২৫ আগস্ট ২০২৬, ২০:৩৩

যে পাপের গুনাহ দশগুণ বৃদ্ধি করা হয়

প্রতীকী ছবি  © সংগৃহীত

মানুষ মহান আল্লাহর তাআলার সেরা সৃষ্টি। মানুষকে আল্লাহ তাআলা ভালোবেসে সর্বোত্তম আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন। এরপর মানুষকে পৃথিবীতে আল্লাহর খলিফা হিসেবে পাঠিয়েছেন। কেবল তাঁরই ইবাদত করা, তাঁর বিধান অনুযায়ী চলা, সৎকর্ম করা, অন্যায়-অপকর্ম হতে বেঁচে থাকার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। সমগ্র মানবজাতিকে সৃষ্টি করে তাদেরকে পরস্পর ভ্রাতৃত্ববোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতায় আবদ্ধ করেছেন। সমাজের প্রতিটি মানুষ একে অন্যের জীবন, সম্মান-সম্ভ্রম ও সম্পদের নিরাপত্তার ব্যাপারে সচেতন থেকে পরস্পরের প্রতি দায়িত্ব পালন করাকে ইবাদত হিসেবে সাব্যস্ত করে আদর্শ সমাজ বাস্তবায়নের রূপরেখা প্রদান করেছেন।

মানুষের প্রতিটি কর্মের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ আল্লাহ তাআলা লিপিবদ্ধ করার ব্যবস্থা করেছেন। প্রতিটি মানুষের জন্য বামে ও ডানে দুজন করে সম্মানিত লেখক ফেরেশতা পাপ ও পুণ্য লিপিবদ্ধ করে থাকে। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে ‘যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ সৎকর্ম সম্পাদন করবে, সে তার প্রতিদান পাবে আবার যে অণু পরিমাণ অন্যায় কর্ম করবে সেও তার প্রতিদান লাভ করবে।’ (সূরা আল যিলযাল, আয়াত-৭,৮)। মহান আল্লাহ কারো প্রতি পক্ষপাত করবেন না, কাউকে অতিরিক্ত শাস্তি দেবেন না। সুরা আত-ত্বিনে আল্লাহ নিজেকে আহকামুল হাকিমিন (সর্বোত্তম বিচারক) বলেছেন।পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাবের আলোকে তিনি মানুষের বিচারকার্য সম্পন্ন করবেন। তবে মানুষের পূণ্যকর্ম যেন বৃদ্ধি পায় সেজন্য বিভিন্ন সৎকর্মের বিনিময়ে অগণিত সওয়াব দান করেন। পুণ্যকর্মের জন্য সওয়াবকে বিভিন্ন মাত্রায় বৃদ্ধি করেন তবে গুনাহ (পাপের পরিমাণ) কে বাড়িয়ে দেন না।

ইসলামের সাধারণ নীতি হলো প্রতিটি পাপের জন্য একটি গুনাহ হিসেবে লেখা হয় কিন্তু একটি নেকি (পুণ্য) করলে অন্তত দশটি সওয়াব লেখা হয়। বিভিন্ন সময়, স্থান, উদ্দেশ্য ইত্যাদি বিবেচনায় একটি পুণ্যের জন্য দশগুণ থেকে সাতশত গুণ পর্যন্ত সওয়াবকে বৃদ্ধি করে আমলনামায় লিপিবদ্ধ করা হয়। 

অন্যদিকে মানুষের প্রতিটি পাপ কর্মকে একটি পাপ হিসেবেই লিপিবদ্ধ করা হয়। বড়ো গুনাহের জন্য বড়ো শাস্তির ব্যবস্থা থাকলেও সেটি একটি গুনাহ হিসেবেই বিবেচিত হয়। কেবল এতটুকুই নয়, আমলনামায় যেন পাপের পরিমাণ কম থাকে সেজন্য পাপ করলে দেরিতে লিপিবদ্ধ করান। আল্লাহ তাআলা সকল সময় বান্দাহকে সুযোগ দেন। বান্দাহ পাপ করলেও তার পাপ থেকে ফিরে এসে ভুল বুঝে তওবা করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলে আল্লাহ ক্ষমা করে দেন।

রাসুল (স.) বলেনে, ‘নিশ্চয় বাম পাশে থাকা ফেরেশতা (যিনি পাপ লেখেন) মুসলিম বান্দাহর গুনাহের ক্ষেত্রে ছয় ঘণ্টা কলম তুলে রাখেন। যদি সে অনুতপ্ত হয় তবে তা লেখা হয় না, আর ক্ষমা না চাইলে একটি গুনাহ লেখা হয়।’ ( মু’জামুল কবির- ৭৭৬৫, সহিহুল জামে-২০৯৭)। এছাড়া, বান্দাহ কোনো পাপের ইচ্ছা পোষণ করলে তা বাস্তবায়ন না করা পর্যন্ত কোনো গুনাহ লেখা হয় না। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন, ‘আমার বান্দাহ যখন কোনো পাপের ইচ্ছা করে, সে তা না করা পর্যন্ত তা লেখো না। যদি সে পাপ করেই ফেলে তবে পাপের সমপরিমাণ গুনাহ লেখো। আর বান্দাহ যদি আমার কারণে পাপ পরিত্যাগ করে তবে তার জন্য একটি সওয়াব লেখো। যখন বান্দাহ কোনো পুণ্যের ইচ্ছা করে কিন্তু তা করতে পারে না তার জন্য একটি সওয়াব লেখো। আর যদি সে পুণ্যটি করে তবে তার জন্য দশ থেকে সাতশ গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে সওয়াব লেখো।’ (বুখারি, হাদিস-৬৯৯২)

মানুষ মাত্রই ভুল। ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় মানুষ বিভিন্ন পাপের কাজ করে ফেলে। মহান আল্লাহ তাআলা মানুষের এই দুর্বলতা জানেন। তাই তিনি মানুষের প্রতি অতিশয় করুণা করেন এবং তাকে সুযোগ দিতে চান। আল্লাহ তাআলা কোন পাপের গুনাহকে সাধারণত বৃদ্ধি না করলেও প্রতিবেশীর সাথে করা অপরাধের গুনাহকে বৃদ্ধি করে দেন। প্রতিবেশীর সাথে করা একটি তঅপরাধকে অন্যত্র একই অপরাধ দশবার সংঘটনের চেয়েও মারাত্মক হিসেবে গণ্য করেন। 

মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ (রা.) হতে বর্ণিত, ‘রাসুলুল্লাহ (স.) তার সাহাবিগণকে একবার যেনা (ব্যভিচার) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। সাহাবিগণ বললেন, এটিতো নিষিদ্ধ পাপকর্ম, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল তা নিষিদ্ধ করেছেন। রাসুল (স.) বলেন, ‘কোনো ব্যক্তির দশটি নারীর সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া তার প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে ব্যভিচারের চেয়ে হালকা। পুনরায় তিনি তাদেরকে চুরি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। সাহাবিগণ বললেন, এটিতো নিষিদ্ধ পাপ কর্ম, মহামহিম আল্লাহ ও তাঁর রাসুল তা নিষিদ্ধ করেছেন। তিনি বলেন, কোন ব্যক্তির দশ পরিবারে চুরি করা তার প্রতিবেশীর ঘরে চুরি করার চেয়ে হালকা।’ (আদাবুল মুফরাদ -১০২, মুসনাদে আহমাদ -২৩৮৫৪)।

আল্লাহ তাআলা সমগ্র মানব জাতিকে এক আদমের সন্তান হিসেবে বিশ্ব ভ্রাতৃত্ববোধ, বিশ্ব মানবতাবোধে উদ্বুদ্ধ করেছেন। আবার সারা পৃথিবীর মুসলিম জাতিকে একটি দেহ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পৃথিবীর মানুষের প্রতি যদি একজন মুসলমানের এতটা দায় থাকে সেখানে নিজের পার্শ্ববর্তী মানুষ তথা প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ব অনেক বেশি হওয়াটাই শ্রেয়। প্রতিবেশীর জান-মাল, সম্মান-সম্ভ্রম একজন মুসলমানের নিকট আমানত। প্রতিবেশীর সম্পদ নষ্ট করা, সম্মানহানি করা, প্রতিবেশী নারীর শ্লীলতাহানি করা, সম্ভ্রম নষ্ট করা সহ প্রতিবেশীর সাথে সম্পাদিত অপরাধের পাপকে বহু গুণে বাড়িয়ে দেওয়া হয়।

আমাদের বিপদে আপদে প্রতিবেশিই প্রথম এগিয়ে আসে। সেজন্য প্রতিবেশীর সাথে সুসম্পর্ক রাখা জরুরি। উত্তম আচরণের মাধ্যমে প্রতিবেশীর সাথে আমাদের সম্পর্ক সুদৃঢ় হতে পারে। প্রতিবেশীর প্রতি অন্যায় করাকে ইসলামে অত্যন্ত ঘৃণিত কাজ ও গুরুতর পাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। উত্তম প্রতিবেশী হওয়া প্রতিটি মুসলমানের দায়িত্ব। প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ববোধ, নিরাপত্তা ও সহমর্মিতার মাধ্যমে সকলে মিলে মিশে সুন্দর সুশৃঙ্খল সমাজ গঠন করতে করতে প্রতিটি মুসলমানের সচেষ্ট হওয়া উচিত।

লেখক: শিক্ষক ও ইসলামি আলোচক