০৮ মার্চ ২০২৬, ০২:৫৭

ঘুষের টাকা ফেরত চাইতে গিয়ে কারাগারে, সেই মা–মেয়েকে খালাস

ভূক্তভোগী মা-মেয়ে   © সংগৃহীত

কক্সবাজারের পেকুয়া থানায় ঘুষের টাকা ফেরত চাইতে গিয়ে পুলিশি নির্যাতনের শিকার মা ও মেয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজাপ্রাপ্ত হওয়ার পর অবশেষে খালাস পেয়েছেন। শনিবার (৭ মার্চ) কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালত তাদের বিরুদ্ধে দেওয়া এক মাসের সাজা বাতিল করে বেকসুর খালাস দেন।

খালাস পাওয়া দুজন হলেন রেহেনা মোস্তফা রানু (৩৮) ও তার মেয়ে কলেজ শিক্ষার্থী জুবাইদা জান্নাত (২৩)। মুক্তির পর তাদের দ্রুত চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়, কারণ তাদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন ছিল এবং জুবাইদা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন।

শনিবার রাতে রেহেনা আক্তার অভিযোগ করেন, ঘুষের টাকা ফেরত চাইতে গেলে পেকুয়া থানায় তাদেরকে পুলিশ মারধর করে রক্তাক্ত করেছে। তিনি বলেন, 'আমি এবং আমার মেয়েকে পুলিশ প্রচণ্ড মারধর করে। মারধরের পর থানায় ইউএনও স্যার আসেন। আমরা মনে করেছিলাম তিনি আমাদের রক্ষা করতে এসেছেন। কিন্তু তিনি আমাদের রক্তাক্ত অবস্থায় দেখেও কিছু বলেননি।'

তিনি আরও অভিযোগ করেন, পরে পুলিশ তাদের কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেয়ার কথা বলে গাড়িতে তোলে। পথে ইফতারের সময় হলে তারা পানির জন্য অনুরোধ করলেও পুলিশ পানি দেয়নি এবং ইফতার করতেও দেয়নি। পরে হাসপাতালে না নিয়ে সরাসরি কারাগারে পাঠানো হয়। তাদের শারীরিক অবস্থা দেখে প্রথমে কারা কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করতে না চাইলেও ইউএনও’র ফোনে পরে গ্রহণ করা হয় বলে তিনি দাবি করেন।

জানা গেছে, জুবাইদার জন্মের পর তার বাবা-মায়ের মধ্যে বিচ্ছেদ হয় এবং ২০১৩ সালে তার বাবার মৃত্যু হয়। এরপর বাবার সম্পত্তির অংশ দাবি করতে গিয়ে চাচা ও ফুফুদের সঙ্গে বিরোধে জড়ান জুবাইদা। একপর্যায়ে তিনি আদালতে মামলা করেন। আদালত মামলার তদন্তভার দেয় পেকুয়া থানাকে। তদন্তের দায়িত্ব পান এসআই পল্লব। অভিযোগ রয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদনের জন্য এসআই পল্লব জুবাইদার কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা ঘুষ নেন, কিন্তু পরে তিনি জুবাইদার চাচাদের প্রভাবে মিথ্যা প্রতিবেদন দেন।

ক্ষুব্ধ হয়ে গত বুধবার বিকেলে জুবাইদা ও তার মা পেকুয়া থানায় গিয়ে এসআই পল্লবের কাছে ঘুষের টাকা ফেরত চান। এ নিয়ে বাকবিতণ্ডার এক পর্যায়ে তাদের মারধর করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে পেকুয়া থানার ওসি খাইরুল আলম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহবুব আলমকে থানায় ডেকে আনেন। পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগ তুলে ইউএনও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে মা–মেয়েকে এক মাসের সাজা দেন।

মুক্তি পাওয়ার পর রেহেনা আক্তার দাবি করেন, তাদের সামনে কোনো বিচারিক কার্যক্রম হয়নি এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিষয়ে তারা কিছুই জানতেন না। কক্সবাজার কারাগারে পৌঁছানোর পর জানতে পারেন তাদের সাজা হয়েছে।

স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন, পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগ থাকলে নিয়ম অনুযায়ী ফৌজদারি আইনে মামলা করে গ্রেপ্তার করা যেত। কিন্তু তা না করে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে, যা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, থানার ভেতরে মা–মেয়েকে নির্যাতনের অভিযোগ আড়াল করতেই এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। স্থানীয়রা ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট ইউএনও, ওসি ও জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে পেকুয়া থানার ওসি খাইরুল আলমের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। একইভাবে অভিযুক্ত ইউএনও মাহবুব আলমও মন্তব্য করেননি।