২২ মে ২০২৬, ২০:০৯

ঈদের চাঁদ আনন্দের বন্যা নিয়ে আসলেও আমার ঘরে আসে দীর্ঘশ্বাস হয়ে

ইবতেদায়ী মাদ্রাসার শিক্ষক  © এআই সৃষ্ট ছবি

ঈদুল ফিতর কিংবা ঈদুল আজহা—মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় আনন্দের দিন। বিশেষ করে ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে প্রতিটি পরিবারে থাকে আলাদা প্রস্তুতি, ত্যাগ ও আনন্দের আবহ। কিন্তু এই উৎসবের আনন্দ যখন দুয়ারে কড়া নাড়ে, তখন দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত ও নন এমপিওভুক্ত  ইবতেদায়ী মাদ্রাসার শিক্ষকদের ঘরে এক ধরনের চাপা কান্না আর দীর্ঘশ্বাস নেমে আসে। যে শিক্ষকেরা সমাজে আলো ছড়ান, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলেন, তাদের উৎসবের দিনটি কাটে চরম আর্থিক টানাপোড়েনে—ঈদের বিশেষ উদযাপনকে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের সামনে করুণভাবে তুলে ধরেন কয়েকজন শিক্ষক।

শাহিন সিকদার রায়েদ দারুস সুন্নাহ দাখিল মাদ্রাসার জুনিয়র শিক্ষক। বাড়ি গোপালগঞ্জ হলেও শিক্ষকতা করেন গাজীপুরে। তিনি বলেন, ‘আমি একজন ইবতেদায়ি শিক্ষক। চতুর্থ গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে মেধার স্বাক্ষর রেখে, বুকভরা স্বপ্ন আর সুমহান লক্ষ্য নিয়ে শিক্ষকতা পেশায় এসেছিলাম। ভেবেছিলাম, মানুষ গড়ার এই পবিত্র কারিগরিতে যুক্ত হয়ে সমাজকে আলো ছড়াব, আর রাষ্ট্র আমাকে অন্তত ন্যূনতম সম্মানের সাথে বেঁচে থাকার সুযোগ দেবে। কিন্তু আজ, বাস্তবতার নির্মম কশাঘাতে আমার সেই স্বপ্ন আর আত্মমর্যাদা ধুলোয় মিশে যাচ্ছে।’

‘​ঈদের চাঁদ অনেকের ঘরে আনন্দের বন্যা নিয়ে আসে, অথচ আমাদের মতো ইবতেদায়ি শিক্ষকদের ঘরে নিয়ে আসে এক দীর্ঘস্থায়ী দীর্ঘশ্বাস। সমাজের চোখে আমরা 'জাতি গড়ার কারিগর', কিন্তু সেই কারিগরের নিজের ঘরই যখন অভাবের অন্ধকারে ডুবে থাকে, তখন হৃদয়ের ভেতরটা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়‘ -শাহিন সিকদার, ইবতেদায়ী শিক্ষক

শাহিন সিকদার বলেন, ‘​একফোঁটা জলের মতো আমাদের ৫০ শতাংশ উৎসব ভাতা। ​আমরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে কৃতজ্ঞ। কারণ বোনাস ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করেছে। গত ঈদুল ফিতর থেকে বর্ধিত ভাতা পেলেও বর্তমান বাজারের আকাশছোঁয়া ঊর্ধ্বগতির কাছে এই উৎসব ভাতাও যেন মহাসমুদ্রে একফোঁটা পানির মতো অসাড়। আমার বর্তমান মূল বেতন ১০ হাজার ২০০ টাকা। সেই হিসেবে এই ঈদুল আজহায় আমার ভাগ্যে জুটেছে মাত্র ৫ হাজার ১৩০ টাকার উৎসব ভাতা। এই উৎসব ভাতা কি আসলেই উৎসব করার জন্য, নাকি একজন শিক্ষকের সাথে নিয়তির এক নির্মম প্রহসন—তা আজ বড় প্রশ্ন।’

‘​২২০ কিলোমিটারের দূরত্ব এবং শূন্য পকেটের যুদ্ধ’ মন্তব্য করে ইবতেদায়ীর এই শিক্ষক দ্য ডেইল ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘​আমার কর্মস্থল রায়েদ দারুস সুন্নাহ দাখিল মাদ্রাসা, আমার  বাড়ি থেকে প্রায় ২২০ থেকে ২৩০ কিলোমিটার দূরে। নাড়ির টানে, পরিবারের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে যখন বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিই, তখনই শুরু হয় প্রথম ধাক্কা। শুধু যাতায়াত ভাড়াতেই চলে যায় প্রায় ২ হাজার টাকা। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে যখন ক্লান্ত শরীরে বাড়ি পৌঁছাই, তখন পকেটে অবশিষ্ট থাকে মাত্র ৩ হাজার ১৩০ টাকা’ যোগ করেন তিনি।

এ শিক্ষকের ভাস্য, ‘​এই সামান্য ৩ হাজার টাকা নিয়ে যখন ৬ সদস্যের পরিবারের দিকে তাকাই, তখন বুকটা এক অজানা আশঙ্কায় ভারী হয়ে ওঠে। বাজারে গিয়ে এক কেজি গরুর মাংস, সামান্য সেমাই, চিনি আর ঈদের সকালের কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতেই সেই টাকা শেষ হয়ে যায়। এরপর পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্য একটা নতুন কাপড় কেনা তো দূরের কথা, নিজের জন্য কিছু ভাবার সাহস বহু আগেই বিসর্জন দিয়েছি।’

তিনি বলেন, ‘​ঈদুল আজহার মূল শিক্ষা ত্যাগ ও কোরবানি। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে কোরবানি দেওয়ার কথা চিন্তা করাও আমাদের মতো শিক্ষকদের জন্য এক আকাশকুসুম বিলাসিতা। অনেক শিক্ষক আজ ঋণের সাগরে নিমজ্জিত। ​সবচেয়ে বড় মানসিক যাতনা তখন হয়, যখন পরিবারের ছোট সদস্যরা নিষ্পাপ চোখে জিজ্ঞেস করে— বাবা, এই ঈদে আমার নতুন জামা হবে না?’

তিনি আরও বলেন, ‘​তখন একজন শিক্ষক হিসেবে, একজন অভিভাবক হিসেবে আমার কাছে কোনো উত্তর থাকে না। আমি শুধু নীরবে মাথা নিচু করে চোখের জল আড়াল করি। ক্লাসরুমে যে শিক্ষক শত শত শিক্ষার্থীর সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখায়, উৎসবের দিনে সেই শিক্ষকই নিজের সন্তানের সামনে চরম অসহায়, পরাজিত এক পিতা।’ 

শাহিন সিকদার বলেন, ‘​ঈদের চাঁদ অনেকের ঘরে আনন্দের বন্যা নিয়ে আসে, অথচ আমাদের মতো ইবতেদায়ি শিক্ষকদের ঘরে নিয়ে আসে এক দীর্ঘস্থায়ী দীর্ঘশ্বাস। সমাজের চোখে আমরা 'জাতি গড়ার কারিগর', কিন্তু সেই কারিগরের নিজের ঘরই যখন অভাবের অন্ধকারে ডুবে থাকে, তখন হৃদয়ের ভেতরটা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।‘

তিনি বলেন, ‘​আমরা কোনো বিলাসী জীবন চাই না, রাজকীয় ঈদ চাই না। আমরা শুধু চাই—​একজন শিক্ষক যেন ঈদের দিনে পরিবারের মুখে সামান্য একটু হাসি ফোঁটাতে পারেন। ​অর্থের অভাবে যেন কোনো শিক্ষকের সন্তানকে ঈদের দিন কাঁদতে না হয়। ​শিক্ষকেরা যেন সমাজের বুকে মাথা উঁচু করে, নিজের ন্যূনতম সম্মানটুকু নিয়ে বেঁচে থাকতে পারেন।’

এই আর্তনাদ শুধু আমার একার নয়, এটি চতুর্থ গণবিজ্ঞপ্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত এবং দেশের হাজারো নিম্নবেতনভুক্ত ইবতেদায়ি শিক্ষকের বুকের ভেতর জমে থাকা তীব্র ক্ষোভ ও নীরব কান্নার প্রতিধ্বনি মন্তব্য করে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘সরকার কাগজের হিসেব বাদ দিয়ে এই মানবিক সংকট অনুধাবন করবে এবং ইবতেদায়ি শিক্ষকদের পূর্ণাঙ্গ উৎসব ভাতাসহ স্থায়ী মর্যাদার বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।’

সানি আহমেদ (ছদ্মনাম), আইসিটি পড়ান বগুড়ার একটি মাদ্রাসার ইবতেদায়ী শাখায়। তিনি বলেন, ‘কোরবানির আনন্দ থেকে আমরা বঞ্চিত। বেতনের ৫০ শতাংশ হিসেবে আমি ৬ হাজার ২৫০ টাকা বোনাস পেয়েছি। এই টাকা দিয়ে কী স্ত্রী-সন্তানদের জন্য কিছু কিনব নাকি কোরবানির জন্য পরিকল্পনা করব?। ফলে কোরবানি দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ একটি সাধারণ মধ্যম সারির কোরবানির পশুর দাম সর্বনিম্ন ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা, সেখানে এই নামমাত্র বোনাস দিয়ে কোরবানির পশু কেনা তো দূরের কথা, চার-পাঁচজনের একটি পরিবারের জন্য ঈদের সাধারণ কেনাকাটা এবং সেমাই-চিনির খরচ চালানোই অসম্ভব হয়ে পড়ে।’

তিনি বলেন, ‘কোরবানির ঈদ মানেই ত্যাগের মহিমা। সন্তানরা আশা করে তাদের বাবা একটি পশু কোরবানি দেবেন, পরিবারে ঈদের আনন্দ আসবে। কিন্তু একজন মাদ্রাসা শিক্ষক যখন তার পুরো বোনাসের টাকা পকেটে নিয়ে হাটে যান, তখন বাজারের বাস্তবতার কাছে তাকে চরমভাবে পরাজিত হতে হয়। নিজের সামান্য বেতন এবং এই নামমাত্র বোনাস এক করেও একটি পশুর ন্যূনতম ভাগের অংশীদার হওয়াও আমাদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

আরও পড়ুন: কোরবানি থেকে সংগ্রাম, বাংলায় ইসলামের আগমন 

ঈদের দিন যখন চারপাশের মানুষ কোরবানির আনন্দে মেতে ওঠে, তখন এই মানুষ গড়ার কারিগরেরা নিজেদের গুটিয়ে রাখেন এক তীব্র মানসিক যন্ত্রণায়। সন্তান ও পরিবারের মুখে হাসি ফোঁটাতে না পারার এই কষ্ট আমার মতো একজন শিক্ষকের আত্মমর্যাদাকে ক্ষণে ক্ষণে চূর্ণ করে দেয়,’ মন্তব্য করেন এই শিক্ষক।’

আমরা বৈষম্যের বেড়াজালে আটকা মন্তব্য করে এ শিক্ষক দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘একই দেশে, একই সিলেবাস ও শিক্ষাক্রমে পাঠদান করেও সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকেরা যেখানে শতভাগ উৎসব ভাতা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন, সেখানে বেসরকারি এমপিওভুক্ত ও ইবতেদায়ী শিক্ষকেরা যুগের পর যুগ ধরে এই বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই বাজারে যখন জীবনযাত্রার ব্যয় আকাশচুম্বী, তখন শিক্ষকদের এই স্বল্প বোনাস দেওয়া এক ধরনের নির্মম রসিকতা ছাড়া আর কিছুই নয়। তাই আমাদের বেতন বৃদ্ধিসহ বোনাস শতভাগ করতে হবে।’

দিনাজপুর জেলার একটি ইবতেদায়ী মাদ্রাসার জেনারেল শিক্ষক আশফাকুর রহমান লিমন (ছদ্মনাম)। নিজ জেলা থেকে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার দূরে শিক্ষকতা করেন তিনি। দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে লিমন বলেন, ‘আমি ১৬তম গ্রেডে মাত্রা ৯ হাজার ৩০০ টাকা বেতন এবং বোনাস ৪ হাজার ৬৫০ টাকা পেয়েছি। যাতায়াতেই বোনাসের টাকা প্রায় শেষ হয়ে যায়। আমাদের ৪ জনের সংসারের খরচ ও ফিরতি যাত্র সবমিলিয়ে সব টাকা শেষ হয়ে যাবে, বরং আরও দেনা করতে হবে। ঈদের কেনাকাটা বা কোরবানি দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়, আমার জন্য ঈদ নয়।’