২১ জুন ২০২৬, ১১:৩১

চাকরি, ঋণ ও জীবনের নানা সংকট দূর করতে কুরআন-হাদিসের ১০ আমল

কুরআন শরীফ  © সংগৃহীত

চাকরি না পাওয়া, ঋণের চাপ, ব্যবসায় মন্দা কিংবা সংসারে অভাব বর্তমানে মানুষের জীবনের কঠিন এক বাস্তবতা। এই সমস্যা বহু মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলছে। এমন পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে ইসলাম শুধু ধৈর্য ধরার শিক্ষা দেয় না, বরং কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে দোয়া, জিকির ও আমলের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য কামনার শিক্ষাও দেয়।

মুসলিমরা বিশ্বাস করে, মানুষের সব চেষ্টা ব্যর্থ মনে হলেও আল্লাহ তাআলার রহমত ও কুদরতের দরজা কখনো বন্ধ হয় না। কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত কয়েকটি দোয়া ও আমল বিপদ-মুসিবতের সময়ে মুমিনকে আশা ও শক্তি জোগায়।

১. চাকরি ও রিজিকের জন্য তাকওয়ার শিক্ষা
চাকরি বা জীবিকার সন্ধানে থাকা ব্যক্তিদের জন্য আল্লাহ তায়ালা সূরা আত-তালাক এর ২ ও ৩ নং আয়াতে বলেন—যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ বের করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।

আলেমদের মতে, এ আয়াতে তাকওয়া বা আল্লাহভীতিকে সংকটমুক্তি ও অপ্রত্যাশিত রিজিক লাভের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

২. ঋণমুক্তির জন্য নববী দোয়া
ঋণের চাপে উদ্বিগ্ন ব্যক্তিদের জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.) হজরত আলী (রা.)-কে একটি দোয়া শিখিয়েছিলেন—আল্লাহুম্মাকফিনী বিহালালিকা ‘আন হারামিকা, ওয়া আগনিনী বিফাদলিকা ‘আম্মান সিওয়াক। অর্থ: 'হে আল্লাহ! আপনার হালাল দ্বারা আমাকে হারাম থেকে রক্ষা করুন এবং আপনার অনুগ্রহের মাধ্যমে আমাকে আপনি ছাড়া অন্য সবার মুখাপেক্ষিতা থেকে মুক্ত করুন। দোয়াটি জামে আত-তিরমিযি, হাদিস নং ৩৫৬৩-এ বর্ণিত হয়েছে। 

৩. বরকতের জন্য দোয়া
ব্যবসা বা জীবিকার কাজে বরকত কামনায় পাঠ করা যেতে পারে—'ওয়া বারিক লী ফীমা আ‘তাইত।' অর্থ: 'আপনি আমাকে যা দান করেছেন, তাতে বরকত দিন।' বাক্যটি রাসূলুল্লাহ (সা.) এর বিভিন্ন দোয়ায় এসেছে এবং মুসলিমরা ব্যক্তিগত দোয়ায় এটি পাঠ করতে পারেন।

দোয়া কবুল হওয়া নিয়ে হতাশ না হওয়ার নির্দেশনা
মহান আল্লাহ তায়ালা সূরা আল-বাকারা, আয়াত ১৮৬ বলেন, 'আমার বান্দারা যখন আমার সম্পর্কে আপনাকে জিজ্ঞেস করে, আমি তো নিকটেই আছি। যে আমাকে ডাকে, আমি তার ডাকে সাড়া দিই।'

 এ বিষয়ে তাফসিরবিদরা বলেন, দোয়া কখনো সরাসরি কবুল হয়, কখনো বিলম্বে কবুল হয়, আবার কখনো তার পরিবর্তে আরও উত্তম কিছু দান করা হয়।

৪. ফজরের পর বিশেষ দোয়া
রাসূলুল্লাহ (সা.) ফজরের সালাত শেষে বলতেন, 'আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকা ‘ইলমান নাফি‘আ, ওয়া রিযকান তায়্যিবা, ওয়া ‘আমালান মুতাকাব্বালা।' এর অর্থ: 'হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে উপকারী জ্ঞান, পবিত্র রিজিক এবং কবুলযোগ্য আমল প্রার্থনা করছি।' এ হাদিসটি উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত এবং সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ৯২৫-এ এসেছে। 

৫. কোরআনে বর্ণিত দোয়া
অভাব-অনটনের সময় হজরত যাকারিয়া (আ.) এর দোয়া, ‘রব্বি লা তাযারনী ফারদান, ওয়া আনতা খাইরুল ওয়ারিসীন।’ অর্থ: 'হে আমার প্রতিপালক! আমাকে একা ছেড়ে দেবেন না; আপনিই সর্বোত্তম উত্তরাধিকারী।' [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত ৮৯] যদিও আয়াতটি মূলত সন্তান লাভের প্রার্থনা হিসেবে এসেছে, অনেক আলেম সাধারণ বিপদ ও অসহায়ত্বের সময়ও এ দোয়া পাঠের পরামর্শ দিয়েছেন।

৬. তাহাজ্জুদের সময় সবচেয়ে কল্যাণের দোয়া
'রব্বানা আতিনা ফিদ্দুনইয়া হাসানাতান, ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতান, ওয়া কিনা ‘আযাবান্নার।
'হে আমাদের রব! আমাদের দুনিয়ায় কল্যাণ দান করুন, আখিরাতেও কল্যাণ দান করুন এবং আমাদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করুন।' [সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২০১] হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) এ দোয়াটি বেশি বেশি পাঠ করতেন।

৭. ইস্তিগফার: রিজিক বৃদ্ধির অন্যতম আমল
আল্লাহ তাআলা বলেন, 'তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর অঝোরে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দ্বারা তোমাদের সাহায্য করবেন।' [সূরা নূহ, আয়াত ১০-১২] এ কারণে আলেমরা বেশি বেশি 'আস্তাগফিরুল্লাহ' দোয়াটি পাঠের পরামর্শ দেন।

৮. কষ্টের মধ্যেই স্বস্তির সুসংবাদ
'নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই রয়েছে স্বস্তি।' [সূরা আল-ইনশিরহ আয়াত ৬] ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, এ আয়াত মুমিনকে আশা ও ধৈর্যের শিক্ষা দেয়। কষ্টের সাথে স্বস্তি: আল্লাহ বলেননি যে কষ্টের পরে স্বস্তি আসবে। বরং বলেছেন, কষ্টের সাথেই (বা পাশাপাশি) স্বস্তি আছে। অর্থাৎ, প্রতিটি সমস্যার ভেতরেই সমাধানের পথ লুকানো থাকে। 

দ্বিগুণ আশ্বাস: আরবি ব্যাকরণে ‘আল-উসর’ (নির্দিষ্ট কষ্ট) শব্দটি একবচন, কিন্তু ‘ইউসরা’ (স্বস্তি) শব্দটি দুইবার এসেছে। এর অর্থ হলো—একটি কষ্টের বিপরীতে আল্লাহতায়ালা দুটি স্বস্তি বা রহমত দান করেন।

৯. দুশ্চিন্তা ও মানসিক কষ্ট থেকে আশ্রয় প্রার্থনা
দুশ্চিন্তা কিংবা মানসিক কষ্ট থেকে মুক্তি পেতে রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রায়ই এ দোয়া করতেন, 'আল্লাহুম্মা ইন্নী আ‘উযু বিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হাজান।' অর্থ: 'হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে উদ্বেগ ও দুঃখ থেকে আশ্রয় চাই।' এ দোয়াটি সহিহ বুখারিতে দীর্ঘ একটি দোয়ার অংশ হিসেবে বর্ণিত হয়েছে।

১০. চিরতরে অভাব দূর করার সূরা
প্রতি রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে নিয়ম করে একবার সূরা ওয়াকিয়াহ তিলাওয়াত করুন। বিখ্যাত সাহাবি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি প্রতি রাতে সূরা ওয়াকিয়াহ তিলাওয়াত করবে, তাকে কখনো দারিদ্র্য বা অভাব স্পর্শ করবে না। নিয়মিত এই সূরা পাঠে জীবিকা ও উপার্জনে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ বরকত ও কল্যাণ বর্ষিত হয়। 

ইসলামে দোয়া ও আমল কখনোই কর্মবিমুখতার শিক্ষা দেয় না। বরং চেষ্টা, পরিকল্পনা, হালাল উপার্জনের প্রচেষ্টা এবং আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল। এই চারটি বিষয় একসঙ্গে অনুসরণ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। চাকরি, ঋণ বা জীবনের যেকোনো সংকটে একজন মুমিনের ধৈর্য ধারণ গুরুত্বপূর্ণ।