কোরবানি ফরজ নাকি ওয়াজিব—সেটা কাদের ওপর?
ইসলামের অন্যতম তাৎপর্যমণ্ডিত ও ফজিলতপূর্ণ ইবাদত কোরবানি। এতে আছে আত্মত্যাগের ঐতিহাসিক মহিমা। কোরবানি শুরু হয়েছিল হযরত আদম (আ.)–এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিল থেকে। পরবর্তীতে কুরবানির জন্য হযরত ইবরাহিম (আ.) ও তার শিশুপুত্র ইসমাইল (আ.)–এর আত্মবিসর্জন কিয়ামত পর্যন্ত প্রতিটি মুমিনের জন্য অনন্য শিক্ষা ও প্রভু প্রেমের পাথেয়।
এক হাদিসে বর্ণিত আছে, মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার কন্যা হজরত ফাতেমা (রা.)-কে কোরবানির সময় উপস্থিত থাকতে বলেন। তিনি ইরশাদ করেন, ‘কোরবানির পশুর প্রথম রক্তবিন্দু মাটিতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ তায়ালা তোমার সব গোনাহ মাফ করে দেবেন।’
এ সময় হজরত ফাতেমা (রা.) জানতে চান, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ (সা.), এই ফজিলত কি শুধু আহলে বায়তের জন্য, নাকি সব মুসলমানের জন্যও প্রযোজ্য?’ জবাবে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘এ ফজিলত সকল মুসলমানের জন্য।’ (মুসনাদে বাজযার, আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব: ২/১৫৪)
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘অতএব তুমি তোমার রবের উদ্দেশে নামাজ আদায় করো এবং কোরবানি করো।’ (সুরা কাওসার: ২)
সামর্থ্য থাকার পরও কোরবানি না করার বিষয়ে হাদিসে কঠোর সতর্কবার্তা এসেছে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যার কোরবানি দেওয়ার সামর্থ্য রয়েছে, কিন্তু সে কোরবানি করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছেও না আসে।’ (মুসনাদে আহমদ: ২/৩২১, মুস্তাদরাকে হাকেম: ৭৬৩৯, আত্তারগীব ওয়াত্তারহীব: ২/১৫৫)
ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী, প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন মুসলিম নারী-পুরুষের ওপর কোরবানি ওয়াজিব হয়, যদি সে ১০ জিলহজ ফজর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের মধ্যে নেসাব পরিমাণ অতিরিক্ত সম্পদের মালিক থাকে।
কোরবানির নেসাব নির্ধারণের ক্ষেত্রে টাকা-পয়সা, সোনা-রূপা, অলঙ্কার, প্রয়োজনের অতিরিক্ত জমি বা বাড়ি, ব্যবসায়িক পণ্য এবং অপ্রয়োজনীয় আসবাবপত্র হিসাবের অন্তর্ভুক্ত হবে। তবে দৈনন্দিন বসবাস ও ভরণপোষণের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ এ হিসাবের মধ্যে ধরা হবে না।
কোরবানির জন্য নেসাব পরিমাণ সম্পদ কতটুকু?
ইসলামি গবেষণা পত্রিকা মাসিক আল কাউসারে বলা হয়েছে, নেসাব হলো স্বর্ণের ক্ষেত্রে সাড়ে সাত (৭.৫) ভরি, রুপার ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন (৫২.৫) ভরি। টাকা-পয়সা ও অন্যান্য বস্তুর ক্ষেত্রে নিসাব হলো, এর মূল্য সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার মূল্যের সমপরিমাণ হওয়া। আর সোনা বা রূপা কিংবা টাকা-পয়সা এগুলোর কোনো একটি যদি পৃথকভাবে নেসাব পরিমাণ না থাকে কিন্তু প্রয়োজন অতিরিক্ত একাধিক বস্তু মিলে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার মূল্যের সমপরিমাণ হয়ে যায়, তাহলেও তার ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব। (আলমুহীতুল বুরহানী: ৮/৪৫৫, ফাতাওয়া তাতারখানিয়া: ১৭/৪০৫)
নেসাবের মেয়াদ
কোরবানির নেসাব পুরো বছর থাকা জরুরি নয়; বরং কোরবানির দিনগুলোতে থাকলেই কোরবানি ওয়াজিব হবে। (বাদায়েউস সানায়ে: ৪/১৯৬, রদ্দুল মুহতার: ৬/৩১২)
উল্লেখ্য, কেউ যদি কোরবানির দিনগুলোতে ওয়াজিব কোরবানি দিতে না পারে তাহলে কোরবানির পশু ক্রয় না করে থাকলে তার ওপর কোরবানির উপযুক্ত একটি ছাগলের মূল্য সদকা করা ওয়াজিব। আর যদি পশু ক্রয় করে থাকে কিন্তু কোনো কারণে কোরবানি দেওয়া হয়নি, তাহলে ওই পশু জীবিত সদকা করে দেবে। (বাদায়েউস সানায়ে: ৪/২০৪, ফাতাওয়া কাযীখান: ৩/৩৪৫)