২৬ জুন ২০২৬, ১৩:০৮

আশুরার দিনে যে আমল করবেন

প্রতীকী ছবি  © সংগৃহীত

মহররম মাসের সবচেয়ে মহিমান্বিত ও তাৎপর্যপূর্ণ দিন আশুরা বা ১০ মহররম। ইসলামের ইতিহাসে এ দিনটি বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ। হাদিসে আশুরার দিনের বহু ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। ইসলামপূর্ব জাহেলি সমাজ এবং আহলে কিতাব তথা ইহুদি-খ্রিষ্টানদের কাছেও এ দিনের বিশেষ গুরুত্ব ছিল। তবে ইসলামে আশুরা দিনটি বিশেষভাবে পরিচিত রোজা, ইবাদত ও আল্লাহর অনুগ্রহ লাভের দিন হিসেবে।

হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, আশুরার দিন আল্লাহ তাআলা তার কুদরতের বিশেষ নিদর্শন প্রকাশ করেছিলেন। এ দিনে তিনি বনি ইসরাইলের জন্য সমুদ্রে পথ সৃষ্টি করে তাদের নিরাপদে পার করে দেন। একই পথ দিয়ে ফেরাউন ও তার অনুসারীরা প্রবেশ করলে তারা সমুদ্রে ডুবে ধ্বংস হয়ে যায়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১/৪৮১)

মুসলিম উম্মাহ যুগ যুগ ধরে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে আশুরার দিন পালন করে আসছে। বিশেষ করে এ দিনের রোজা অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ আমল হিসেবে বিবেচিত। হাদিসে উল্লেখ রয়েছে, সব নবী-রাসুলের যুগেই আশুরার রোজার প্রচলন ছিল। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কা জীবনে আশুরার রোজা পালন করতেন। হিজরতের পর মদিনায় এসে তিনি দেখতে পান, ইহুদিরাও এ দিনে রোজা রাখে।

এর কারণ জানতে চাইলে তারা জানায়, এই দিনে হজরত মুসা (আ.) ও তার অনুসারীরা ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মুসা (আ.)-এর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ইহুদিদের চেয়ে বেশি ঘনিষ্ঠ ও অগ্রগণ্য। সুতরাং তোমরাও আশুরার দিন রোজা রাখো।’

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘রমজানের পর সর্বাধিক ফজিলতপূর্ণ রোজা হলো আল্লাহর মাস মহররমের রোজা।’

আলেমদের মতে, এই হাদিসে বর্ণিত মহররমের রোজার মধ্যে আশুরার রোজাই বিশেষভাবে অন্তর্ভুক্ত। কারণ ১০ মহররমের রোজা মহররম মাসের মর্যাদা ও বরকতের অন্যতম উৎস।

আশুরার রোজার বিশেষ ফজিলত সম্পর্কে হজরত আবু কাতাদাহ (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আশুরার রোজা বিগত এক বছরের গুনাহের কাফফারা হয়ে যায়।’ অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘আমি আল্লাহ তাআলার কাছে আশা রাখি, যে ব্যক্তি মহররমের ১০ তারিখে রোজা রাখবে, তার বিগত এক বছরের (সগিরা) গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।’ (সহিহ মুসলিম: ১১৬২)

আরও পড়ুন: যে তিন দোয়া জুমার দিন বেশি বেশি পড়বেন

হিজরতের দ্বিতীয় বছরে রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে আশুরার রোজা মুসলমানদের জন্য বাধ্যতামূলক ছিল। পরে রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার পর আশুরার রোজা মুস্তাহাব বা উত্তম আমলে পরিণত হয়। তবে মর্যাদার দিক থেকে এখনো রমজানের পর আশুরার রোজার অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আশুরার রোজার গুরুত্ব এতটাই ছিল যে মদিনার নারীরা নিজেদের ছোট শিশুদেরও এ দিন রোজা রাখার অভ্যাস করাতেন। হজরত রুবাইয়্যি (রা.) বলেন, ‘আমরা আশুরার দিন রোজা রাখতাম এবং আমাদের শিশুদেরও রোজা রাখাতাম। তাদের জন্য পশমের খেলনা তৈরি করে দিতাম। কেউ খাবারের জন্য কান্নাকাটি করলে সেই খেলনা দিয়ে তাকে ব্যস্ত রাখতাম। এভাবেই ইফতারের সময় হয়ে যেত।’ (সহিহ বুখারি: ১৯৬০)

তবে আশুরার রোজা পালনের ক্ষেত্রে মহানবী (সা.) মুসলমানদের একটি বিশেষ নির্দেশনাও দিয়েছেন। যখন সাহাবিরা বললেন, ইহুদি ও খ্রিষ্টানরাও এ দিনকে সম্মান করে এবং রোজা রাখে, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘ইনশাআল্লাহ আগামী বছর আমরা নবম তারিখেও রোজা রাখব।’ (সহিহ মুসলিম: ২৫৫৬)

এই নির্দেশনার ভিত্তিতে সাহাবায়ে কেরাম ১০ মহররমের সঙ্গে ৯ অথবা ১১ মহররমেও রোজা রাখতেন, যাতে ইহুদিদের সঙ্গে সাদৃশ্য না থাকে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলতেন, ‘তোমরা ৯ ও ১০ তারিখ রোজা রাখো এবং ইহুদিদের বিপরীত করো।’ (জামে তিরমিজি: ৭৫৫)

আলেমরা বলেন, আশুরার দিন শুধু রোজা নয়, বরং কোরআন তিলাওয়াত, তওবা-ইস্তিগফার, জিকির-আসকার, নফল নামাজ, তসবিহ-তাহলিল, দরুদ শরিফ পাঠ এবং দান-সদকার মাধ্যমে দিনটি অতিবাহিত করা উত্তম। তবে এসব আমলের মধ্যে আশুরার রোজা বিশেষ মর্যাদা ও অনন্য ফজিলতের অধিকারী, যা একজন মুমিনের জন্য আল্লাহর রহমত ও ক্ষমা লাভের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।