ফিরে দেখা ২১ জুলাই: আপিল বিভাগের রায়ে নতুন কোটা, কারফিউয়ের মধ্যেও থামেনি আন্দোলন
আজ ২১ জুলাই। ২০২৪ সালের এই দিনে সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা নিয়ে বহুল আলোচিত রায় দেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। সরকারপক্ষের লিভ টু আপিল মঞ্জুর করে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বাতিল করেন এবং সরকারি চাকরিতে নতুন কোটা কাঠামো নির্ধারণ করে দেন।
প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের আপিল বেঞ্চ রায়ে সরকারি চাকরির ৯৩ শতাংশ পদ মেধার ভিত্তিতে, ৫ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনার সন্তানদের জন্য, ১ শতাংশ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য এবং ১ শতাংশ প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিদের জন্য সংরক্ষণের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে সরকারকে এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারির নির্দেশ দেওয়া হয়।
সেদিন সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে শুনানি শুরু হয়। রাষ্ট্রের পক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন এবং বিভিন্ন পক্ষের জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা যুক্তি উপস্থাপন করেন। দুপুরে রায় ঘোষণা করেন প্রধান বিচারপতি। রায়ে আদালত শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান এবং সরকার, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উদ্দেশে কয়েকটি পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।
রায়ে আরও বলা হয়, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে হবে এবং নির্ধারিত কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে শূন্য পদগুলো সাধারণ মেধা তালিকা থেকে পূরণ করতে হবে।
একদিকে আদালতের রায়, অন্যদিকে রাজপথে চলছিল সংঘাত। বিএনপি, জামায়াতসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে গ্রেফতার ও মামলার কার্যক্রম চলতে থাকে। একই সময়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপরও অভিযান অব্যাহত ছিল।
এদিন ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন স্থানে মোট ১৯ জন নিহত হন। কোটা নিয়ে আদালতের রায়ের পর আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রীরা বলেন, শিক্ষার্থীদের দাবি শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান হয়েছে। এবার সরকার সন্ত্রাসী ও জঙ্গিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, কোটা বিরোধী আন্দোলনকে জামায়াত, বিএনপি, ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের একটি কুচক্রী মহল ধ্বংসাত্মক পথে পরিচালিত করছে।
আর সরকার নিজেকে রক্ষায় নাশকতার দায় বিএনপির উপর চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, নিজেদের দায় আড়াল করতে সরকার গণমাধ্যম ব্যবহার করে বিরোধী দলগুলোর ওপর দোষ চাপানোর চেষ্টা করছে।
এদিকে ইন্টারনেট বন্ধ থাকলেও ক্ষুদে বার্তার মাধ্যমে সাংবাদিকদের কাছে বিবৃতি পাঠান আন্দোলনের ৫৬ জন সমন্বয়ক। সেখানে তিন শতাধিক ছাত্র-জনতাকে হত্যার অভিযোগ তুলে তারা বলেন, শুধু আদালতের রায়ের মাধ্যমে সরকার হত্যার দায় এড়াতে পারে না।
এদিন ভোরে ঢাকার পূর্বাচল এলাকায় আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামকে পাওয়া যায়। পরে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, তাকে চোখ বেঁধে একটি অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং জ্ঞান হারানোর আগ পর্যন্ত তার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। তিনি বলেন, আমার ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন শুরু করা হয়। একপর্যায়ে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।
এদিন বিকেলে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে দেশের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিদেশি কূটনীতিকরা।
এদিন আন্দোলনের তৎকালীন সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ সরকারকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ইন্টারনেট চালু, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক হল খুলে দেওয়া, সমন্বয়কদের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং কারফিউ প্রত্যাহারের দাবি জানান। দাবি পূরণ না হলে নতুন কর্মসূচি ঘোষণারও হুঁশিয়ারি দেন।
একদিকে আদালতের রায়ে ৯৩ শতাংশ মেধাভিত্তিক নিয়োগের ঘোষণা, অন্যদিকে রাজপথে ছাত্র-জনতার রক্তঝরা আন্দোলন। ফলে আন্দোলনকারীদের কাছে আদালতের রায়ের চেয়ে রাজপথের লড়াইটাই বেশি গুরুত্ব পায়। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় বহু মানুষের প্রাণের বিনিময়ে সামনে আসে গণতান্ত্রিক অধিকার ও বাকস্বাধীনতার দাবির নতুন অধ্যায়।