১৫ আগস্ট ২০২৬, ২১:৪৪

নিশিডাক এবং প্রাচীর থেকে কথা: আল মাহমুদের কবিতায় শেখ মুজিবের দুঃশাসন

আল মাহমুদ, শেখ মুজিবের ভাস্কর্য এবং দৃশ্যপটে রক্ষীবাহিনীর কয়েকজন সদস্য  © টিডিসি সম্পাদিত

সে যখন বললো, ‘ভাইসব।’
অমনি অরণ্যের এলোমেলো গাছেরাও সারি বেঁধে দাড়িয়ে গেল।
সে যখন ডাকলো ‘ভাইয়েরা আমার।'
ভেঙে যাওয়া পাখির ডাক নেমে এলো পৃথিবীর ডাঙায়।

সাবেক রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে কবি আল মাহমুদের ‘নিশিডাক’ কবিতার অংশবিশেষ এটি। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পরের তিনটি ১৫ আগস্টে এই কবিতা উদযাপন করে শেখ মুজিবের প্রতি ‘শ্রদ্ধা’ নিবেদন করেছেন আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ), নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ এবং সমভাবাপন্নরা।

কিন্তু ‘নিশিডাক’ শিরোনামের এই কবিতা আল মাহমুদ জীবদ্দশায় প্রকাশ করেননি। তিনি ২০১৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পরকালে পাড়ি জমান। পরের বছর ‘ইতিহাস দেখ বাঁক ঘুরে গেছে ফের ইতিহাসে’ নামে একটি কাব্য প্রকাশিত হয়। আল মাহমুদের অপ্রকাশিত ও অগ্রন্থিত ৩৫টি কবিতা স্থান পায় এতে। গ্রন্থনা ও সম্পাদনা করেন আল মাহমুদরে এক সময়ের সচিব কবি আবিদ আজম। এই কাব্যে রয়েছে নিশিডাকও। তবে গ্রন্থ প্রকাশের আগে একই বছরের ১৫ আগস্টে আবিদ আজম কবিতাটি প্রকাশ করেন।

আল মাহমুদ একাত্তরে প্রবাসী সরকারের কর্মচারী ছিলেন। সে হিসেবে তিনি নিজেকে ‘মুক্তিযোদ্ধা’ ক্লেইম করতেন। এতটুকুই নয়, তিনি জোরালোভাবে দাবি করতেন যে—তিনিই ছিলেন একমাত্র মুক্তিযোদ্ধা কবি। একাত্তর পরবর্তী ঘাত-প্রতিঘাত তিনি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছেন। ১৯৭৩ সালে পুনঃপ্রকাশিত ‘সোনালী কাবিন’ গ্রন্থে তার ‘বোধের উৎস কই, কোন দিকে?’ কবিতায় এই দুঃসময়ের চিত্র অঙ্কন করেছেন নিপুণ মুন্সিয়ানায়। তার ভাষ্যে—

হঠাৎ গুলির শব্দ। চিৎকার, ধর ধর ধর
কিন্তু আমি কাকে ধরবো? স্টেনগান কাঁধে নিয়ে হেঁটে যায়
উনিশশো তেয়াত্তর সাল।

পরের বছর, ১৯৭৪ সালের ১৭ মার্চ আল মাহমুদ গ্রেপ্তার হন। তার অপরাধ কী ছিল? জাসদের মালিকানাধীন ‘গণকণ্ঠ’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। সেখানে রক্ষীবাহিনীর অব্যাহত নিপীড়ন এবং মুজিব সরকারের সমালোচনা করতেন। জাসদের প্রতি সহমর্মী থাকলেও দলীয় কর্মী ছিলেন না। কিন্তু গণতান্ত্রিক সমালোচনার অপরাধে মুজিব সরকার তাকে গ্রেপ্তার করে জেলে পুরে দেয়। পরে বের হয়ে আসেন। অবশ্য মুজিব তার মতো প্রতিভাকে ফেলতে পারেননি। জেলখানায় বিনা বিচারে পচানোর পর শিল্পকলা একাডেমির গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের পরিচালক বানান।

কিন্তু আল মাহমুদ যখন জেলে, তখন বাইরে চলছে দুর্ভিক্ষ। ‘জেলগেটে দেখা' কবিতায় লিখেছেন বিস্তারিত—

আমি জানি বাইরে এখন আকাল চলছে। ক্ষুধার্ত মানুষ
হন্যে হয়ে শহরের দিকে ছুটে আসছে। সংবাদপত্রগুলোও
না বলে পারছে না যে এ অকল্পনীয়।
রাস্তায় রাস্তায় অনাহারী শিশুদের মৃতদেহের ছবি দেখে
আমি কতদিন আমার কারাকক্ষের লোহার জালি
চেপে ধরেছি।
হায় স্বাধীনতা, অভুক্তদের রাজত্ব কায়েম করতেই কি আমরা
সর্বস্ব ত্যাগ করেছিলাম।

এ সময়ে, সম্ভবত জেলখানায় আল মাহমুদ ইসলামপন্থী কিংবা মুসলিম জাতীয়তাবাদী ব্যক্তিদের সংস্পর্শে আসেন। তিনি যে জেলখানাতেই ‘ইসলামী আদর্শে’ এক রকম প্রত্যাবর্তন করেন, তা বেশ কয়েকটা সাক্ষাৎকার এবং কবিতাতেও বলেছেন। ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’ তার এ সময়ের কাব্য। এই গ্রন্থের নাম কবিতায় তিনি যে বর্ণনা দিয়েছেন—তাতে তিনি অবিচারের শিকার হয়ে জেলে ছিলেন, এ অবিচারের প্রতিবিধানে তিনি আল কোরআনের দ্বারস্থ হন এবং অবিচারের প্রতীক হাইকোর্টটি কামান দেগে উড়িয়ে দিতে চান।

কাব্যটি ১৯৭৬ সালে প্রকাশ হয়। মুজিবের মৃত্যুর পর। কিন্তু অনেকগুলো লেখা সম্ভবত জেলে লেখা। অন্তত ‘জেলগেটে দেখা’ এবং ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’। আরেকটি কবিতা জেলে বসেই লেখার সম্ভাবনা অনেক বেশি। কবিতাটির নাম—‘প্রাচীর থেকে কথা’।

কবিতায় হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের কারাবরণের সঙ্গে মিলিয়ে কারানির্যাতিত নিজেকে প্রেক্ষাপটে নিয়ে আসেন আল মাহমুদ। এর শেষ দুটি লাইন বেশ আকর্ষক। লিখেছেন—
‘যদি ও বোঝে না কবি রাজাদের স্বপ্নের কী মানে, কিন্তু এটা তো জানে, হত্যাই হত্যা ডেকে আনে।’

কারা প্রাচীর থেকে তাকে যখন জিজ্ঞেস করা হচ্ছে—
যোশেফ, যোশেফ!
রাজার স্বপ্নের মানে বলেছিলে তুমি সেই লোক?

তিনি জবাব দিচ্ছেন—
না আমি যোশেফ নই, না। জানি না ফ্যারাও কে, স্রেফ
নিজেরই স্বপ্নে দাগে লাল করে রেখেছি দুচোখ।

কী ভয়ঙ্কর! আল মাহমুদ ফেরাউন সম্পর্কে জানেন না, জানেন না রাজার স্বপ্নের মানে। কিন্তু তার চোখ লাল, আর জানেন—হত্যাই হত্যা ডেকে আনে।

(লেখায় প্রকাশিত তথ্য ও মতামতের দায়ভার লেখকের নিজস্ব। এর সাথে সম্পাদকমণ্ডলী বা পত্রিকা কর্তৃপক্ষের কোনো নীতিগত সম্পৃক্ততা নেই।)