১৭ জুলাই ২০২৬, ১১:৫৬

দোয়া করেও কেন পূরণ হয় না সব চাওয়া? কোরআন-হাদিসের আলোকে ব্যাখ্যা

ইবাদত  © এআই সম্পাদিত

দোয়া মুমিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। কিন্তু অনেক সময় দীর্ঘদিন ধরে দোয়া করার পরও প্রত্যাশিত ফল না পেয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে—আল্লাহ কি আমার দোয়া কবুল করছেন না, নাকি দোয়া কবুলে কোনো বাধা রয়েছে? কোরআন-হাদিসের আলোকে দোয়া কবুলের শর্ত, আদব, প্রতিবন্ধকতা এবং কোন আমলগুলো দোয়া কবুলের সম্ভাবনা বাড়ায়।

ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.)-এর মতে, ‘দোয়া ও ঝাড়ফুঁক অস্ত্রের ন্যায়। অস্ত্রের কার্যকারিতা নির্ভর করে ব্যবহারকারীর উপর, কেবল ধারালো হওয়ার উপর নয়। সুতরাং যখন অস্ত্র সম্পূর্ণ নিখুঁত হয়, বাহু শক্তিশালী হয় এবং কোনো বাধা না থাকে, তখন তা দ্বারা শত্রুর ওপর আঘাত হানা যায়। আর যখন এই তিনটির কোনো একটি অনুপস্থিত থাকে, তখন প্রভাবও অনুপস্থিত হয়।’

এর অর্থ হলো, দোয়া কবুলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো ইখলাস বা একনিষ্ঠতা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা দ্বীনদারিকে তার জন্য একনিষ্ঠ করে তাঁকে ডাকবে।’ (সূরা আ’রাফ: ২৯)। একই সঙ্গে গুনাহ থেকে তওবা, ইস্তিগফার, বিনয়-নম্রতার সঙ্গে দোয়া করা, বারবার দোয়া করা এবং সুখ-সচ্ছলতার সময়ও আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, আমি বললাম: তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও, নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল। তাহলে তিনি তোমাদের জন্য আকাশ থেকে প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন; তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান দ্বারা শক্তি বৃদ্ধি করবেন, তোমাদের জন্য বাগ-বাগিচা সৃষ্টি করবেন এবং তোমাদের জন্য নদ-নদী প্রবাহিত করবেন। (সূরা নূহ: ১০-১২)

এ ছাড়া দোয়ার সময় বিনয় ও একাগ্রতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন ‘তোমরা মিনতিভরে ও সংগোপনে তোমাদের রবকে ডাকো। তিনি তো সীমালঙ্ঘনকারীদের ভালোবাসেন না।’ (সূরা আ’রাফ: ৫৫)।

কখন দোয়া বেশি কবুল হয়?
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আমাদের মহান রব প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশ বাকি থাকতে দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন এবং বলতে থাকেন— কে আছো যে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কে আছো যে আমার কাছে কিছু চাইবে, আমি তাকে তা দান করব? কে আছো যে আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে, আমি তাকে ক্ষমা করে দেব?’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ৭৫৮)। 

এছাড়া ফতোয়া অনুযায়ী রাতের শেষ তৃতীয়াংশ, সেহরির সময়, জুমার দিনের শেষ সময়, বৃষ্টি নামার সময় এবং আজান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময় দোয়ার জন্য বিশেষ ফজিলতপূর্ণ। একইভাবে মজলুম, মুসাফির, রোজাদার, অসহায় ব্যক্তি এবং এক মুসলিমের জন্য অন্য মুসলিমের গোপনে করা দোয়া কবুল হওয়ার বিশেষ আশা রয়েছে।

দোয়া কবুলে বাধা কি?
দোয়া কবুলে যেসব বিষয় বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তার মধ্যে রয়েছে গুনাহের জন্য বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার উদ্দেশ্যে দোয়া করা। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘বান্দার দোয়া ততক্ষণ পর্যন্ত কবুল হতে থাকে যতক্ষণ না সে কোনো গুনাহের জন্য বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য দোয়া করে।’ (মুসলিম)

এ ছাড়া হারাম উপার্জন ও হারাম ভক্ষণকে দোয়া কবুল না হওয়ার অন্যতম বড় কারণ। রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘হে মানুষ! আল্লাহ ভালো। তিনি কেবল ভালো জিনিসই গ্রহণ করেন... এরপর তিনি এমন এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন, যে দীর্ঘ সফর করে, ধুলো-মলিন ও এলোমেলো অবস্থায় আকাশের দিকে হাত তুলে বলে: হে আমার রব! হে আমার রব! অথচ তার খাবার হারাম, তার পানীয় হারাম এবং সে হারাম দ্বারা পরিপুষ্ট; তাহলে তার দোয়া কীভাবে কবুল হবে?!’ (মুসলিম)

ফতোয়ায় আরও বলা হয়েছে, দোয়া কবুল নিয়ে তাড়াহুড়া করা এবং ‘আমি দোয়া করেছি, কিন্তু কবুল হয়নি’—এমন হতাশাও দোয়া কবুলের পথে বাধা হতে পারে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকের দোয়া কবুল হয় যতক্ষণ না সে তাড়াহুড়া করে বলে: আমি দোয়া করেছি কিন্তু আমার দোয়া কবুল হয়নি।’ (বুখারী ও মুসলিম)।

পরিশেষে দোয়া কবুল মানেই সব সময় চাওয়া জিনিসটি সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া নয়। কখনো আল্লাহ বান্দার প্রার্থনা অনুযায়ী দান করেন, কখনো কোনো বিপদ দূর করে দেন, কখনো এর চেয়েও উত্তম কিছু নির্ধারণ করেন, আবার কখনো সেই প্রতিদান আখিরাতের জন্য সঞ্চিত রাখেন। 

সূত্র: ইসলাম কিউএন্ডএ