১৩ জুন ২০২৬, ১২:৩৭

খেলা দেখা, দল সমর্থন ও অমুসলিম খেলোয়াড়ের প্রতি সমর্থনের বিষয়ে ইসলামের বিধান কী?

ফুটবল বিশ্বকাপ  © সংগৃহীত

মানবসভ্যতার ইতিহাসে খেলাধুলা শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি শারীরিক সক্ষমতা, সামাজিক সম্প্রীতি, প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রাচীন গ্রিসের অলিম্পিক থেকে শুরু করে আরবের অশ্বারোহণ, তীরন্দাজি ও কুস্তি মানুষ সব যুগেই খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত ছিল। আধুনিক যুগে ফুটবল, ক্রিকেট, টেনিস কিংবা অন্যান্য আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা কোটি কোটি মানুষের আবেগের অংশে পরিণত হয়েছে। ফলে মুসলিম সমাজে প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে খেলা দেখা কি জায়েজ? কোনো দলকে সমর্থন করা কি বৈধ? আর অমুসলিম খেলোয়াড় বা দলের প্রতি সমর্থন প্রদর্শন করলে শরিয়তের দৃষ্টিতে তার অবস্থান কী?

ইসলামের মৌলিক নীতি হলো, কোনো কিছুকে হারাম প্রমাণ করার জন্য স্পষ্ট দলিল প্রয়োজন। কুরআন ও সুন্নাহতে আধুনিক খেলাধুলার নাম সরাসরি উল্লেখ নেই। তাই আলেমরা শরিয়তের সাধারণ নীতিমালার আলোকে এ বিষয়ে মতামত দিয়েছেন।

রাসূলুল্লাহ সা. এর জীবনে আমরা দেখি, তিনি শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিকারী বিভিন্ন কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করেছেন। সহিহ মুসলিমে বর্ণিত আছে, আবিসিনীয় মুসলমানরা মসজিদে নববীতে বর্শাখেলা প্রদর্শন করছিলেন এবং নবী সা. আয়েশা রা. কে সেই খেলা দেখার সুযোগ দিয়েছিলেন। আবার আয়েশা রা. এর সঙ্গে তার দৌড় প্রতিযোগিতার ঘটনাও সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। এসব দলিল থেকে ইমাম নববী রহ., ইবনু হাজর আসকালানি রহ., ইবনু কুদামা রহ. ও অন্যান্য ফকিহগণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, বৈধ ও শালীন খেলাধুলা ইসলামে নিষিদ্ধ নয়।

তবে ইসলামে কোনো বৈধ বিষয়ও সীমালঙ্ঘনের কারণে গুনাহে পরিণত হতে পারে। যদি খেলা দেখা মানুষের ফরজ নামাজ নষ্ট করে, পরিবার ও দায়িত্ব থেকে গাফিল করে, অশ্লীলতা, জুয়া, মাদক, গালাগালি বা সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত করে, তাহলে সেটি আর বৈধ বিনোদনের পর্যায়ে থাকে না।

সমকালীন ইসলামী চিন্তাবিদ শাইখ ইউসুফ আল-কারযাভী, মুফতি মুহাম্মদ তাকী উসমানী এবং আন্তর্জাতিক ইসলামী ফিকহ একাডেমির বহু গবেষক মত দিয়েছেন, খেলাধুলা ও খেলা দেখা মূলত মুবাহ বা বৈধ। তবে তা ইবাদত ও নৈতিক দায়িত্বের ক্ষতি করতে পারবে না।

দল সমর্থনের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। একজন মানুষ স্বাভাবিকভাবেই কোনো নির্দিষ্ট দল, দেশ বা খেলোয়াড়কে পছন্দ করতে পারে। এতে শরিয়তের দৃষ্টিতে কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা তখন শুরু হয়, যখন সমর্থন অন্ধ আনুগত্যে রূপ নেয়। যখন একজন ব্যক্তি সত্য-মিথ্যা বিচার না করে শুধু নিজের দলকে সমর্থন করে, অন্যদের অপমান করে, বিদ্বেষ ছড়ায় বা শত্রুতায় জড়িয়ে পড়ে।

রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি অন্ধ পক্ষপাতিত্বের দিকে আহ্বান করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (সুনান আবু দাউদ) এই হাদিসের আলোকে আলেমরা বলেন, খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ বৈধ, কিন্তু উগ্র সমর্থন, গালি-গালাজ, হিংসা বা মারামারি ইসলামী চরিত্রের পরিপন্থী। বর্তমান সময়ে সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্নগুলোর একটি হলো, কোনো অমুসলিম খেলোয়াড়কে সমর্থন করা কি জায়েজ?

এখানে প্রথমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বুঝতে হবে। ইসলামে ‘সমর্থন’ দুই ধরনের হতে পারে। এক ধরনের সমর্থন হলো কারও দক্ষতা, পরিশ্রম, প্রতিভা বা খেলোয়াড়ি নৈপুণ্যের প্রশংসা করা। অন্য ধরনের সমর্থন হলো তার ধর্মীয় বিশ্বাস, কুফরি মতবাদ বা ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা।

প্রথম ধরনের সমর্থন ইসলামে নিষিদ্ধ নয়। একজন মুসলিম কোনো অমুসলিম চিকিৎসকের দক্ষতা, কোনো বিজ্ঞানীর গবেষণা, কোনো স্থপতির শিল্পকর্ম বা কোনো খেলোয়াড়ের খেলোয়াড়ি নৈপুণ্যের প্রশংসা করতে পারে। রাসূলুল্লাহ সা. নিজেও বহু ক্ষেত্রে অমুসলিমদের নির্দিষ্ট গুণাবলির স্বীকৃতি দিয়েছেন। তিনি মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের সময় একজন অমুসলিম পথপ্রদর্শকের সেবা গ্রহণ করেছিলেন। আবার বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষতার মূল্যায়নও করেছেন।

অতএব, কেউ যদি লিওনেল মেসি, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, রাফায়েল নাদাল বা অন্য কোনো অমুসলিম খেলোয়াড়ের খেলার দক্ষতার কারণে তাকে পছন্দ করে, তার খেলা উপভোগ করে বা তার সাফল্যের প্রশংসা করে, তাহলে অধিকাংশ সমকালীন আলেমের মতে এতে শরিয়তগত সমস্যা নেই।

তবে যদি সমর্থন এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে একজন ব্যক্তি নিজের ধর্মীয় পরিচয় ভুলে গিয়ে অমুসলিম সংস্কৃতি, অনৈতিক জীবনধারা বা ইসলামবিরোধী মূল্যবোধকে অনুসরণ করতে শুরু করে, তখন বিষয়টি ভিন্ন হয়ে যায়। কারণ ইসলাম মুসলমানকে নিজের ঈমানি স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করতে নির্দেশ দিয়েছে।

কুরআনে আল্লাহ বলেন, ‘সৎকর্ম ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে একে অপরকে সহযোগিতা করো, গুনাহ ও সীমালঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করো না।’ (সূরা মায়িদা ২) এ কারণে কোনো খেলোয়াড় মুসলিম হোক বা অমুসলিম, যদি সে প্রকাশ্যে অন্যায়, অশ্লীলতা, মাদক, জুয়া বা ইসলামবিরোধী প্রচারণার প্রতীক হয়ে ওঠে, তাহলে তার সেই দিককে সমর্থন করা বৈধ নয়।

চার মাযহাবের ফকিহদের আলোচনা এবং সমকালীন ফতোয়া গবেষণাগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, খেলাধুলা ও দল সমর্থনের মূল বিধান বৈধতার দিকেই যায়। কিন্তু এর সঙ্গে যুক্ত আচরণই শেষ পর্যন্ত শরিয়াহর হুকুম নির্ধারণ করে।

আজকের বিশ্বে অনেক মানুষ রাতভর খেলা দেখে ফজরের নামাজ নষ্ট করে। অনেকেই দলীয় সমর্থনের কারণে গালি দেয়, শত্রুতা সৃষ্টি করে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশালীন আচরণ করে। আবার কেউ কেউ খেলোয়াড়দের এমনভাবে অনুসরণ করে যেন তারা জীবনের চূড়ান্ত আদর্শ। ইসলামের দৃষ্টিতে এসব আচরণ অবশ্যই নিন্দনীয়।

অন্যদিকে একজন মুসলিম যদি খেলা দেখে, আনন্দ উপভোগ করে, নিজের পছন্দের দলকে সমর্থন করে, কোনো দক্ষ খেলোয়াড়ের প্রতিভার প্রশংসা করে, কিন্তু একই সঙ্গে নামাজ, নৈতিকতা ও ঈমানি পরিচয় অক্ষুণ্ণ রাখে, তাহলে এতে শরিয়তের দৃষ্টিতে কোনো আপত্তি নেই।

ইসলাম মানুষের জীবন থেকে আনন্দ কেড়ে নিতে চায় না, বরং আনন্দকে নৈতিকতার আলোয় পরিচালিত করতে চায়। খেলা বৈধ, সমর্থনও বৈধ, কিন্তু উগ্রতা, অন্ধ অনুসরণ এবং দায়িত্বহীনতা বৈধ নয়। একজন মুসলমানের পরিচয় হবে ভারসাম্যে যেখানে আবেগ থাকবে, কিন্তু বিবেক হারাবে না, সমর্থন থাকবে, কিন্তু অন্ধ আনুগত্যে পরিণত হবে না, আনন্দ থাকবে, কিন্তু তা কখনো আল্লাহর স্মরণ ও দায়িত্ববোধকে ছাপিয়ে যাবে না।

তথ্যসূত্র: পবিত্র কুরআন (সূরা আল-মায়িদাহ ২), সহিহ মুসলিম (হাদিস, ৮৯২ আবিসিনীয়দের বর্শাখেলা), সুনান আবু দাউদ (হাদিস,৫১২১ অন্ধ পক্ষপাতিত্ব সম্পর্কে), ইমাম নববী-এর শরহু সহিহ মুসলিম, ইবনু হাজর আল-আসকালানি-এর ফাতহুল বারী, ইবনু কুদামা-র আল-মুগনি, এবং সমকালীন ফিকহি গবেষণা।

লেখক কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর