১৩ মে ২০২৬, ১৭:৪৫

৩ যুগেও এমপিওভুক্ত মাদ্রাসাটির নেই কোনো ভবন, আকাশে মেঘ জমলেই বাজাতে হয় ছুটির ঘণ্টা

পাঁচভুলোট দাখিল মাদ্রাসার জরাজীর্ণ ভবণে ক্লাস চলাকালীন   © টিডিসি ফটো

প্রায় প্রতিবছরই দাখিল পরীক্ষায় ধারাবাহিক শতভাগ পাসের গৌরব অর্জন করা প্রতিষ্ঠানটির মাথার ওপর নেই কোনো ছাঁদ। আছে কেবল ঝুঁকিপূর্ণ মরিচাধরা টিনশেড। আকাশে সামান্য মেঘ জমলেই শুরু হয় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। কখনো ঝড়-বৃষ্টির আতঙ্ক, আবার কখনো তীব্র রোদের দুশ্চিন্তায় কাটে তাদের সময়। 


শ্রেণিকক্ষে বৃষ্টির পানি ঢুকলে বই-খাতা বাঁচাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে শিক্ষার্থীরা, আর তখন বাধ্য হয়ে আগেভাগেই ছুটির ঘণ্টা বাজাতে হয় দপ্তরিকে। অন্যদিকে রোদের দিনে ক্লাস শুরু করতে হয় আগভাগে, নাহলে তীব্র গরমে অসুস্থ হয়ে পড়বে শিক্ষার্থীরা। এমন করুণ পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই চলছে যশোরের শার্শা উপজেলার সীমান্তবর্তী পাঁচভুলোট দাখিল মাদ্রাসা।

খুলনা বিভাগের দাখিল পরীক্ষার ফলাফলে ইতোমধ্যে সুনাম কুড়িয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিবছর শতভাগ পাসের ঐতিহ্য ধরে রেখে ওই এলাকার শিক্ষাবিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও প্রতিষ্ঠার চার দশক পার করা মাদ্রাসাটি আজও সরকারি কোনো ভবন পায়নি। আর তাই জরাজীর্ণ টিনশেড ঘরেই চলছে পাঠদান, যা নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ।


শার্শা উপজেলার ৬ নম্বর গোগা ইউনিয়নের পাঁচভুলোট গ্রামে অবস্থিত মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৪ সালে। এমনকি তিন যুগ আগে এমপিওভুক্ত হলেও অবকাঠামোগত উন্নয়নের কোনো ছোঁয়া লাগেনি এখানে। ফলে শিক্ষার মান ধরে রাখলেও নিরাপদ ও আধুনিক পরিবেশ থেকে বঞ্চিত শত শত শিক্ষার্থী।


বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে এবতেদায়ী প্রথম শ্রেণি থেকে দাখিল দশম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান কার্যক্রম চালু রয়েছে। মোট শিক্ষার্থী ৫৯২ জন। এর মধ্যে এবতেদায়ী শাখায় ১৬২ জন এবং দাখিল শাখায় ৩৫০ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। শিক্ষক ও কর্মচারী ২৬ জন থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন ১৯ জন। শিক্ষক সংকট নিরসনে এনটিআরসির মাধ্যমে নতুন শিক্ষক নিয়োগের আবেদন করেছে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পুরোনো টিনশেড ভবনের বিভিন্ন স্থানে মরিচা পড়ে ছিদ্র হয়ে গেছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই ছাদ চুঁইয়ে পানি ঢুকে শ্রেণিকক্ষে। কোথাও কোথাও বেঞ্চ সরিয়ে নিয়ে ক্লাস করতে হয় শিক্ষার্থীদের। বর্ষাকালে আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়। ঝড়ো হাওয়া শুরু হলে শিক্ষকরা দ্রুত ক্লাস শেষ করে শিক্ষার্থীদের বাড়ি পাঠিয়ে দেন।

শুধু বর্ষা নয়, গ্রীষ্মকালেও চরম ভোগান্তি পোহাতে হয় শিক্ষার্থীদের। টিনশেড কক্ষগুলো অতিরিক্ত গরম হয়ে ওঠায় অনেক সময় শ্রেণিকক্ষে বসে থাকাই কষ্টকর হয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে সকাল সকাল ক্লাস নিতে হয় শিক্ষকদের, যাতে তীব্র গরমের আগেই পাঠদান শেষ করা যায়। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও থেমে নেই শিক্ষার অগ্রযাত্রা। প্রতিবছর দাখিল পরীক্ষায় শতভাগ পাসের ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে প্রতিষ্ঠানটি। এখান থেকে পাস করা বহু শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি কলেজে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করছেন। অনেকে বিভিন্ন পেশায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন ইতিমধ্যে।

পাঁচভুলোট গ্রামের প্রবীণ শিক্ষানুরাগী আব্দুল মজিদ সর্দার বলেন, এই মাদ্রাসা শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি এলাকার মানুষের আবেগ ও গর্বের জায়গা। অথচ বছরের পর বছর ভবনের অভাবে শিক্ষার্থীরা দুর্ভোগে আছে। দ্রুত একটি আধুনিক বহুতল ভবন নির্মাণ করা খুবই জরুরি।

মাদ্রাসার সপ্তম শ্রেণির ছাত্র মারুফ হাসান বলে, বৃষ্টি হলে ক্লাস করা যায় না। অনেক সময় বই-খাতা ভিজে যায়। আবার গরমের সময় টিনশেডের ভেতরে বসে থাকতে খুব কষ্ট হয়।
অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী তাসলিমা খাতুন বলে, প্রচণ্ড গরমে অনেক শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ে। একটি ভালো ভবন হলে আমরা সুন্দর পরিবেশে পড়াশোনা করতে পারতাম।

মাদ্রাসার সুপার আয়ুব আলী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, এই প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কোনো পাকা ভবন নেই। শিক্ষকদের বসারও পর্যাপ্ত জায়গা নেই। ছোট একটি কক্ষে গাদাগাদি করে শিক্ষক-কর্মচারীদের বসতে হয়। কেউ কেউ বারান্দায় বসে অফিসের কাজ করেন। আকাশে মেঘ দেখলেই আতঙ্ক শুরু হয়। একটি চারতলা ভবন নির্মাণ করা গেলে শিক্ষার্থীরা নিরাপদ ও স্বাভাবিক পরিবেশে পড়াশোনার সুযোগ পাবে। এটা শুধু আমাদের দাবি নয়, এলাকাবাসীরও দীর্ঘদিনের দাবি, সরকার যেন দ্রুত এই মাদ্রাসার অবকাঠামোগত উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ নেয়।