দুই কোটি টাকার ব্যয়ের হিসাব নেই, আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ
কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসায় প্রায় দুই কোটি টাকার ব্যয়ের হিসাব ও সংশ্লিষ্ট ভাউচার খুঁজে না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম, গুরুত্বপূর্ণ নথি গায়েব এবং আর্থিক অসঙ্গতির নানা অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানটিতে পূর্ণাঙ্গ অডিট ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন বর্তমান ও সাবেক পরিচালনা কমিটির সদস্য, প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় সচেতন মহল।
১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ফাঁসিয়াখালী ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসা ২০১৭ সালে কামিল স্তরের স্বীকৃতি লাভ করে। অভিযোগ রয়েছে, ২০১০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বিভিন্ন শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগে বিধিমালা লঙ্ঘন করে অনিয়ম করা হয়েছে। এমনকি অনুমোদিত পদ না থাকা সত্ত্বেও নিয়োগ দেওয়া এবং পরবর্তী সময়ে নানা প্রক্রিয়ায় এমপিওভুক্ত করার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগের মধ্যে সহকারী মৌলভী নুরুল আবছারের নিয়োগ ও এমপিওভুক্তির বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি এবতেদায়ি প্রধান পদে নিয়োগ পেলেও প্রথমদিকে এমপিওভুক্ত হতে পারেননি। পরে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কিছু কর্মকর্তার সহযোগিতায় অনিয়মের মাধ্যমে এমপিওভুক্ত করা হয়।
এসব অভিযোগ অস্বীকার করে নুরুল আবছার বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। একটি সংঘবদ্ধ চক্র মাদ্রাসাকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে।’
এ বিষয়ে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আবুল মনছুর বলেন, ‘আমি কয়েকজন প্রার্থীর কাছ থেকে এমন অভিযোগ শুনেছি। তবে সে সময় বিষয়টি যাচাই করার সুযোগ হয়নি। প্রশাসনিক অনেক তথ্য ও পাসওয়ার্ড সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছেই ছিল।’
মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক (বিপিএড), উপাধ্যক্ষ ও অধ্যক্ষ নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু নিয়োগে মেধা ও প্রাপ্ত নম্বরের পরিবর্তে ব্যক্তিগত প্রভাবকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। উপাধ্যক্ষ নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ নম্বরপ্রাপ্ত প্রার্থীকে বাদ দিয়ে অন্য প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে অধ্যক্ষ নিয়োগেও যোগ্য কয়েকজন প্রার্থীকে ইন্টারভিউ প্রক্রিয়া থেকে দূরে রাখার অভিযোগ উঠেছে।
বর্তমান অধ্যক্ষ মুহাম্মদ আক্কাছের বিরুদ্ধে এনটিআরসিএ সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষকদের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও করেছেন কয়েকজন শিক্ষক। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রভাষক দাবি করেন, কিছু নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকের সনদ ও নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন থাকায় দ্রুততার সঙ্গে নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে। তিনি এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত দাবি করেন।
তবে অধ্যক্ষ মুহাম্মদ আক্কাছ এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘এনটিআরসিএ নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের বিষয়ে আমি কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি। আমার নিয়োগের ক্ষেত্রেও কোনো অনিয়ম হয়েছে বলে জানা নেই।’
তিনি আরও জানান, ২০১৭ সালের আগের অনেক গুরুত্বপূর্ণ নথি, গভর্নিং বডির সিদ্ধান্ত ও রেজুলেশন বই বর্তমানে মাদ্রাসায় সংরক্ষিত নেই। এ বিষয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে।
অর্থনৈতিক অনিয়মের অভিযোগ আরও গুরুতর আকারে সামনে এসেছে। পরিচালনা কমিটির এক সাবেক সদস্যের দাবি, কয়েক বছরের আয়-ব্যয়ের গুরুত্বপূর্ণ হিসাব ও ভাউচার বর্তমানে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। প্রায় দুই কোটি টাকার ব্যয়ের হিসাব যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়া অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি। দীর্ঘদিন মন্ত্রণালয় পর্যায়ের পূর্ণাঙ্গ অডিট না হওয়ায় এসব অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে তার দাবি।
বর্তমান পরিচালনা কমিটির এক সদস্য জানান, অধ্যক্ষের আয়-ব্যয়ের হিসাব পর্যালোচনায় কিছু অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। এ কারণে আবার অডিট কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। অডিট সম্পন্ন হলে প্রকৃত চিত্র সামনে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
এ ছাড়া অধ্যক্ষের বিদেশ সফর নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। তাদের দাবি, ঘন ঘন বিদেশ সফরের কারণে শিক্ষা কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে অধ্যক্ষ বলেন, ‘গত ১৮ মাসে আমি সৌদি আরব সফর করিনি।’
এদিকে মাদ্রাসার সভাপতি মাওলানা বদিউল আলম তার দায়িত্বকালীন সময়ে নিয়োগ ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।’