২৭ আগস্ট ২০২৬, ১৪:৩৬

মৃত্যুর পাঁচ দশক পরও যে কবি অমর যে কবির কণ্ঠে আজও বাজে বিদ্রোহের দামামা

কাজী নজরুল ইসলাম  © সংগৃহীত

বাঙালি জাতির যেকোনো দুঃসময়, আন্দোলন কিংবা সংকটময় মুহূর্তে কাজী নজরুল ইসলামের গান ও কবিতা মানুষকে সাহস জোগায়। তার ‘চল চল চল’ উদ্দীপিত করে এগিয়ে যেতে, তার বিদ্রোহী চেতনা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি দেয়, তার সাম্যের বাণী মনে করিয়ে দেয়, মানুষের পরিচয়ের ঊর্ধ্বে কোনো বিভাজনই হতে পারে না। অন্যায়ের বিরুদ্ধে যখনই দাঁড়ানোর সাহস প্রয়োজন হয়, তখনই উচ্চারিত হয় নজরুলের গান, কবিতা।

বিদ্রোহ, প্রেম, সাম্য ও মানবতার কবি কাজী নজরুল ইসলাম। বাংলা সাহিত্য ও সংগীতের আকাশে তার আবির্ভাব ছিল যেন এক ঝড়ের মতো। তার লেখনীতে ছিল শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে অবস্থান এবং নিপীড়িত মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। আবার সেই একই কলমে ফুটে উঠেছে প্রেম, প্রকৃতি, সৌন্দর্য ও বিরহের কোমল অনুভূতি। তাই নজরুলকে শুধু বিদ্রোহের কবি বললে তার সৃষ্টির বিশালতাই যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

আজ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৭৬ সালের ২৭ আগস্ট ঢাকার তৎকালীন পিজি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। মৃত্যুর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়। পাঁচ দশক পরও তার সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। কারণ নজরুলের মৃত্যু ঘটেছে, কিন্তু তার সৃষ্টি ও চেতনার মৃত্যু ঘটেনি।

১৮৯৯ সালের ২৫ মে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কাজী নজরুল ইসলাম। দারিদ্র্য ও নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা নজরুল পরবর্তী সময়ে হয়ে ওঠেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শক্তিশালী কণ্ঠ। কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, সাংবাদিকতা ও চলচ্চিত্র, সৃষ্টিশীলতার বহু শাখায় রেখে গেছেন নিজের স্বতন্ত্র স্বাক্ষর।

নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ যেন একটি কবিতা নয়, এক অদম্য চেতনার নাম। ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণ, বঞ্চনা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার উচ্চারণ তখনকার তরুণ সমাজকে নাড়া দিয়েছিল। তার কবিতার বিদ্রোহ ছিল মানুষের মুক্তির জন্য, শৃঙ্খল ভাঙার জন্য। তিনি লিখেছিলেন এমন এক সমাজের স্বপ্ন, যেখানে মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ থাকবে না।

‘অগ্নিবীণা’, ‘বিষের বাঁশী’, ‘সাম্যবাদী’, ‘সর্বহারা’, ‘দোলনচাঁপা’সহ তার অসংখ্য সৃষ্টিতে উঠে এসেছে সমাজ ও মানুষের নানা বাস্তবতা। শ্রমজীবী মানুষের জীবন, নিপীড়িতের কষ্ট, নারীর অধিকার এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ তার সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। তার কাছে সাম্য ছিল শুধু একটি রাজনৈতিক ধারণা নয়, ছিল মানবিক সমাজ নির্মাণের স্বপ্ন।

আর সেই বিদ্রোহের পাশাপাশি নজরুল ছিলেন গভীর প্রেমের কবি। তার প্রেমের কবিতা ও গান বাংলা সাহিত্যে সৃষ্টি করেছে অনন্য আবেগের জগৎ। প্রেম, বিরহ, প্রকৃতি ও সৌন্দর্যের যে বহুমাত্রিক প্রকাশ তাঁর রচনায় পাওয়া যায়, তা তাকে একইসঙ্গে বিদ্রোহ ও ভালোবাসার কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

ধর্মীয় সম্প্রীতি ও অসাম্প্রদায়িকতার ক্ষেত্রেও নজরুল ছিলেন অনন্য। ইসলামী সংগীতের পাশাপাশি তিনি রচনা করেছেন শ্যামাসংগীত, ভক্তিগীতি ও কৃষ্ণবিষয়ক গান। তার লেখায় যেমন এসেছে কোরআনের বাণী, তেমনি এসেছে শ্যামা, কালী ও কৃষ্ণের অনুষঙ্গ। ধর্মের বিভাজন নয়, মানুষের মিলনই ছিল তার চিন্তার অন্যতম ভিত্তি। তাঁর সেই মানবিক দর্শন আজকের বিভক্ত সমাজেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

নজরুলের প্রতিভা শুধু সাহিত্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সাংবাদিকতা ও সম্পাদনার পাশাপাশি সংগীত ও চলচ্চিত্রেও রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। ‘ধূমকেতু’সহ বিভিন্ন পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি ব্রিটিশবিরোধী রাজনৈতিক ও সামাজিক বক্তব্য তুলে ধরেন। তাঁর লেখার কারণে ব্রিটিশ সরকারের রোষানলে পড়তে হয় এবং কারাবরণও করেন তিনি।

সংগীতের জগতেও নজরুলের অবদান অসামান্য। দুই হাজারেরও বেশি গান রচনা ও সুরারোপের মাধ্যমে তিনি বাংলা সংগীতকে দিয়েছেন নতুন বৈচিত্র্য। প্রেম, প্রকৃতি, দেশপ্রেম, বিদ্রোহ ও ধর্মীয় অনুভূতি সবকিছুকে তিনি গানের বিষয় করেছেন। তাঁর সৃষ্ট গান আজ ‘নজরুলসংগীত’ নামে বাংলা সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

চলচ্চিত্রের সঙ্গেও ছিল তার গভীর সম্পৃক্ততা। ‘ধ্রুব’ চলচ্চিত্রে তিনি পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং এতে অভিনয়ও করেন। গান রচনা, সুরারোপ ও সংগীত পরিচালনার কাজেও যুক্ত ছিলেন তিনি। ফলে নজরুলের সৃষ্টিশীলতার পরিধি যে কতটা বিস্তৃত ছিল, চলচ্চিত্রের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততাও তার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।

জীবনের শেষ অধ্যায় ছিল নীরবতায় ঘেরা। ১৯৪২ সালে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর ধীরে ধীরে তার বাকশক্তি ও স্মৃতিশক্তি হারিয়ে যায়। দীর্ঘ সময় তিনি অসুস্থ অবস্থায় কাটালেও তার সৃষ্টি থেমে থাকেনি। তার লেখা কবিতা ও গান পরবর্তী প্রজন্মের কণ্ঠে কণ্ঠে বেঁচে থেকেছে।

স্বাধীন বাংলাদেশের সঙ্গেও নজরুলের সম্পর্ক ছিল গভীর। ১৯৭২ সালের ২৪ মে সপরিবারে তাকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। স্বাধীন বাংলাদেশ তাকে জাতীয় কবির মর্যাদা দেয়। ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানসূচক ডি.লিট উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৭৬ সালে তিনি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব লাভ করেন এবং একই বছর একুশে পদকে ভূষিত হন।

আজও সংকটের মুহূর্তে ফিরে আসেন নজরুল, তার সাহিত্য শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের কথা বলে না। তার কবিতার বিদ্রোহ অন্যায়ের বিরুদ্ধে, তার সাম্য বৈষম্যের বিরুদ্ধে, তার মানবতা বিভেদের বিরুদ্ধে। ফলে সময় বদলালেও তার বক্তব্যের প্রয়োজন ফুরায়নি। বরং নতুন নতুন সামাজিক বাস্তবতায় তার কবিতা ও গান নতুন অর্থে ফিরে আসে। তাই নজরুলকে স্মরণ করার সবচেয়ে বড় উপায় শুধু তার জন্ম ও মৃত্যুদিন পালন নয় বরং তার সাহিত্য, সংগীত ও দর্শনকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া। তার রচনা আরও বেশি ভাষায় অনুবাদ, গবেষণা ও বিশ্বব্যাপী প্রচারের মাধ্যমে নজরুলকে আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে তুলে ধরা জরুরি।

নজরুলের সাহিত্য, দর্শন ও সাংস্কৃতিক চেতনাকে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে দিতে কবি নজরুল ইনস্টিটিউট এবং জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ও নানা কার্যক্রমের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। গবেষণা, প্রকাশনা, অনুবাদ, সাংস্কৃতিক আয়োজন ও নজরুলচর্চার নানা উদ্যোগের মাধ্যমে তার সৃষ্টিকে নতুন প্রজন্ম ও বিশ্বপরিসরে পৌঁছে দেওয়ার কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

নজরুলকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব শুধু প্রতিষ্ঠানগুলোর নয়, পাঠক, শিল্পী, গবেষক ও নতুন প্রজন্মেরও। কারণ নজরুলকে ধারণ করা মানে শুধু তার কবিতা পড়া কিংবা গান গাওয়া নয়—অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলা, সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে ভালোবাসা এবং মুক্ত ও মানবিক সমাজের স্বপ্ন দেখা।

পাঁচ দশক আগে থেমে গেছে কবির কণ্ঠ। কিন্তু তার উচ্চারণ আজও থামেনি। সময়ের স্রোত পেরিয়ে তার কবিতা আজও আমাদের প্রশ্ন করে, সাহস জোগায়, পথ দেখায়। যতদিন অন্যায় থাকবে, যতদিন বৈষম্য থাকবে, যতদিন মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা থাকবে, ততদিন বাজবে সেই বিদ্রোহের দামামা। আর সেই দামামার নাম কাজী নজরুল ইসলাম।