১১ বছরের আইনি লড়াই, ছেলে হত্যার রায় কার্যকর দেখে যাওয়া হলো না অধ্যাপক ফজলুল হকের
২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর রাজধানীর আজিজ কো-অপারেটিভ সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলায় জাগৃতি প্রকাশনীর অফিসে হত্যা করা হয় অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের একমাত্র ছেলে ফয়সল আরেফিন দীপনকে। হত্যার ৬ বছর পর বিচারের রায় ঘোষণা হলেও সেই রায় কার্যকর হওয়া দেখে যেতে পারেননি বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক ফজলুল হকের। রবিবার (৫ জুলাই) বিকালে রাজধানীর মিরপুরে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ৮৬ বছর বয়সি এই প্রবীণ অধ্যাপক।
আবুল কাসেম ফজলুল হকের দুই সন্তান অধ্যাপক ড. শুচিতা শরমিন ও ফয়সল আরেফিন দীপন। শুচিতা শরমিন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন। ফয়সল আরেফিন দীপন জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারি ছিলেন। ২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর দীপনকে হত্যা করে জঙ্গিরা। সে বছর ব্লগারদের ওপর ধারাবাহিক হামলার অংশ হিসেবে দীপনকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। ঘটনার দিন দুর্বৃত্তরা বই কেনার বাহানায় তার শাহবাগের অফিসে প্রবেশ করে এবং ভেতরের অন্যদের আটকে রেখে তাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
ছেলেকে হারিয়ে অধ্যাপক বলেছিলেন, ‘আমি কোনো বিচার চাই না। আমি চাই শুভবুদ্ধির উদয় হোক। যারা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ নিয়ে রাজনীতি করছেন, যারা রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে রাজনীতি করছেন, উভয়পক্ষ দেশের সর্বনাশ করছেন। উভয়পক্ষের শুভবুদ্ধির উদয় হোক। এটুকুই আমার কামনা। জেল-ফাঁসি দিয়ে কী হবে।’
শেষ পর্যন্ত আদালতে এই হত্যার বিচার হলেও দীর্ঘসূত্রতার কারণে রায় কার্যকর হয়নি। ২০২১ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি দীপন হত্যা মামলায় আট আসামির সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দেন ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মজিবুর রহমান।
মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ৮ আসামি হলেন- মইনুল হাসান শামীম ওরফে সিফাত সামির, আবদুস সবুর ওরফে আবদুস সামাদ, খাইরুল ইসলাম ওরফে জামিল রিফাত, আবু সিদ্দিক সোহেল ওরফে সাকিব সাজিদ, মোজাম্মেল হুসাইন ওরফে সায়মন, শেখ আবদুল্লাহ ওরফে জুবায়ের, চাকরিচ্যুত মেজর সৈয়দ জিয়াউল হক ও আকরাম হোসেন ওরফে হাসিব। তারা সবাই আনসার আল ইসলামের সদস্য ছিলেন।
এদের মধ্যে জিয়া ও আকরাম বিচারের শুরু থেকেই পলাতক ছিলেন। ২০২২ সালের নভেম্বরে অন্য একটি মামলায় ঢাকা আদালতে হাজিরা দিতে নেওয়ার সময় পালিয়ে যায় মইনুল হাসান শামীম ও আবু সিদ্দিক সোহেল।
বিচারিক আদালতে রায়ের এক সপ্তাহের মধ্যেই এই মামলার ডেথ রেফারেন্স ও জেল আপিল হাইকোর্টে আসে। সেসব এখনো শুনানির অপেক্ষায়।
বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ফাঁসির রায় কার্যকরের আগে হাইকোর্টের অনুমতি লাগে। সেটাই ডেথ রেফারেন্স। পাশাপাশি বিচারিক আদালতের ফাঁসির রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে থাকেন আসামিরা।
হাইকোর্টে আপিল শুনানি হয় মূলত বছরভিত্তিক। বর্তমানে ২০১৮ সালের আপিল ও ডেথ রেফারেন্সগুলোর শুনানি চলছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। দীপন হত্যার রায় হয় ২০২১ সালে। ফলে এসব শুনানির জন্য আরও অপেক্ষা করতে হবে দীর্ঘ সময়। তবে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এসব ডেথ রেফারেন্সের শুনানি হতে পারে।
বিচারিক আদালতে আসামিপক্ষের আইনজীবী এ বি এম খাইরুল ইসলাম জানান, রায়ের পর আসামিদের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ হয়নি। ফলে মামলার সর্বশেষ অবস্থা তার জানা নেই।
তবে উচ্চ আদালতে এ মামলার বিচার দীর্ঘায়িত হতে পারে— এমন আশঙ্কা থেকে মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি ও রায় কার্যকরের দাবি জানিয়েছিলেন আবুল কাসেম ফজলুল হক।