১৫ জুলাই ২০২৬, ১৫:৪৩

ময়মনসিংহে দলিল লেখককে হত্যায় দুজনের মৃত্যুদণ্ড, ১০ জনের যাবজ্জীবন

আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা  © সংগৃহীত

ময়মনসিংহে ভালুকা উপজেলার দলিল লেখক আবু জাকারিয়া (মিন্টু) হত্যা মামলায় দীর্ঘ প্রায় ১৩ বছর পর দুজনকে মৃত্যুদণ্ড ও ১০ জনকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুজনকে ৩০ হাজার টাকা এবং যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানার অর্থ অনাদায়ে তাদের আরও ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।

বুধবার (১৫ জুলাই) দুপুরে ময়মনসিংহের বিশেষ দায়রা জজ আদালতের বিচারক ফারহানা ফেরদৌস বহুল আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন।

আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন মো. ফরিদ খলিফা (৪৮) ও পলাতক মো. মাসুদ মিয়া (৪১)। রায়ের সময় ফরিদ খলিফা আদালতে উপস্থিত থাকলেও মামলার ১ নম্বর আসামি মাসুদ মিয়া পলাতক ছিলেন। আদালত তাদের প্রত্যেককে ৩০ হাজার টাকা জরিমানাও করেছেন।

এ মামলায় যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন আবদুল মতিন (৪৫), তার বাবা আব্দুস ছাত্তার ওরফে ছন্দেন আলী (৬৮), মো. মোশারফ হোসেন (৫৮), মো. মোফাজ্জল হোসেন (৫৮), তার ভাই মো. তোফাজ্জল হোসেন (৪৮), মো. নজরুল মিয়া (৪৩), মো. মোকলেছুর রহমান (৫৩), মো. শাহজাহান আকন্দ (৪৮), তার ভাই মো. আতিকুল (৩৯) এবং পলাতক মো. সিদ্দিক মিয়া (৬৩)। তাদের প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানার অর্থ অনাদায়ে আরও ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।

আদালতের নথি থেকে জানা যায়, ২০১৩ সালের ১৪ আগস্ট সকাল ১০টার দিকে জমিজমা-সংক্রান্ত পূর্ববিরোধের জেরে ভালুকা উপজেলার উথুরা ইউনিয়নের নারাঙ্গী গ্রামের বাসিন্দা এবং ভালুকা সাবরেজিস্ট্রি অফিসের দলিল লেখক আবু জাকারিয়া (মিন্টু) নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।

ঘটনার দিন তিনি নিজ পৈতৃক সম্পত্তি দেখতে গেলে প্রতিপক্ষের লোকজন দেশীয় ধারালো অস্ত্র নিয়ে তার ওপর হামলা চালায়। এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর আহত করা হলে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে ভালুকা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনার পরদিন ১৫ আগস্ট নিহতের স্ত্রী লতিফা খাতুন বাদী হয়ে ভালুকা মডেল থানায় ১৬ জনের নাম উল্লেখ করে হত্যা মামলা দায়ের করেন।

পুলিশ দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০১৫ সালের ১৩ অক্টোবর ১২ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করে। মামলার বিচার চলাকালে আদালত ১৮ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, আলামত ও অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করেন। দীর্ঘ বিচারিক কার্যক্রম শেষে বুধবার আদালত এ রায় ঘোষণা করেন।

রায়ের সময় ১২ আসামির মধ্যে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত একজন এবং যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত একজন পলাতক ছিলেন। বাকি ১০ আসামির উপস্থিতিতেই আদালত রায় ঘোষণা করেন। পরে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।

মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন বিশেষ দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মো. আকরাম হোসেন। বাদীপক্ষে শুরু থেকেই মামলা পরিচালনা করেন আইনজীবী রাশেদা তাহমিনা। আসামিপক্ষে ছিলেন আইনজীবী এএইচএম খালেকুজ্জামান। তবে রায় ঘোষণার সময় আসামিপক্ষের আইনজীবী আদালতে উপস্থিত ছিলেন না।

রায়ের পর সন্তোষ প্রকাশ করে পিপি মো. আকরাম হোসেন বলেন, ‘জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে দলিল লেখক আবু জাকারিয়াকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল। আদালত ১৮ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এবং অন্যান্য প্রমাণ বিশ্লেষণ করে দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড ও ১০ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন। আমরা এ রায়ে সন্তুষ্ট। আদালত রায়ের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেছেন, সাক্ষ্য-প্রমাণে হত্যাকাণ্ড সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। আমরা চাই দ্রুত এ রায় কার্যকর হোক।’

পরিবারের স্বস্তি, দ্রুত রায় কার্যকরের দাবি, রায় ঘোষণার সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন নিহতের স্ত্রী লতিফা খাতুন ও ছেলে জাহিদ হাসান তালুকদার।

রায়ের পর জাহিদ হাসান তালুকদার বলেন, ‘আসামিরা পরিকল্পিতভাবে আমার বাবাকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল। দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে আমরা ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় ছিলাম। আজ আদালতের রায়ে আমরা ন্যায়বিচার পেয়েছি। এখন আমাদের একটাই দাবি, যাদের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে, সেই রায় যেন দ্রুত কার্যকর করা হয়।’

উচ্চ আদালতে আপিলের ঘোষণা অন্যদিকে রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন দণ্ডপ্রাপ্তদের স্বজনরা।

ময়মনসিংহ আদালতের পরিদর্শক পি এস এম মোস্তাছিনুর রহমান বলেন, প্রায় ১৩ বছর পর আলোচিত এই হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। আদালত দুজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ১০ জনকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন। রায়ের সময় ১০ আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন। পরে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে।