জুলাই শহীদ চানকে হারিয়ে আর্থিক অনটনে পরিবার
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালানোর সংবাদে সারাদেশের মতো যশোরেও বিজয় মিছিল করেছিলেন জুলাই আন্দোলনের বিজয়ীরা। ওই দিন বিকেলে জেলা যশোর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদারের মালিকানাধীন হোটেল জাবির ইন্টারন্যাশনালে আগুন দেয় অজ্ঞাত কেউ। সেখানে দ্বগ্ধ হয়ে যে কয়েকজন মারা যান তাদের মধ্যে একজন যশোর শহরের চাঁচড়া রায়পাড়া কয়লাপট্টির বাসিন্দা সেলিম সরদারের ছোট ছেলে আব্দুল আজিজ চান।
আব্দুল আজিজ চানের খালা শেফালি বেগম জানান, চান ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হোটেল জাবিরে লাগা আগুনে পুড়ে মারা যায়। প্লাস্টিকের দোকানে কাজ করে সপ্তাহে যে কয়টা টাকা পেতো তাই দিয়ে চলতেন আব্দুল আজিজ চানের (১৬) বৃদ্ধা নানি মেরি বেগম। এখন তাকে ছুটে যেতে হয় সীমান্ত এলাকা বেনাপোলে। সেখান থেকে কম মূল্যে জিরা কিনে এলাকার বাড়ি বাড়ি বিক্রি করে চলে তার খরচ। সরকারি বিভিন্ন মহলের আশ্বাস পেলেও এখনও কোনো সহযোগিতা পাননি চানের পরিবার।
আব্দুল আজিজ চানের খালা শেফালি বেগম বলেন, ‘চানকে গর্ভে ধারন করিনি। তবে মাত্র আড়াই মাস বয়স থেকে লালন পালন করেছি। সেই সূত্রে চান আমাকে বড় মা বলে ডাকতো।’
চানের বড় ভাইয়ের নাম আব্দুর রহমান আকাশ। চানের বয়স যখন আড়াই মাস সে সময় তার মা শিউলি বেগম কুয়েতে চলে যান। সেখানে গৃহপরিচারিকার কাজ করতেন। বাবা সেলিম সরকার বাসের হেলপারি করেন। দুই ভাইকে ছোটবেলা থেকে লালন পালন করেছেন খালা শেফালি।
শেফালি বেগম বলেন, ‘প্রথমে তাকে (চানকে) রায়পাড়ার একটি মাদরাসায় ভর্তি করা হয়। সেখানে নিয়মিত না হওয়ায় প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি করা হয়েছিল। পড়াশুনায় তেমন মনোযোগ না থাকায় পরে এলাকায় বেসরকারিভাবে পরিচালিত একটি স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হয়। কিন্তু সেখানেও চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে বাদ দিয়ে দেয়। পরে তাকে কাজ করার জন্য উৎসাহিত করা হয়। মৃত্যুর বছর খানেক আগে বড়বাজারের একটি প্লাস্টিকের দোকানে সাপ্তাহিক ৮০০ টাকা বেতনে কাজ শুরু করে চান।’
তিনি বলেন, ‘যে উপার্জন করতো তার মধ্যে সে ২০০ টাকা রেখে বাকিটা তার বৃদ্ধা নানির হাতে তুলে দিতো। নানিও তাকে দেখভাল করতো।’
প্রায় সাত বছর পর চানের মা শিউলি বাড়িতে ফেরেন। কিন্তু চান তার খালা শেফালির কাছেই থেকে যায়। শেফালির এক ছেলে ও দুই মেয়ে। এর মধ্যে ছোট মেয়েটা প্রতিবন্ধী। ছেলে জয়ের সাথে চান দোকানে কাজ করতো। তাদের যৎসামান্য আয় সংসারের কাজে লাগতো।
শেফালি বেগম জানান, ঘটনার দিন সকালে প্রতিবেশি শান্ত (হোটেল জাবিরে পুড়ে নিহত) ডেকে নিয়ে যায় চানকে। সকাল ১০টার দিকে তারা বাড়ি থেকে বের হয়। দুপুরে বাড়ি ফিরে খাওয়ার কথা ছিলো চানের। সাথে যায় আরো দুইজন। বিজয় মিছিলে যাচ্ছে বলে বাড়ি থেকে বের হয়। বিকেলের দিকে চান তার বন্ধু শান্তর ফোন দিয়ে আমাকে ফোন দিয়ে বলে, ‘হোটেল জাবিরের নবম তলায় আটকা পড়েছি। আমাদের বাঁচাও।’
ফোন পেয়ে তিনিসহ পরিবারের সদস্যরা জাবিরের সামনে যান। কিন্তু কিছুই করতে পারেননি। সন্ধ্যার পর একে একে অনেক মরদেহ ওই হোটেল থেকে বের করে ফায়ার সার্ভিস ও উদ্ধারকারীরা। কিন্তু চানের কোন লাশ বা খোঁজ মেলেনি। তাদের কথা মতো ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা নবম তলা থেকে পঞ্চমতলা পর্যন্ত খোঁজ করেন। জেনারেল হাসপাাতলেও যাওয়া হয়। কিন্তু কোথাও পাওয়া যায়নি।
শান্তকে হোটেলে না পেয়ে উদ্ধার তৎপরতা বন্ধ হয়ে যায়। পরদিন (৬ আগস্ট) সকালে ফের খোঁজা হয়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের সাথে তিনি ও চানের মামা জাবির হোটেলের মধ্যে ঢোকেন। তখন চতুর্থ তলায় একটি টেবিলের পাশে চানের মরদেহ দেখতে পান। পরে মরদেহ উদ্ধার করে যশোর জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়।
আওে দেখুন : ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট শাখায় কোটি টাকা গায়েব, দিশাহারা গ্রাহকরা
চান কেন সেদিন জাবিরে গিয়েছিল এমন প্রশ্নের উত্তরে শেফালি বেগম বলেন, ‘বিজয় মিছিলে যাওয়ার কথা বলে শান্তর ডাকে সে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল। জুলাইযোদ্ধা হিসাবে চানের স্বীকৃতি চাই। অন্য যোদ্ধাদের মতো চানের পরিবার যাতে রাষ্ট্রীয় সকল প্রকার সহযোগিতা পায়, সে দিকে প্রশাসন নজর দিক।’
চানের মা শিউলি বেগম বলেন, ‘শিশু বয়সে ওদের রেখে বিদেশে গেছি একটু সুখের আশায়। দুই ছেলেকে মানুষ করার আশা ছিল। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা একজনকে কেড়ে নিলো। জুলাইয়ের আন্দোলনের গিয়েছিলো আমার চান। শুনেছি, মানুষকে বাঁচাতে গিয়ে মারা গেছে সে। ঘটনার দুইদিন পর যশোরের বর্তমান প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম আমিত বাড়িতে এসেছিলেন। তিনি নগদ পাঁচ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। আর রোজার মধ্যে আরো একটি সংগঠনের পক্ষে কিছু চাল ও বাজার দিয়ে যায়। রাষ্ট্রীয় কোনো সহযোগিতা পাইনি। শুনেছি শহীদদের নামে গেজেট করা হয়েছে। কিন্তু সেই তালিকায় আমার চান নেই। অন্যরা অনেক সম্মান-সহযোগিতা পেয়েছে, কিন্তু আমরা পাইনি।’
চানের মা শিউলি বেগম আরও বলেন, ‘আমার সংসারে আয় করার মতো কেউ নেই। বৃদ্ধ নানি চানের ভরসার ওপর চলতো। এখন তাকে দেখার কেউ নেই। কীভাবে বাঁচবো? কীভাবে আগামী দিনগুলো চলবে জানি না। বুকটা শূন্য। মায়ের হাহাকার কেউ বুঝবে না। সন্তান চলে যাওয়ার শূন্যতা কিছু দিয়ে পূরণ হয় না।’
চব্বিশের জুলাই মাসে অনেক মায়ের বুক খালি হয়েছে। যারা খালি করেছে, তাদের বিচার চান জুলাই শহীদ আব্দুল আজিজ চানের পরিবার।