০২ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৪১

সারা দেশে বিক্ষোভ ও সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা

‘সর্বাত্মক অসহযোগ’ আন্দোলনের ঘোষণা  © সংগৃহীত

আজ ২ আগস্ট। জুলাই অভ্যুত্থানের ইতিহাসে আলোচিত একটি দিন। ২০২৪ সালের এই দিনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কেরা সারা দেশে ৩ আগস্ট বিক্ষোভ মিছিল এবং ৪ আগস্ট থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ‘সর্বাত্মক অসহযোগ’ আন্দোলনের ঘোষণা দেন। সারা দেশে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ, ৯ দফা দাবি বাস্তবায়ন এবং তৎকালীন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমা চাওয়ার দাবিতে এই কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছিল।

২০২৪ সালের ২ আগস্ট (শুক্রবার) রাতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক পোস্টে নতুন কর্মসূচির ঘোষণা দেন।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষে দেওয়া ওই পোস্টে তিনি লেখেন, সারা দেশে ছাত্র-নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে হামলা ও হত্যার প্রতিবাদ এবং ৯ দফা দাবিতে ৩ আগস্ট সারা দেশে বিক্ষোভ মিছিল এবং ৪ আগস্ট থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ‘সর্বাত্মক অসহযোগ’ আন্দোলন পালন করা হবে।

তিনি আরও লেখেন, কর্মসূচি সফল করতে সারা দেশের মানুষকে অলিগলি, পাড়া-মহল্লায় সংগঠিত হওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

একই দিনে আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক মাহিন সরকার হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো এক বার্তায়ও নতুন কর্মসূচির ঘোষণা দেন। আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াও সেই বার্তা শেয়ার করেন।

অন্যদিকে, আরেক সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসউদ ফেসবুক লাইভে এসে ৩ আগস্ট দেশব্যাপী বিক্ষোভ এবং ৪ আগস্ট থেকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দেন।

তিনি বলেন, অসহযোগ আন্দোলনের অংশ হিসেবে কেউ ট্যাক্স, গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করবেন না। বাংলাদেশ সচিবালয়সহ সব সরকারি ও বেসরকারি অফিস বন্ধ থাকবে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবন গণভবন এবং রাষ্ট্রপতির বাসভবন বঙ্গভবনে কোনো যানবাহন প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।

সরকারকে কোনো ধরনের সহযোগিতা না করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জনগণকে এমনভাবে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে সরকার স্বাভাবিকভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে না পারে।

এর আগের দিন, ১ আগস্ট, আন্দোলনের ছয় সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, সারজিস আলম, হাসনাত আব্দুল্লাহ, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, নুসরাত তাবাসসুম ও আবু বকর মজুমদার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজত থেকে মুক্তি পান।

মুক্তির পর এক যৌথ বিবৃতিতে তারা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেন এবং আন্দোলনে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেন।

পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল। তবে সমন্বয়কেরা দাবি করেন, তারা কোনো নিরাপত্তা চাননি। তাদের আটকে রাখা ছিল অসাংবিধানিক ও বেআইনি।

তারা আরও জানান, ৩০ জুলাই থেকে ডিবি হেফাজতে থাকা অবস্থায় তারা অনশন শুরু করেছিলেন। বিষয়টি পরিবারের কাছ থেকে গোপন রাখা হয় এবং তাদের জোর করে গোয়েন্দা কার্যালয়ের খাবার টেবিলে বসানো হয়েছিল।

ডিবি কার্যালয় থেকে প্রচারিত আন্দোলন প্রত্যাহারের বিবৃতির বিষয়ে তারা বলেন, সেটি তারা স্বেচ্ছায় দেননি।

এদিকে ২ আগস্ট রাজধানীসহ সারা দেশে বৃষ্টি উপেক্ষা করে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। তারা হত্যাকাণ্ডের বিচার, গণগ্রেপ্তার বন্ধ এবং গ্রেপ্তার হওয়া শিক্ষার্থীদের মুক্তির দাবি জানান।

শুক্রবার জুমার নামাজের পর রাজধানীর সায়েন্সল্যাব থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উদ্যোগে গণমিছিল বের হয়। আন্দোলনকারীরা ৯ দফা দাবির পক্ষে স্লোগান দেন এবং দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।

একই দিন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম থেকে সাধারণ মুসল্লিরাও বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। পল্টন মোড়, প্রেসক্লাব ও মৎস্য ভবন এলাকা ঘুরে মিছিলটি শাহবাগ হয়ে আবার প্রেসক্লাবে গিয়ে শেষ হয়। পুরো সময় মিছিলের সামনে ও পেছনে বিপুল সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন ছিলেন। মুসল্লিরা সব হত্যাকাণ্ডের বিচার, গণগ্রেপ্তার বন্ধ এবং আটক শিক্ষার্থীদের মুক্তির দাবি জানান।

রাজধানীতে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিসহ (ইউআইইউ) কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও গণমিছিল করেন। পুলিশি নিরাপত্তায় মিছিলটি প্রগতি সরণি প্রদক্ষিণ করে ক্যাম্পাসে ফিরে যায়।

রাজধানীর সায়েন্সল্যাব, মিরপুর-১০, আফতাবনগর ও শাহবাগ এলাকায় সড়ক অবরোধ করেন আন্দোলনকারীরা। টাঙ্গাইল শহরে কয়েক হাজার আন্দোলনকারী ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করেন, যাদের বেশির ভাগই ছিলেন শিক্ষার্থী।

রাজধানীতে ছাত্র, শিক্ষক, সাংস্কৃতিক কর্মী, অভিভাবক ও নাগরিক সমাজের সদস্যরা বিকেল ৩টায় জাতীয় প্রেসক্লাব থেকে ‘দ্রোহযাত্রা’ নামে গণমিছিল বের করেন। মিছিলটি শহীদ মিনারে গিয়ে শেষ হয়। পথে আরও অনেকে এতে যোগ দেন। হাজারো মানুষের অংশগ্রহণে আয়োজিত ওই মিছিলে ‘স্টেপ ডাউন হাসিনা’, ‘ছাত্র হত্যার বিচার চাই’ এবং ‘গুলিতে মরতে পারি, পিছু হটবো না’ লেখা প্ল্যাকার্ড দেখা যায়।

আরও পড়ুন: রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় প্রার্থী চূড়ান্তের দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীকে দিয়েছে বিএনপির স্থায়ী কমিটি

সমাবেশে বক্তারা গণগ্রেপ্তার বন্ধ, জুলাই হত্যাযজ্ঞের বিচার, গ্রেপ্তার হওয়া শিক্ষার্থীদের মুক্তি, কারফিউ প্রত্যাহার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া এবং তৎকালীন সরকারের পদত্যাগের দাবি জানান। দ্রোহযাত্রা শুরুর আগে এক সমাবেশে বক্তব্য দেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। সমাবেশ শেষে বক্তারা পরদিন আরেকটি গণমিছিলেরও ঘোষণা দেন।

একই দিন ‘পোয়েটস অ্যান্ড রাইটারস অ্যাগেইনস্ট কান্ট্রিওয়াইড অ্যারেস্টস অ্যান্ড অপ্রেশন’ ব্যানারে লেখক, কবি, প্রকাশক ও নগর পরিকল্পনাবিদরা এবং ‘প্রতিবাদ মঞ্চ’ ব্যানারে শিক্ষক, অধিকারকর্মী, চিকিৎসক ও মেডিকেল শিক্ষার্থীরাও পৃথক কর্মসূচি পালন করেন। পাশাপাশি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬২৬ জন শিক্ষক চলমান আন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন।

ঢাকার বাইরে খুলনা, হবিগঞ্জ, সিলেট, নরসিংদী, চট্টগ্রাম, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন জেলায় বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

হবিগঞ্জে সংঘর্ষে এক শ্রমিক নিহত হন। খুলনায় আন্দোলনকারীদের হামলায় এক পুলিশ কনস্টেবল নিহত হয়েছেন বলে দাবি করে পুলিশ। রাজধানীর উত্তরা-১১ নম্বর সেক্টরে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে অন্তত তিনজন রাবার বুলেটে আহত হন।

গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে সংঘর্ষে অন্তত দুজন নিহত এবং কমপক্ষে ১৫০ জন আহত হন।

২ আগস্ট ইউনিসেফের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক আঞ্চলিক পরিচালক সঞ্জয় উইজেসেকেরা বাংলাদেশ সফর শেষে এক বিবৃতিতে আন্দোলন ঘিরে শিশুদের ওপর সহিংসতার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, ইউনিসেফ নিশ্চিত হয়েছে যে জুলাই মাসের আন্দোলনে অন্তত ৩২ জন শিশু নিহত হয়েছে। আরও অনেক শিশু আহত ও আটক হয়েছে। ইউনিসেফ সব ধরনের সহিংসতার নিন্দা জানায়।

ইউনিসেফের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, জুলাই মাসে আন্দোলন চলাকালে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে অন্তত ২০০ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে অন্তত ৩২ জন শিশু ছিল।

১৬ জুলাই থেকে ২১ জুলাই পর্যন্ত দেশজুড়ে সহিংসতার পর সরকার আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন শুরু করে। ২ আগস্ট পর্যন্ত চলা এক সপ্তাহের চিরুনি অভিযানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ১০ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তার হওয়াদের মধ্যে শিক্ষার্থী, বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী এবং সাধারণ মানুষও ছিলেন।

অন্যদিকে, সেদিন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, কোটা নিয়ে শিক্ষার্থীদের দাবি বাস্তবায়নের পরও একটি স্বার্থান্বেষী মহল সরকার ও শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে।