চার দফা দাবি জানিয়ে সরকারকে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনের মধ্যে ২০২৪ সালের ২৩ জুলাই চার দফা দাবি জানিয়ে সরকারকে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা। দাবি মেনে নেওয়া হলে সংলাপের পরিবেশ তৈরি হবে বলেও জানান তারা। এদিন শিক্ষার্থীদের পক্ষে চার দফা দাবি তুলে ধরেন আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক সারজিস আলম।
তাদের দাবিগুলো ছিল—ইন্টারনেট চালু করা, কারফিউ প্রত্যাহার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরিয়ে আবাসিক হল খুলে দেওয়া এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপদে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফেরার পরিবেশ তৈরি করা। পাশাপাশি সারাদেশে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সমন্বয়কদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিও জানানো হয়।
আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, এদিন সরকারি চাকরিতে ৯৩ শতাংশ পদে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ এবং ৭ শতাংশ কোটা রাখার বিধান রেখে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। এই বিধান সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, স্বশাসিত ও সংবিধিবদ্ধ কর্তৃপক্ষ এবং বিভিন্ন করপোরেশনের ৯ম থেকে ২০তম গ্রেডের চাকরির ক্ষেত্রে কার্যকর হয়।
২৩ জুলাই ছিল ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতার ষষ্ঠ দিন। তবে রাতের দিকে ঢাকা ও চট্টগ্রামে সীমিত পরিসরে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট চালু করা হয়। জরুরি সেবা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া হয়। তবে সাধারণ ব্যবহারকারীদের সবাই তখনো ইন্টারনেট সুবিধা পাননি।
এদিনও সারাদেশে সাধারণ ছুটি ছিল। কারফিউ অব্যাহত থাকলেও পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করে। মহাসড়কে যান চলাচল শুরু হয়। সরকার চলমান কারফিউ আরও শিথিল করে। একই সঙ্গে ২৪ জুলাই বুধবার সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত চার ঘণ্টার জন্য সরকারি-বেসরকারি অফিস খোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানাও চালুর সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।
কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান অব্যাহত ছিল।সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত সারাদেশে আরও প্রায় ১ হাজার ১০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকায় গ্রেপ্তার করা হয় অন্তত ৫১৭ জনকে।
১৭ থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত এক সপ্তাহে সারাদেশে গ্রেপ্তারের সংখ্যা ৩ হাজার ছাড়ায়। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ, হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় মঙ্গলবার আরও ৩৮টি মামলা করা হয়।
এদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এক সংবাদ সম্মেলনে জানায়, ১৮ জুলাই থেকে আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, আবু বাকের মজুমদার ও রিফাত রশীদ নিখোঁজ রয়েছেন।
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীরা ১ জুলাই আন্দোলনে নামেন। বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের পরও দাবি পূরণ না হওয়ায় আন্দোলন তীব্র হতে থাকে। ১৬ জুলাই সারাদেশে আন্দোলন চলাকালে ছয়জন নিহত হওয়ার পর পরিস্থিতি সহিংস রূপ নেয়। এরপর দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, হামলা, গুলি, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি বিজিবি মোতায়েন করা হয়। পরে ১৯ জুলাই শুক্রবার রাত ১২টা থেকে সারাদেশে কারফিউ জারি করা হয়। একই দিনে বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার জন্য সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। টানা পাঁচ দিন বন্ধ থাকার পর ২৩ জুলাই তেলবাহী ট্রেন চলাচল শুরু করে।
এদিন তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, শিক্ষার্থীদের কাউকে মামলায় জড়ানো হলে এবং কোটা আন্দোলনকারীরা সে বিষয়ে তথ্য দিলে সরকার তা যাচাই-বাছাই করে দেখবে।
তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী বলেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আবাসিক হল খুলে দেওয়া যাবে না।
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) তৎকালীন মহাপরিচালক মো. হারুন অর রশিদ বলেন, ছাত্র আন্দোলনের নামে যারা নাশকতা চালিয়ে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অপরাধীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।