ছাত্র-জনতা অংশগ্রহণে স্মরণকালের দীর্ঘ বিক্ষোভ মিছিল করেছিল নোয়াখালীতে
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ে ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট নোয়াখালীর রাজপথে নেমেছিল স্মরণকালের অন্যতম বৃহৎ বিক্ষোভ মিছিল। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে আয়োজিত সেই কর্মসূচিতে ছাত্র-জনতার পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণে জেলা শহর পরিণত হয়েছিল জনসমুদ্রে। আন্দোলন-সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ওই দিনের মিছিলই নোয়াখালীতে সরকারবিরোধী আন্দোলনে নতুন গতি এনে দেয়।
২০২৪ সালের ৩ আগস্ট দুপুর থেকেই নোয়াখালীর রাজপথ দখলে নেন ছাত্র-জনতা। মাইজদী বাজার থেকে শুরু হওয়া বিশাল বিক্ষোভ মিছিল জেলা শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। মিছিলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক, সাধারণ শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
এ সময় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরাও কর্মসূচিতে যোগ দেন। আন্দোলনকারীদের দাবি, রাজনৈতিক দলগুলোর এই অংশগ্রহণে আন্দোলনে থাকা শিক্ষার্থীদের মনোবল আরও বেড়ে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, নোয়াখালী জেলা শহরে এত বড় মিছিল আগে কখনো দেখা যায়নি। তাদের দাবি, মিছিলটি এত দীর্ঘ ছিল যে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের মানুষ দেখা যাচ্ছিল না। শুরু দেখা গেলেও শেষ দেখা যাচ্ছিল না। স্থানীয়দের ধারণা, সেদিনের মিছিলে ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ অংশ নিয়েছিলেন।
আন্দোলন-সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ওই দিনের কর্মসূচি ঘিরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সোনাপুর, পশ্চিম মাইজদী, লক্ষ্মীনারায়ণপুর, মাইজদী বাজার ও হরিনারায়ণপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান নেন। তারা আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে মহড়া দেন এবং ফাঁকা গুলিও ছোড়েন। তবে আন্দোলনকারীদের বিশাল উপস্থিতির কারণে তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি বলে দাবি করা হয়।
সেদিন হামলার শিকার হন সংবাদ সংগ্রহে থাকা কয়েকজন সাংবাদিকও। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, হামলায় একাধিক সাংবাদিক আহত হন।
আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের তথ্যসূত্রে, ১ আগস্ট জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ ঘোষণার পর তাদের নেতাকর্মীরা আরও সক্রিয়ভাবে মাঠে নামেন। তাদের দাবি, ৩ আগস্টের মিছিলে জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের প্রায় ২০ হাজার নেতাকর্মী অংশ নেন। এতে আন্দোলনে থাকা শিক্ষার্থীরা আরও সাহস পান।
বিকেলে বিক্ষোভকারীরা নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে আগুন দেন। আন্দোলনকারীদের ভাষ্য, ওই দিনের ঘটনাই নোয়াখালীতে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে দেয়। কার্যালয়ে আগুন লাগার পর দলটির নেতাকর্মীরা আর মাঠে নেমে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারেননি বলেও তারা দাবি করেন।
আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক নাহিদা সুলতানা ইতু ৩ আগস্টের স্মৃতিচারণ করে বলেন, তখন আন্দোলনকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও ভয় কাজ করছিল। তারা ভাবছিলেন, আন্দোলন ব্যর্থ হলে সবকিছু শেষ হয়ে যাবে। তাই ঘরে বসে না থেকে সর্বশক্তি নিয়ে রাজপথে নামার সিদ্ধান্ত নেন তারা।
তিনি বলেন, সেদিনের মিছিলে ৫০ হাজারের বেশি মানুষ জড়ো হয়েছিল। সেই জনসমাগম দেখে স্বৈরাচারী সরকারের ভিত কেঁপে ওঠে। একই সঙ্গে আন্দোলনকারীরাও নতুন সাহস ও আত্মবিশ্বাস পান। ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন তারা কখনো ভুলবেন না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নাহিদা সুলতানা ইতু আরও বলেন, স্বৈরশাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ৩ আগস্টের সেই মিছিল থেকেই আন্দোলনকারীরা স্বৈরশাসনের অবসানের শপথ নেন। তবে মিছিল শেষে বাড়ি ফেরার পথে তাদের সহযোদ্ধাদের ওপর হামলা চালানো হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের মানুষকে যেন এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়, সেই প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন এই আন্দোলন-সংগঠক।