর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে বাস্তবে শিক্ষার্থী সংখ্যা কম থাকা সত্ত্বেও নথিপত্রে বেশি উপস্থিতি দেখানোর বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে তদন্ত কমিটি গঠন করব। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে।