ঠিকাদারি সমিতির দ্বন্দ্বে ২ বিএনপি নেতাসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা
চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় ঠিকাদারি সমিতির দ্বন্দ্বের জেরে ২ বিএনপি নেতাসহ চারজনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হয়েছে। সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) মো. আব্দুল কাদের সিকদার নামের এক ব্যক্তি বাদী হয়ে সাতকানিয়া থানায় মামলাটি দায়ের করেন। ওই মামলার এজাহারে চন্দনাইশ উপজেলা বিএনপি'র সাবেক সাধারণ সম্পাদক এম এ হাশেম রাজুকে সাক্ষী করা হয়েছে।
মামলায় রাষ্ট্র ও সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, নাশকতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির উদ্দেশ্যে মিছিল এবং ব্যানার ছেঁড়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে মামলার আসামিদের দাবি, ঠিকাদারি সমিতির বিরোধকে কেন্দ্র করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাদের বিরুদ্ধে এ মামলা করা হয়েছে।
মামলার বিবাদীরা হলেন, গাছবাড়িয়া সরকারি কলেজ ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও বিএনপি নেতা আফিল উদ্দিন আহমদ (৫২), মো. সাইফুল ইসলাম (৪৫), সাতকানিয়া উপজেলা যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বিএনপি নেতা ইলিয়াছ বাবুল (৫৫) এবং ঠিকাদার কামাল উদ্দিন চৌধুরী বাঁচাসহ (৪৮) অজ্ঞাত আরও অনেকে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, বিবাদীদেরকে এলডিপি ও বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তারা নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগ ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগের নেতা-কর্মীদের নিয়ে চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগের কার্যালয়ের সামনে রাষ্ট্র ও সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, জনসাধারণের ক্ষতি সাধন ও নাশকতা সৃষ্টিসহ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির উদ্দেশ্যে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র ও লাঠিসোটা নিয়ে মিছিলের আয়োজন করেন। ওই সময় তারা সড়ক বিভাগের কার্যালয়ের মূল ভবনে থাকা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও চট্টগ্রাম-১৪ আসনের সংসদ সদস্য জসীম উদ্দীন আহমেদের ব্যানার ছিঁড়ে পায়ের নিচে দিয়ে উল্লাস করেন। পরে চন্দনাইশ ও সাতকানিয়া উপজেলা বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীরা ঘটনাস্থলে গেলে আসামিরা পালিয়ে যায়।
তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সেখানে চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগ ঠিকাদার সমিতি ও চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগ ঠিকাদার কল্যাণ সমিতি নামে অনিবন্ধিত দুটি সমিতি রয়েছে। তার মধ্যে একটির সভাপতি চন্দনাইশ উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এম এ হাশেম রাজু ও সাধারণ সম্পাদক মো. মোরশেদুল আলম চৌধুরী। অপরটির সভাপতির দায়িত্ব রয়েছেন মামলার ১ নম্বর আসামি ও বিএনপি নেতা আফিল উদ্দিন আহমদ, সাধারণ সম্পাদক মামলার ২ নম্বর আসামি মো. সাইফুল ইসলাম এবং সিনিয়র সহ-সভাপতি মামলার ৩ নম্বর আসামি বিএনপি নেতা ইলিয়াছ বাবুল।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে এম এ হাশেম রাজু'র নেতৃত্বাধীন সমিতি চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগের কার্যালয়ের মাঠে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে একটি দোয়া মাহফিল ও আলোচনা সভার আয়োজন করেন। ওই সময় তাদের লোকজন অপর সমিতির ব্যানার সরিয়ে ফেলেছে এমন খবর পেয়ে তাদের কর্মসূচির শেষ হওয়ার পর একইদিন রাতে আফিল উদ্দিন আহমদসহ তার নেতৃত্বাধীন সমিতির লোকজন সেখানে যান এবং একটি কক্ষে আলোচনা সভা করেন। এরপর মধ্যরাতে মো. আব্দুল কাদের সিকদার নামের এক ব্যক্তি বাদী হয়ে সন্ত্রাসবিরোধী মামলাটি দায়ের করেন।
মামলার ১ নম্বর আসামি আফিল উদ্দিন আহমদ বলেন, আমি গাছবাড়িয়া সরকারি কলেজ ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রদলের সাবেক সহ সভাপতি ও উত্তর সাতকানিয়া সাংগঠনিক উপজেলা বিএনপি'র প্রতিষ্ঠাতা। বিএনপি'র দুঃসময়ে দলের হাল ধরেছি হয়তো আজকে সন্ত্রাসবিরোধী মামলার আসামি হওয়ার জন্য। আর পুলিশ কোন ধরনের তদন্ত না করে মধ্যরাতে কিভাবে মামলাটি রুজু করল এটাও আমি জনগণের নিকট প্রশ্ন রাখলাম। মূলত সেখানে আমাদের কিছু ব্যানার ছিল। তারা সেগুলো সরিয়ে ফেলেছিল। খবর পেয়ে আমরা সেখানে গিয়ে নির্ধারিত কক্ষে আলোচনা সভা করেছি।
মামলার ২ নম্বর আসামি মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, আমি চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক, চন্দনাইশ উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি এবং উপজেলা যুবদলের সদস্য। আর আমি নাকি রাষ্ট্র ও সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছি। এটা তো কোন পাগলেও বিশ্বাস করবে না। তারা ঠিকাদারি সমিতির দ্বন্দ্বে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলাটি করেছেন।
মামলার ৩ নম্বর আসামি ইলিয়াছ বাবুল বলেন, আমি সাতকানিয়া উপজেলা যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক, উপজেলা বিএনপির সাবেক সহ সাংগঠনিক সম্পাদক ও বর্তমানে উত্তর সাতকানিয়া সাংগঠনিক উপজেলা বিএনপির সংগঠক হিসেবে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামে অনেক নির্যাতনের শিকার হয়েও হাল ছাড়েনি। গতকালের আলোচনা সভায় আমি উপস্থিত ছিলাম না। তাহলে আমাকেও সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় আসামি করেছে। দলের সুসময়ে এমন উপহার সত্যিই খুবই দুঃখজনক।
এ বিষয়ে জানতে মামলার বাদী মো. আব্দুল কাদের সিকদারের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি কল রিসিভ না করায় বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এজাহারের সাক্ষী ও বিএনপি নেতা এম এ হাশেম রাজু বলেন, আসামিরা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও চট্টগ্রাম-১৪ আসনের সংসদ সদস্য জসীম উদ্দীন আহমেদের ব্যানার ছিঁড়ে পায়ের নিচে দিয়ে উল্লাস করেছে। এমনকি তারা কিছু ব্যানার পুড়িয়েও দিয়েছে। তারা এত রাতে সেখানে কিসের মিটিং করেছে সেটা ওই কার্যালয়ের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করলে সবকিছুর প্রমাণ পাওয়া যাবে।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী পিন্টু চাকমা বলেন, ঠিকাদার সমিতির একটি অনুষ্ঠান ছিল। তারা সেখানে আমাকে দাওয়াত করেছিল। তবে আমি সেখানে উপস্থিত থাকতে পারিনি। এমনকি মামলার বিষয়ে আমি কিছুই জানিনা। আর ঠিকাদার সমিতিগুলো সরকার কর্তৃক নিবন্ধিত নয় বরং তারা নিজেরা নিজেরাই গঠন করেছে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও সাতকানিয়া থানার উপ পরিদর্শক (এসআই) জহির আমিন বলেন, আমি ঘটনাস্থলে গিয়ে কিছু ব্যানার ছেঁড়া পেয়েছি। তবে বিষয়টির অধিকতর তদন্ত চলমান রয়েছে।
সাতকানিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, খবর পাওয়ার পর ঘটনাস্থলে পুলিশের একটি টিম পাঠানো হয়েছে। আমরা প্রাথমিক তদন্তে প্রধানমন্ত্রীর ব্যানার ছিঁড়ে পদদলিত করার সত্যতা পেয়েছে। পরে বাদীর এজাহারের ভিত্তিতে মামলার রুজু করা হয়েছে। এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।