মা-বাবার ভরণ-পোষণ না দিলে কী শাস্তি? জেনে নিন
শৈশবে যে হাত দুটি আমাদের আঙুল ধরে হাঁটতে শিখিয়েছিল, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেই হাত দুটি যেন অবহেলা আর একাকীত্বে হারিয়ে না যায়— তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র গড়ে তুলেছে এক আইনি ঢাল। ২০১৩ সালে পাস হওয়া ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন’ কেবল একটি আইনি দলিল নয়, বরং এটি প্রবীণ বয়সে বাবা-মায়ের অধিকার ও সন্তানের দায়িত্বের এক রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি।
সমাজ ও পরিবারের চেনা পরিমণ্ডলে প্রায়শই শোনা যায় বৃদ্ধ বাবা-মায়ের অযত্ন কিংবা জোরপূর্বক বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেওয়ার গল্প। এমন বাস্তবতায় এই আইনটি প্রতিটি সন্তানের জন্য কিছু আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করেছে, যা লঙ্ঘন করলে গুণতে হতে পারে বড় জরিমানা, এমনকি হতে পারে জেলও।
মাত্র ৯টি ধারার এই আইনের ৬টিতে ভরণ-পোষণ সংক্রান্ত বিধান আলোচনা করা হয়েছে। এতে পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে ৩ নম্বর ধারায়। এই ধারায় ৭টি উপধারা রয়েছে। এখানে বলা হয়েছে— প্রত্যেক সন্তানকে তার পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো পিতা-মাতার একাধিক সন্তান থাকলে সে ক্ষেত্রে সন্তানরা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে তাদের পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করবে।
এই ধারার অধীনে পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রত্যেক সন্তানকে পিতা-মাতার একই সাথে একই স্থানে বসবাস নিশ্চিত করতে হবে। কোনো সন্তান তার পিতা বা মাতাকে বা উভয়কে তার, বা ক্ষেত্রবিশেষে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে, কোনো বৃদ্ধ নিবাস কিংবা অন্য কোথাও একত্রে বা আলাদা আলাদাভাবে বসবাস করতে বাধ্য করবে না।
এই ধারায় আরও বলা হয়েছে, প্রত্যেক সন্তান তার পিতা এবং মাতার স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজখবর রাখবে, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা ও পরিচর্যা করবে। পিতা বা মাতা কিংবা উভয়ই সন্তান থেকে পৃথকভাবে বসবাস করলে প্রত্যেক সন্তানকে নিয়মিতভাবে তার বা ক্ষেত্রবিশেষে তাদের সাথে সাক্ষাৎ করতে হবে। কোনো পিতা বা মাতা কিংবা উভয়ই সন্তানদের সাথে বসবাস না করে পৃথকভাবে বসবাস করলে পিতা বা মাতার প্রত্যেক সন্তান তার দৈনন্দিন আয়-রোজগার বা ক্ষেত্রবিশেষে মাসিক আয় বা বাৎসরিক আয় থেকে যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ অর্থ পিতা বা মাতা বা ক্ষেত্রবিশেষে উভয়কে নিয়মিত প্রদান করবে।
তবে ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইনে’ শুধু পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইনই নেই, এতে পিতা-মাতার অবর্তমানে দাদা-দাদী ও নানা-নানীর ভরণ-পোষণও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ৪ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে— প্রত্যেক সন্তান তার পিতার অবর্তমানে দাদা-দাদীকে এবং মাতার অবর্তমানে নানা-নানীকে ধারা ৩-এ বর্ণিত ভরণ-পোষণ প্রদানে বাধ্য থাকবে। এই ভরণ-পোষণ পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ হিসেবে গণ্য হবে।
পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ না করার দণ্ডের বিধান নির্ধারণ করা হয়েছে ধারা ৫-এ। ৫(১) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো সন্তান কর্তৃক ধারা ৩-এর যে কোনো উপ-ধারার বিধান কিংবা ধারা ৪-এর বিধান লঙ্ঘন অপরাধ বলে গণ্য হবে এবং এই অপরাধের জন্য অনূর্ধ্ব ১ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবে। এই অর্থদণ্ড অনাদায়ের ক্ষেত্রে অনূর্ধ্ব ৩ মাস কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবে।
ধারা ৫(২) বলছে, কোনো সন্তানের স্ত্রী বা ক্ষেত্রবিশেষে স্বামী কিংবা পুত্র-কন্যা বা অন্য কোনো নিকট আত্মীয় ব্যক্তি পিতা-মাতার বা দাদা-দাদীর বা নানা-নানীর ভরণ-পোষণ প্রদানে বাধা প্রদান করলে বা পিতা-মাতার বা দাদা-দাদীর বা নানা-নানীর ভরণ-পোষণ প্রদানে অসহযোগিতা করলে তিনি এমন অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করেছেন গণ্য করে উপ-ধারা ১-এ উল্লিখিত দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
অবশ্য এই আইনের ৬ষ্ঠ ধারা অনুযায়ী, এই অপরাধ আমলযোগ্য, জামিনযোগ্য এবং আপোষযোগ্য। সপ্তম ধারা অনুযায়ী,ফৌজদারী কার্যবিধি, ১৮৯৮-এ যা কিছুই থাকুক না কেন, এই আইনের অধীনে সংঘটিত অপরাধ প্রথম শ্রেণির জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে বিচারযোগ্য হবে। কোনো আদালত এই আইনের অধীনে সংঘটিত অপরাধ সংশ্লিষ্ট সন্তানের পিতা বা মাতার লিখিত অভিযোগ ছাড়া আমলে গ্রহণ করবে না।
আপোষ-নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ধারা ৮(১)-এ বলা হয়েছে, আদালত এই আইনের অধীনে প্রাপ্ত অভিযোগ আপোষ-নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা মেম্বার কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভার মেয়র বা কাউন্সিলর, কিংবা অন্য যে কোনো উপযুক্ত ব্যক্তির কাছে পাঠাতে পারবে। উপ-ধারা (১)-এর অধীনে কোনো অভিযোগ আপোষ-নিষ্পত্তির জন্য পাঠানো হলে সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যান, মেয়র, মেম্বার বা কাউন্সিলর উভয় পক্ষকে শুনানির সুযোগ প্রদান করে তা নিষ্পত্তি করবেন এবং এইভাবে নিষ্পত্তিকৃত অভিযোগ উপযুক্ত আদালত কর্তৃক নিষ্পত্তিকৃত বলে গণ্য হবে।