ধর্ষণের সময় উপস্থিত ছিলেন স্বপ্না! সহায়তা করেন সোহেলকে পালিয়ে যেতে
পল্লবীর শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যা মামলার রায়ে আদালত বলেছেন, উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি এবং সাক্ষ্য আইনের ১০৬ ধারার আলোকে আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনের সম্পৃক্ততা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করেন। পাশাপাশি ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় প্রচলিত আইন, রীতি ও বিচারিক নজিরও বিবেচনায় নেওয়া হয়।
রাষ্ট্রপক্ষে বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর যুক্তিতর্কে বলেন, আসামি সোহেল রানা ও স্বপ্না খাতুনের ফ্ল্যাট থেকেই রামিসা আক্তারের মাথাবিহীন লাশ এবং একটি বালতির ভেতর তার কাটা মাথা উদ্ধার করা হয়েছে, যা সাক্ষীদের জবানবন্দিতে প্রমাণিত হয়েছে।
তিনি আদালতকে জানান, সাক্ষ্য আইনের ১০৬ ধারা অনুযায়ী কোনো বিশেষ ঘটনা যদি কেবল নির্দিষ্ট ব্যক্তির জ্ঞাতসারে ঘটে, তবে সেই ঘটনার ব্যাখ্যা দেওয়ার দায়ও ওই ব্যক্তির ওপর বর্তায়। এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের পূর্ববর্তী সিদ্ধান্তের আলোকে তিনি যুক্তি দেন যে, রামিসা তাদের ফ্ল্যাটে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়নি—এটি প্রমাণ করার আইনগত দায়িত্ব আসামি সোহেল রানা ও ঘটনাস্থল থেকে আটক স্বপ্না খাতুনের ওপর বর্তাত।
রায়ে বিচারক উল্লেখ করেন, ১০৬ ধারার প্রয়োগের পাশাপাশি মামলার পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে হাইকোর্ট বিভাগের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করেন। আদালত বলেন, স্বপ্না খাতুন ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে ধর্ষণ, হত্যা, লাশ গুমের চেষ্টা এবং জানালার গ্রিল কেটে সোহেল রানাকে পালাতে সহায়তা করার মাধ্যমে অপরাধ সংঘটনে সহযোগিতা ও আলামত নষ্ট করার অপরাধে জড়িত ছিলেন।
আদালতের মতে, পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য, আলামত এবং অন্যান্য প্রমাণ বিশ্লেষণে এটি স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়েছে যে, রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও পরবর্তীতে হত্যা করার ঘটনায় সোহেল রানা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন এবং স্বপ্না খাতুন তাকে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করেছেন। ফলে উভয় আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
রায়ের প্রতিক্রিয়ায় আসামিপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মুসা কালিমুল্যাহ বলেন, আসামি সোহেল রানা দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছিলেন। আত্মপক্ষ সমর্থনে নিজেকে দোষ স্বীকার করেন। রায়ে সোহেল ও স্বপ্নার মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা হয়েছে। ন্যায় বিচার পেয়েছি। অপরাধী অপরাধের বিচার পেয়েছে। আমি সন্তুষ্ট।
রায় ঘোষণার পর তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়ায় ভুক্তভোগী ওই শিশুর বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বলেন, ‘আমি ১০০% খুশি। আলহামদুলিল্লাহ। এই রায়ে আমার মনের যে প্রত্যাশা, যে আকাঙ্ক্ষা সেটা আমি পেয়েছি। ইনশাআল্লাহ আমি শতভাগ আশাবাদী রায় দ্রুত কার্যকর হবে। আল্লাহ পাকের রহমত ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া সময়ের মধ্যে আমরা কাঙ্ক্ষিত রায় পেয়েছি। মাননীয় বিচারক, পুলিশ প্রশসন, সাংবাদিক ও বাংলাদেশের আপামর জনতা যারা আমার ও আমার পরিবারের বিপদের সময়ে মানসিকভাবে সহায়তা করেছেন সবার নিকট আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। অবশ্যই আমি আমার মেয়ের হত্যার বিচারের রায় দ্রুত কার্যকর দেখতে চাই।’
ন্যা হারানোর কষ্টের মাঝেও আদালতের রায়ের পর যেন কিছুটা স্বস্তি মেলে রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লার। রায়ের পর আকাশের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, আলহামদুলিল্লাহ। এ সময় রামিসার পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে রায় ঘোষণার পর দুই আসামিকে বেলা ১২টার দিকে আদালত থেকে প্রিজন ভ্যানে নেওয়া হয়। প্রথমে বেলা ১২টার দিকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি সোহেল রানাকে নেওয়া হয়। এরপর বেলা ১২টা ১০ মিনিটের দিকে অপর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ও সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে প্রিজন ভ্যানে তোলা হয়। এ সময় আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত বিক্ষুব্ধ জনতা দুই দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে উদ্দেশ করে ‘খুনি, খুনি’ স্লোগান দিতে থাকেন।