২৮ জুলাই ২০২৬, ১০:১৮

কাইয়ুমের মৃত্যুতে থেমে গেছে পরিবারের স্বপ্ন, অর্থকষ্টে টিকে থাকার লড়াই বাবা-মায়ের

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী শহীদ আব্দুল কাইয়ুম  © টিডিসি সম্পাদিত

শহীদ আব্দুল কাইয়ুম। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। এই তরুণের স্বপ্ন ছিল লেখাপড়া শেষ করে বড় কিছু করা। কখনো ব্যবসা, কখনো সরকারি চাকরি, যে পথেই যাক না কেন, একটাই লক্ষ্য ছিল বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটানো। কিন্তু জুলাই আন্দোলনে তার মৃত্যু শুধু একটি প্রাণই কেড়ে নেয়নি, ভেঙে দিয়েছে একটি পরিবারের সব স্বপ্ন।

আব্দুল কাইয়ুম ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সময় ঢাকার সাভারের নিউমার্কেট এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন। পরদিন ৬ আগস্ট চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। তিনি নেই আজ দুই বছর। এখন সাভারের একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করেন তার বাবা-মা। সংসারের সবচেয়ে বড় অবলম্বনকে হারিয়ে তাদের দিন কাটছে সরকারি ভাতা, সীমিত কিছু সহায়তা আর ছেলের অসংখ্য স্মৃতি নিয়ে।

পরিবারের বর্তমান অবস্থা
কাইয়ুমের মা কুলসুম বলেন, ‘এভাবে হয় না বাবা, অনেক কষ্ট করে আমার সংসার চলে। আমার বাবায় থাকতেও যেমন কষ্ট করে সংসার চালাইছি, এখনও তেমনই কষ্ট করে চলতেছি। এখন তো এই ২০ হাজার টাকার ওপরেই আমার সংসার চলে। আপনার আঙ্কেলের (কাইয়ুমের বাবা) কানের সমস্যা, শরীরের সমস্যা কাজকর্ম করতে পারে না।’

তিনি জানান, পরিবারের বড় ছেলে কিছু আয় করলেও সেই টাকা দিয়ে তার নিজের সংসারই চলে। তার ভাষ্য, ‘আমার সংসারে কেউ টাকা ইনকাম করে না। বড় ছেলে যে কয় টাকা ইনকাম করে, ওইটা ওর ছেলে-মেয়ে, বউয়ের জন্যই লাগে। আমরা কোনোদিন ওর কাছে কিছু চাই না। হঠাৎ যদি খুশি হইয়া দুই-চারশ টাকা দেয়, তাইলে নেই। জোর করি না।’

আব্দুল কাইয়ুম ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সময় ঢাকার সাভারের নিউমার্কেট এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন। পরদিন ৬ আগস্ট চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। তিনি নেই আজ দুই বছর। এখন সাভারের একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করেন তার বাবা-মা। সংসারের সবচেয়ে বড় অবলম্বনকে হারিয়ে তাদের দিন কাটছে সরকারি ভাতা, সীমিত কিছু সহায়তা আর ছেলের অসংখ্য স্মৃতি নিয়ে।

কাইয়ুমের বাবা কফিল উদ্দিন জানান, তারা বর্তমানে সাভারের একটি ভাড়া বাসায় থাকেন। তিনি বলেন, ‘সরকার যে ভাতা দেয়, ওইটা দিয়া টুকটাক কইরা সংসার চলতাছে। কিন্তু এই টাকায় সব হয় না। বাসা ভাড়াই ৮ হাজার টাকা।’

সংসারের হাল ধরেছিলেন কাইয়ুম
কাইয়ুমের মা বলেন, ‘ও (কাইয়ুম) অনেক কষ্ট করে সংসার চালাইছে বাবা। কুমিল্লায় তিনদিন থাকত, আবার তিনদিন সাভারে থাকত। এইখানে আইয়া টিউশনি করত। ভোরবেলা উঠে দুধ আনতো, দুধ বিক্রি করতো। আবার দইয়ের অর্ডার নিয়া দই বিক্রি করতো। আবার ভর্তি কোচিং চালাইতো। এইভাবে জোড়াতালি দিয়া আমার সংসারটা চালাইছে। বছরের অন্য সময় টিউশনি আর ছোটখাটো ব্যবসা করেই সংসারের খরচ জোগাতো।’

সরকারি সহায়তা
কাইয়ুম নিহত হওয়ার পর সরকারের পক্ষ থেকে মাসিক ২০ হাজার টাকা ভাতা পাচ্ছে পরিবার। এ বিষয়ে কাইয়ুমের মা বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে পরিবারভিত্তিক ২০ হাজার টাকা ভাতা পাই। তবে এইটা কতদিন দিব, এইটা কেউ কইয়া দেয় নাই। ভাতা নিয়ে নানা ধরনের কথা শুনছেন। কেউ কয় আমরা যতদিন বাইচা থাকমু ততদিন পাইমু। আবার কেউ কয় বন্ধও কইরা দিতে পারে। আসলে নিশ্চিত কইরা কেউ কিছু জানায় নাই।’

সরকারের কাছে কোনো প্রত্যাশা আছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘চাওয়া-পাওয়ার মধ্যে আর কী কমু বাবা? আমাগো কি চাওয়া-পাওয়া কেউ পূরণ কইরা দিব? আমরা তো মানুষের বাড়িতে ভাড়া থাকি। একটা নিজের বাড়ি থাকলে ভালো হইতো। আমার ছেলে বাইচা থাকলে অনেক টাকা কামাই করতো, অনেক কিছু করতো। আমার ছেলের মৃত্যু যদি এইভাবেই লেখা থাকে, তাইলে হইছে। কিন্তু মানুষ যদি বিবেক দিয়া কিছু করে, তাইলে আর কী চাই?’

শোকের সঙ্গে প্রতিদিনের লড়াই
ছেলে হারানোর শোক এখনও প্রতিটি মুহূর্তে তাড়া করে বেড়ায় পরিবারটিকে। কাইয়ুমের মা বলেন, ‘ও থাকলে আমার সংসারটা অন্যরকম হইতো। এখন ওর কথা মনে হইলেই বুকটা ফাইটা যায়। তবু জীবন তো থাইমা থাকে না। কষ্ট কইরাই চলতেছি।’

কাইয়ুমের বাবা বলেন, ‘আল্লাহ যেমন চালাইতাছে, তেমনই চলতাছে। আল্লাহ না চালাইলে তো আর আমরা চালাইতে পারুম না।’

খোঁজ রাখে না এনসিপি, বিএনপি-ছাত্রদল
সরকারি মাসিক ভাতা পেলেও রাজনৈতিক দল জামায়েত ইসলামী এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের সহায়তা করেছেন বলে জানান আব্দুল কাইয়ুমের মা। তিনি বলেন, ‘কাইয়ুম নিহত হওয়ার প্রায় এক মাস পর এক লাখ টাকা এবং দুই-তিন মাস পর আরও এক লাখ টাকা দেয় জামায়াতে ইসলামী। মিছা কথা কমু ক্যা? পরেরটা খাইয়া মিছা কইতে পারুম না।’

শুধু আর্থিক সহায়তাই নয়, ঈদকেন্দ্রিক সহায়তার কথাও বলেন তিনি। কুলসুম বলেন, ‘জামায়াতের থেকে রোজার ঈদে ১০ হাজার টাকা দিছে। আগের রোজার ঈদেও ১০ হাজার টাকা দিছিল। কোরবানির ঈদে খাসির গোশত দিছে। আবার এইবার গরুর গোশত দিয়া গেছে। রোজার ঈদেও গরুর গোশত আনছিল। এইবার জামাত-শিবিরের চারজন পোলাপান আইছিল, আপনাদের কুমিল্লারও একজন আছিল। আমারে একটা শাড়ি দিছে, কিছু বাজারও দিয়া গেছে।’

বিএনপি-ছাত্রদলের সহযোগিতা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘রোজার ঈদের আগে একজন আমার অ্যাকাউন্ট নম্বর নিছিল। কইছিল টাকা দিব, পরে আর দেয় নাই। পরে আমাদের এই এলাকার যে এমপি হইছে, উনি ১০ হাজার টাকা দিছে। আর একবার একটা প্রোগ্রামে চিনি, সেমাই, তেল-টেলসহ কিছু বাজার দিছিল।’

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এনসিপি থেকেও একবার বাজার পাঠাইছিল। এরপর আর কোনো সহযোগিতা পাই নাই। তারপর এই মাসেই সংসদ ভবনের একটা প্রোগ্রামে গেছিলাম। হাসনাত আব্দুল্লাহ, নাসিরুদ্দীন পাটোয়ারীর লগে দেখা হইছে। অনেকের লগেই কথা হইছে।’ তবে রাজনৈতিক দলগুলোর নিয়মিত যোগাযোগ রাখে না বলে জানান তিনি।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহায়তা
২০২৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. হায়দার আলীর সময়ে কাইয়ুমের পরিবারকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রসাশন এবং অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগ যৌথভাবে ৭ লাখ টাকার চেক প্রদান করেন। এ বিষয়ে তার মা বলেন, ‘মারা যাওনের পরেই বিশ্ববিদ্যালয় টাকা দিছিল। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০১তম সিন্ডিকেট সভায় নতুন ক্যাম্পাসের ‘ছাত্র হল-১’ এর নামকরণ করা হয়েছে ‘শহিদ আব্দুল কাইয়ুম হল’।

অন্য খবর: আল্টিমেটামের হুমকি দিয়ে আন্দোলনের ঘোষণা সুপারিশপ্রাপ্ত সাড়ে ১৪ হাজার সহকারী শিক্ষকদের

বিচার নিয়ে যা বললেন কাইয়ুমের মা
বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে হতাশা প্রকাশ করেন তিনি। ‘বিচার কই পাইছি বাবা? এখনও একজন আসামিও ধরা পড়ে নাই। আমাদের একবারও কোর্টে ডাকে নাই। পুলিশও ডাকে নাই’। তিনি বলেন, ‘আমি চাই না কোনো নির্দোষ মানুষ সাজা পাক। আর যারা সত্যিকারের দোষী, হেরাই যেন শাস্তি পায়।’ 

ছেলের মৃত্যু প্রসঙ্গে শেষ পর্যন্ত তিনি শুধু একটি কথাই বারবার বলেছেন, ‘আমি যে কষ্ট পাইছি, এই কষ্ট যেন আর কোনো মা-বাবারে আল্লাহ না দেয়।’

স্বপ্ন ছিল বাবা-মাকে সুখে রাখার
আব্দুল কাইয়ুমের মা বলেন, ‘আমার ছেলে আমার লগে সব কথা কইতো। আমি আর আমার ছেলে বন্ধু আছিলাম। সারাদিন কী করছে, রাইতে আইসা সব আমারে কইতো। আগে কইতো, আমি ব্যবসা করুম। পরে মরার আগে আগে খালি কইতো, আমি একটা সরকারি চাকরি করুম। অ্যাকাউন্টিং পইড়া যদি চাকরি করি, তাইলে চাকরির দাম আছে। তারপর তোমাগো নিয়া ভালো থাকুম। আমি কইছিলাম, তোমার যেটা ভালো লাগে, তুমি সেটাই কইরো। কিন্তু আল্লাহ আর সময় দিল না।’

কাইয়ুমের বাবা কফিল উদ্দিন বলেন, ‘আমার ছেলের গুণের কথা বইলা শেষ করতে পারুম না। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তো। টিউশনি করতো। ব্যবসা করার খুব শখ আছিল। আমি কইতাম, আগে পড়াশোনা শেষ করো, পরে যেটা ভাগ্যে আছে, ওইটাই হইব। জানাজার দিনের কথা, এত মানুষ হইছিল যে আমার এক দেবর কইছিল, আমি ভয় পাইয়া গেছিলাম। লাশ কোথায় রাখুম, মানুষ কোথায় দাঁড় করামু? এত বড় জানাজা এই এলাকায় আর হইছে কিনা জানি না।’

বড় ছেলের কথাও তুলে ধরেন তিনি। ‘আমার বড় ছেলে ধুকে ধুকে কান্দে। সবসময় কয়, মা, তুমি কান্দো, তোমার তো আরেকটা ছেলে আছে। আমার বোন কান্দে, তার তো আরেকটা ভাই আছে। কিন্তু আমার তো আর কেউ নাই। আমার যে ভাই আমার লাইগা যুদ্ধ করতো, সেই ভাইডাই তো মারা গেছে।’

ভাড়া বাসার ছোট্ট ঘরে এখনও কাইয়ুমের উপস্থিতি
আজও সাভারের সেই ভাড়া বাসার প্রতিটি কোণে যেন কাইয়ুমের স্মৃতি। বাবা-মায়ের কথায় বারবার ফিরে আসে তার নাম, তার স্বপ্ন, তার সংগ্রাম। সরকারি ভাতার টাকায় কোনোভাবে সংসার চলছে। বিভিন্ন সময়ে কিছু রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতা পেয়েছেন তারা। কিন্তু এসবের কোনোটিই তাদের হারানো সন্তানকে ফিরিয়ে আনতে পারেনি। 
ছেলের জন্য বিচার চান, তবে নির্দোষ কারও শাস্তি নয়, এটাই তাদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা। একদিকে অর্থকষ্ট, অন্যদিকে সন্তানহারা বুকের দীর্ঘশ্বাস। এই দুইয়ের মাঝখানেই প্রতিদিন নতুন করে বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন শহিদ আব্দুল কাইয়ুমের পরিবার।