১৩ মে ২০২৬, ০১:৪২

ভারতে এমপি আনার খুনের দুই বছর—তদন্তে নেই অগ্রগতি

আনোয়ারুল আজিম আনার ও তার মেয়ে ডরিন  © সংগৃহীত

ঝিনাইদহ-৪ আসনে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনারকে বিকৃতভাবে হত্যাকাণ্ডের দুই বছর পার হলেও এখনো শেষ হয়নি মামলার তদন্তকার্যক্রম। কবে নাগাদ তদন্ত শেষ হবে তাও বলতে পারছেন না তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।

ভারত থেকে উদ্ধার খণ্ড-বিখণ্ড দেহাংশ শনাক্ত করার জন্য ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে ডিএনএ নমুনা দেন মামলার বাদী আনারের মেয়ে মুমতারিন ফেরদৌস ডরিন। সেই পরীক্ষার প্রতিবেদন এখনো হাতে পায়নি বাংলাদেশের তদন্ত সংস্থা।

বাংলাদেশের তদন্ত সংস্থা জানায়, এই ব্যক্তিই কী সাবেক এমপি আনার? তা এখনো পর্যন্ত নিশ্চিত হতে পারেনি। ডিএনএ পরীক্ষাসহ অন্যান্য প্রতিবেদনের ওপরই অনেকটাই নির্ভর করছে দেশের তদন্তের এই অগ্রগতি। 

জানা গেছে, ২০২৪ সালের ১১ মে চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়ে তিনি নিখোঁজ হন ঝিনাইদহ-৪ আসনের তিনবারের সাবেক সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনার। তার বন্ধু স্বর্ণ ব্যবসায়ী গোপাল বিশ্বাস কলকাতায় জিডি করার পর দুই দেশে তদন্ত শুরু হয়। পরে জানা যায়, এমপি আনারকে কলকাতার এক বাড়িতে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। ওই ঘটনায় কলকাতায় মামলা হয়। এ ছাড়াও নিহত আনারের মেয়ে ডরিনও রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় খুনের উদ্দেশ্য অপহরণের অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করেন।

বর্তমানে মামলাটি থানা পুলিশ, ডিবি পুলিশের হাত ঘুরে এখন তদন্ত করেছেন সিআইডি পুলিশ। সর্বশেষ গত ৬ মে মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দিন ধার্য ছিল। কিন্তু ওইদিনও মামলার তদন্ত সংস্থা সিআইডি পুলিশ প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেননি। এখন পর্যন্ত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ১৯ বারের মত সময় পেয়েছেন তদন্ত সংস্থাটি।

মামলাটির তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে সিআইডির পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) খান মো.  এরফান জানায়, মামলাটি এখনো তদন্তাধীন। ভারতে উদ্ধার ভিকটিম আনারের খণ্ড-বিখণ্ড মরদেহের অংশ শনাক্ত করার জন্য তার মেয়ে ডরিন ডিএনএ নমুনা দিয়েছে। আমরা সেই ডিএনএ রিপোর্টের জন্য ইন্টারপোলের মাধ্যমে আবেদন করেছি। প্রায় চার মাস আগে এই আবেদন করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত কোন কাগজপত্র আমাদের কাছে আসেনি। আমরা এখন পর্যন্ত নিশ্চিতও নয়, এই ব্যক্তি-ই সাবেক এমপি আনার। এছাড়াও তদন্তের স্বার্থে ইন্টারপোলের মাধ্যমে এই মামলার অন্যান্য কাগজপত্রই চাওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, তবে বাংলাদেশ তদন্ত কাজ অব্যাহত রয়েছে। কিছুটা হলেও অগ্রগতি রয়েছে। এই মুহুর্তে তদন্তের স্বার্থে সব খোলাসা করে বলা যাচ্ছে না। ভারতের তদন্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আশা করি, ডিএনএ রিপোর্টসহ অন্যান্য কাগজপত্র হাতে আসলে তদন্ত আরও বেগবান হবে।

এদিকে বাবা আনোয়ারুল আজিম আনার হত্যার দুই বছরেও তদন্ত রিপোর্ট না আসা ও আসামিদের জামিন হওয়াই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মামলার বাদী ও নিহতের ছোট মেয়ে মুমতারিন ফেরদৌস ডরিন। তিনি বলেন, আমার বাবার হত্যায় যারা আসামি তারা সবাই এখন জামিনে। এই মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে এর মধ্যে তারা কোন অদৃশ্য ক্ষমতাবলে জামিন পায় আমি বুঝিনা। সরকারের কাছে আমার আবেদন আমার বাবার হত্যাকারীদের বিচার নিশ্চিত করা হোক। 

তিনি বলেন, সরকারের কাছে আমি দাবি জানাই আমার বাবার লাশের যে টুকরাগুলো পাওয়া গেছিল তা যেন দেশে ফিরিয়ে এনে আমাদের কাছে হস্তান্তর করে। একদিকে আমার বাবা নাই অন্যদিকে ছাত্রলীগ করার দ্বায়ে আমার স্বামীকে গ্রেফতার করে কারাগারে রেখেছে সরকার। আমার মতো অসহায় আর কেউ নাই।
 
জানা যায়, মুমতারিন ফেরদৌস ডরিন স্বামী ছাত্রলীগের সাবেক নেতা জুবায়ের আহমেদ। তিনি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের দ্বায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি কারাগারে আছেন। 

মামলার বিষয়ে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, ‘মামলাটির বিষয়বস্তু দুই দেশের মধ্যে। অপরাধ সংঘটনের স্থানও দুই দেশের মধ্যে। দুই দেশের তথ্য সংগ্রহ করতে তদন্ত কর্মকর্তার একটু সময় লাগছে। রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আমরা প্রস্তুত রয়েছি। মামলাটির প্রতিবেদন আসা মাত্রই গুরুত্বের সাথে দেখা হবে।’

মামলা সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১২ মে ভারতে গিয়ে সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম ওঠেন তার বন্ধু গোপাল বিশ্বাসের বরানগরের বাড়িতে। চিকিৎসা করাতে যাবেন বলে পরের দিন ১৩ মে গোপালের বাড়ি থেকে বের হন আনার। ওই দিন রাতেই নিউ টাউনের বহুতল আবাসন সঞ্জীবা গার্ডেনের একটি ফ্ল্যাটে তাকে হত্যা করা হয়। তবে বিষয়টি প্রকাশ পায় ১০ দিন পর। ওই বছরের ২২ মে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, এমপি আনারকে কলকাতার এক বাড়িতে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। পরে ভারতীয় পুলিশের দেওয়া তথ্যে বাংলাদেশের পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে। কিন্তু হত্যাকাণ্ডের ‘হোতা’ আখতারুজ্জামান শাহীন নেপালের কাঠমান্ডু হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে গেছে। 

এদিকে তাৎক্ষণিকভাবে হত্যাকাণ্ডের এই ঘটনায় কলকাতার পুলিশ জিহাদ হাওলাদার নামে এক কসাইকে গ্রেপ্তার করে। আর শাহীনের সহকারী সিয়াম হোসেন কাঠমান্ডুতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাকে ভারতের কাছে হস্তান্তর করে নেপালের পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে সিয়ামের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাকে নিয়ে ভাঙড়ের বিজয়গঞ্জ বাজার থানা এলাকার কৃষ্ণমাটিতে বাগজোলা খালে নামে কলকাতার সিআইডি। পরে একটি ঝোপের পাশ থেকে বেশ কিছু হাড়গোড় উদ্ধার করা হয়। পরবর্তীতে পশ্চিমবঙ্গের মামলায় ওই বছরের আগস্টে উত্তর ২৪ পরগনার বারাসাত জেলা আদালতে জিহাদ হাওলাদার ও মোহাম্মদ সিয়ামকে আসামি করে প্রায় ১২০০ পাতার চার্জশিট জমা দেয় কলকাতার সিআইডি।

এদিকে মামলাটিতে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের ৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হলেন, ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টু, জেলার ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক কাজী কামাল আহমেদ বাবু ওরফে গ্যাস বাবু, সৈয়দ আমানুল্লাহ আমান ওরফে শিমুল ভূঁইয়া, ফয়সাল আলী সাজী ওরফে তানভীর ভূঁইয়া, সেলেষ্টি রহমান, মোস্তাফিজুর রহমান ও ফয়সাল আলী। এদের মধ্যে ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টু ও জেলার ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক কাজী কামাল আহমেদ বাবু ওরফে গ্যাস বাবু উচ্চ আদালত থেকে জামিনে রয়েছে। এই সাত জনের মধ্যে মিন্টু ছাড়া ৬ জনই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।