ঋণ করে কোরবানি দেওয়া নিয়ে ধর্মীয় বিধানে কী বলা আছে?
ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ বাংলাদেশের অন্যতম বড় ধর্মীয় উৎসব। প্রতিবছর সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে মুসলিম বিশ্বসহ বাংলাদেশের মুসলমানরা পশু কোরবানি করে থাকেন।
প্রতিবছর ঈদুল আজহার দিন থেকে শুরু করে পরবর্তী তিনদিন, অর্থাৎ ১২ জিলহজ পর্যন্ত বিভিন্ন পশু কোরবানি দেওয়া হয়। সম্পদশালী ব্যক্তিদের কেউ কেউ একাধিক পশু কোরবানি দেন। আবার মধ্যবিত্তদের অনেকে ভাগে গরু, মহিষ বা উট কোরবানি করে থাকেন।
ইসলামের বিধান অনুযায়ী, ঈদুল আজহায় সামর্থ্যবান নারী-পুরুষের ওপর পশু কোরবানি ওয়াজিব। তবে অনেকেই জানেন না, ঠিক কতটুকু সম্পদ থাকলে একজন মুসলমানের ওপর কোরবানি ওয়াজিব হয়।
ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী, কোরবানির দিনগুলোতে মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর পর যদি কারও কাছে নির্দিষ্ট পরিমাণ বা নিসাব পরিমাণ সম্পদ অবশিষ্ট থাকে, তাহলে তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ আব্দুর রশীদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, “যে সম্পদ থাকলে যাকাত ওয়াজিব হয়, সেই ধরনের সম্পদ যদি কারও থাকে, তাহলে তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হবে।”
ইসলামের বিধান অনুযায়ী, কারও কাছে সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ, সাড়ে ৫২ ভরি রুপা বা এর সমমূল্যের নগদ অর্থ কিংবা সম্পদ থাকলে তার জন্য কোরবানি দেওয়া বাধ্যতামূলক।
ধর্মীয় বিশ্লেষকরা বলছেন, যাদের ওপর কোরবানি ওয়াজিব, তারা যদি ইচ্ছাকৃতভাবে কোরবানি না দেন, তাহলে গোনাহের ভাগীদার হবেন।
অধ্যাপক আব্দুর রশীদ বলেন, ‘যে ব্যক্তির নিসাব পরিমাণ সম্পদ রয়েছে, তাকে অবশ্যই কোরবানি দিতে হবে। আর যদি না দেন, তাহলে তিনি ওয়াজিব ভঙ্গ করলেন।’
হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, যার সামর্থ্য রয়েছে কিন্তু সে কোরবানি করে না, তাকে ঈদগাহের কাছেও না যেতে বলা হয়েছে। তবে যাদের সেই পরিমাণ সম্পদ বা সম্পত্তি নেই, তাদের জন্য কোরবানি বাধ্যতামূলক নয়। বাংলাদেশে প্রতিবছর কোরবানিতে ৯০ লাখ থেকে এক কোটি পশু কোরবানি হয়ে থাকে। এর মধ্যে বেশিরভাগই গরু ও ছাগল।
তবে দেশে প্রায়ই দেখা যায়, আর্থিক সামর্থ্য না থাকলেও অনেকে ঋণ করে কোরবানি দিতে চান। এ বিষয়ে ইসলামী গবেষকরা বলছেন, ইসলামে এ ক্ষেত্রেও সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে।
গবেষকদের মতে, যে ব্যক্তির ওপর কোরবানি ওয়াজিব, তিনি যদি হাতে পর্যাপ্ত নগদ অর্থ না থাকার কারণে ঋণ করে কোরবানি করেন, তাহলেও তার কোরবানি আদায় হয়ে যাবে।
অধ্যাপক মুহাম্মদ আব্দুর রশীদ বলেন, ‘ঋণগ্রস্ত হলে কোরবানি দেওয়া যাবে না—এমন কথাও প্রচলিত আছে। কিন্তু বিষয়টি হলো, যদি এমন অবস্থা হয় যে জীবনযাত্রাই চলে না, থাকা-খাওয়ার কষ্ট হয়, তাহলে তার জন্য কোরবানি ওয়াজিব নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার শর্ত পূরণ হওয়ার পর কেউ যদি নগদ অর্থের সংকটে ঋণ করে কোরবানি করেন, তাহলে তার এই ইবাদত সহিহ হবে এবং ওয়াজিব আদায় হবে।’
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘ঋণের টাকা পরিশোধ করার সামর্থ্য থাকতে হবে, যাতে তা পরে তার জন্য বোঝা হয়ে না দাঁড়ায়।’ এ কারণে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বা নির্ভরযোগ্য উৎস না থাকলে ঋণ করে কোরবানি না দেওয়ার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন ইসলামি গবেষকরা। আবার অনেক ধনাঢ্য ব্যক্তি বা ব্যবসায়ী ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যাংকঋণ নিয়ে থাকেন। তাদের ক্ষেত্রে কোরবানির বিধান কী এ প্রশ্নও অনেকের মধ্যে রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক রশীদ বলেন, ‘ধরুন, আমার সম্পদ আছে। কিন্তু কোনো কাজের জন্য ঋণ নিয়েছি। সে ক্ষেত্রে যদি সম্পদ থাকে, তাহলে তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব। একইভাবে হজের ক্ষেত্রেও তিনি ঋণগ্রস্ত হলেও হজ ওয়াজিব হতে পারে।’
অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তি ঋণের অর্থ পরিশোধের সক্ষমতা রাখলে, ব্যাংকের কাছে ঋণগ্রস্ত হলেও ইসলামের বিধান অনুযায়ী তার জন্য কোরবানি দেওয়া বাধ্যতামূলক।
তবে ইসলামি গবেষকদের মতে, শরিয়ত অনুযায়ী সুদভিত্তিক সব ধরনের লেনদেন নিষিদ্ধ। কোরবানি একটি বিশুদ্ধ ইবাদত হওয়ায় সুদের মতো অপবিত্র অর্থ দিয়ে তা সম্পন্ন করা উচিত নয়।
বাংলাদেশে বর্তমানে গরু ও ছাগলের পাশাপাশি মহিষ, ভেড়া, দুম্বা ও উটও কোরবানি দেওয়া হয়। মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেকের পক্ষে একা গরু কোরবানি দেওয়া সম্ভব না হওয়ায় তারা ভাগে কোরবানি করেন।
ইসলামের বিধান অনুযায়ী, গরু, মহিষ ও উটে সর্বোচ্চ সাতজন শরিক হতে পারেন। তবে ছাগল, ভেড়া বা দুম্বায় একাধিক শরিক হওয়া জায়েজ নয়; এটি একজনের নামেই হতে হবে।
ইসলামি গবেষকদের মতে, ধর্মীয় নিয়ম অনুযায়ী গরু ও মহিষের বয়স অন্তত দুই বছর, উটের পাঁচ বছর এবং ছাগল, ভেড়া ও দুম্বার বয়স অন্তত এক বছর হতে হবে। তবে ভেড়া বা দুম্বা ছয় মাস বয়সী হলেও দেখতে এক বছরের মতো বড় হলে তা দিয়ে কোরবানি জায়েজ।
অধ্যাপক মুহাম্মদ আব্দুর রশীদ বলেন, ‘আমাদের দেশে অনেক সময় কোরবানি লোক দেখানোর বিষয় হয়ে যায়। নিয়ম অনুযায়ী একজনের জন্য একটি ছাগল বা একটি গরুর সাত ভাগের এক ভাগই যথেষ্ট। কিন্তু দেখা যায় কেউ কেউ ২০টি গরুও কোরবানি দিচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যদি কেউ গরিবদের দেওয়ার জন্য প্রয়োজনের অতিরিক্ত পশু কোরবানি দেয়, সেটা স্বাভাবিক। তবে তা যেন লোক দেখানোর জন্য না হয়।’
ইসলামের বিধান অনুযায়ী, কোরবানি ব্যক্তিভিত্তিক ইবাদত। পরিবারের একাধিক সদস্য—যেমন বাবা, মা বা ছেলে যদি পৃথকভাবে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হন, তাহলে প্রত্যেকের ওপর আলাদাভাবে কোরবানি ওয়াজিব হবে। অনেকেই প্রশ্ন করেন, কোরবানির সমপরিমাণ টাকা দান করলে তা গ্রহণযোগ্য হবে কি না।
এ বিষয়ে ইসলামি গবেষক ও লেখকরা বলছেন, কোরবানির মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর নামে পশুর রক্ত প্রবাহিত করা। তাই পশুর পরিবর্তে টাকা দান করলে ওয়াজিব কোরবানি আদায় হবে না। তবে নফল দান হিসেবে অর্থ দান করা যেতে পারে।