সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ তৈয়্যবের বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ দুদকের
বিটিসিএলের ফাইভ-জি উপযোগীকরণ প্রকল্পে ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম এবং দুদকের তদন্তে হস্তক্ষেপের অভিযোগে সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের বিরুদ্ধে মামলা করার সুপারিশ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
দুদকের পাঁচ সদস্যের অনুসন্ধানকারী দলের প্রস্তুত করা প্রতিবেদন ইতোমধ্যে সংস্থাটির সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা দেওয়া হয়েছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। দুদকের নতুন কমিশন গঠনের পর প্রতিবেদনটি কমিশনের সভায় উপস্থাপন করা হবে। এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া শুরু হবে।
দুদকের অনুসন্ধানে ফয়েজ তৈয়্যবের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘ফাইভজি উপযোগীকরণে বিটিসিএলের অপটিক্যাল ফাইবার ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পটি শেখ হাসিনার সরকারের সময় গ্রহণ করা হয়। পরে দুর্নীতির অভিযোগে প্রকল্পটির কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়। জুলাই অভ্যুত্থানের পর আইসিটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম প্রকল্পটি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিলেও অভিযোগের বিষয়টি সামনে আসায় তা আর এগোয়নি।
পরবর্তীতে আইসিটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব। তার দায়িত্বকালে প্রকল্পটি ঘিরে একাধিক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পের চুক্তি অনুযায়ী ‘ফ্যাক্টরি ফিজিক্যাল প্রি-অ্যাকসেপ্টেন্স টেস্ট’ (এফপিএটি) সম্পন্ন না হওয়ায় জাহাজীকরণ ও অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়া স্থগিত ছিল। এ অবস্থায় পূর্বে বাতিল হওয়া সরকারি আদেশ পুনরায় জারির জন্য প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে প্রস্তাব পাঠান ফয়েজ তৈয়্যব। তবে ওই প্রস্তাবে প্রকল্প-সংক্রান্ত দুর্নীতির অভিযোগ এবং দুদকের চলমান অনুসন্ধানের তথ্য গোপন রাখা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুদকের ভাষ্য অনুযায়ী, এর উদ্দেশ্য ছিল চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়েকে এলসির বিপরীতে অর্থপ্রাপ্তির সুযোগ করে দেওয়া। যদিও প্রধান উপদেষ্টা ওই প্রস্তাবে অনুমোদন দেননি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বিটিসিএলের ক্রয় কার্যক্রমে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন (পিপিএ) ২০০৬ এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর) ২০০৮ লঙ্ঘনের অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধান চলাকালেই হুয়াওয়ের অনুকূলে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
২০২৫ সালের ১৩ এপ্রিল ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ থেকে দুদক চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে চলমান অনুসন্ধান সত্ত্বেও এফপিএটি সম্পন্নের উদ্যোগ অব্যাহত রাখার কথা জানানো হয়। একই দিনে ফয়েজ তৈয়্যব দুদক চেয়ারম্যানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে মৌখিকভাবে অনুমোদন আদায়ের চেষ্টা করেছিলেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি।
তৎকালীন দুদক সচিব খোরশেদা ইয়াসমিন স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, প্রকল্পটি এভাবে এগিয়ে নিলে আইনের ব্যত্যয় ঘটবে।
দুদকের অনুসন্ধানে আরও বলা হয়েছে, এফপিএটি সম্পন্ন না হওয়ার প্রকৃত কারণ গোপন রেখে বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপন করা হয় এবং চুক্তির শর্ত উপেক্ষা করে এফপিএটি ছাড়াই জাহাজীকরণের নির্দেশ দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে এলসির অর্থ পরিশোধের পথ উন্মুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছিল।
এছাড়া ২০২৫ সালের ২২ জুন সরকারি লেটারহেড ব্যবহার করে দুদক চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো আরেকটি চিঠির মাধ্যমে অনুসন্ধান কার্যক্রমকে প্রভাবিত ও বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে ফয়েজ তৈয়্যবের চীন সফরের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। সরকারি আদেশ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত ওই সফরের ব্যয় বহন করে চাইনিজ এন্টারপ্রাইজেস অ্যাসোসিয়েশন মেম্বার্স ইন বাংলাদেশ (সিইএবি)। দুদকের অনুসন্ধানে দেখা যায়, বিটিসিএল প্রকল্পের কার্যাদেশপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ে ওই সংগঠনের সদস্য। এ কারণে বিষয়টিকে সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
দুদকের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ফয়েজ তৈয়্যবের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পেশাগত অসদাচরণ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দায়িত্ব পালনে অসততার পরিচায়ক। তিনি নিজে বা অন্যকে লাভবান করার উদ্দেশ্যে অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব অভিযোগের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০ ও ৫১১ ধারার পাশাপাশি দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারায় মামলা রুজুর সুপারিশ করেছে দুদক।