১৪ মে ২০২৬, ১৭:০৮

খ্যাতির চূড়ায় থাকা সত্ত্বেও যে কারণে আত্মগোপনে চলে যান ইমাম গাজ্জালী

আবু হামিদ আল-গাজ্জালীর প্রতীকী ছবি  © প্রতীকী ছবি

আবু হামিদ আল-গাজ্জালী ইসলামের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত হিসেবে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত। তিনি ছিলেন একজন বহুবিদ্যাবিশারদ (পলিম্যাথ) যিনি তার যুগের প্রতিটি বিদ্যায় পারদর্শিতা অর্জন করেছিলেন। বিশ্বের অনেক অঞ্চলেই তিনি ইমাম গাজ্জালি হিসেবে বেশি পরিচিত। গাজ্জালীর কাজ আজও অত্যন্ত গভীর প্রাসঙ্গিকতা বহন করে।

তার শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ, 'ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন' (ধর্মীয় জ্ঞানের পুনরুজ্জীবন), আংশিকভাবে আল-আকসার গোল্ডেন গেটে (বাব আল-রাহমাহ) বসে লেখা হয়েছিল। যে কক্ষটিতে বসে আল-গাজ্জালী গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করতেন এবং এই কালজয়ী মাস্টারপিস বইটি লিখেছিলেন, সেটি এখনও সেখানে রয়েছে। আজ আমরা গাজ্জালী সম্পর্কে সেই মানুষটির কাছেই শুনবো, যিনি 'আল-গাজ্জালী অধ্যাপক' হিসেবে খ্যাত।

আল আকসার দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত প্রাচীন প্রার্থনা কক্ষ আল-কিবলি মসজিদের দেয়ালগুলো বুলেটের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে আছে, যা মনে করিয়ে দেয় যে ইসরায়েলি বাহিনী এখানে ইবাদতরতদের ওপর গুলি চালিয়েছিল। বিদ্যমান স্থিতাবস্থার প্রত্যক্ষ লঙ্ঘন করে ইসরায়েল আল-আকসার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়গুলো পর্যন্ত নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে।

আমাদের গাইড মাহদির ছোট্ট কার্যালয়ের দেয়াল থেকে রঙের আস্তরণ খসে পড়ছে। মাহদি বলেন, ‘আমি চার বছর ধরে পুলিশের অনুমতির অপেক্ষায় আছি। তাদের অনুমতি ছাড়া এখানে সামান্যতম পরিবর্তন করলেও তারা আপনাকে গ্রেপ্তার করবে।’

'আল-গাজ্জালী অধ্যাপক' আবু সোয়ের সাক্ষাৎ

আমরা এখানে এসেছি ওয়াকফ কাউন্সিলের ডেপুটি প্রধান মুস্তফা আবু সোয়ের সাক্ষাৎকার নিতে। ওয়াকফ হলো জর্ডান কর্তৃক নিযুক্ত একটি সংস্থা, যা আল-আকসা চত্বর এবং জেরুজালেমের ওল্ড সিটির অন্যান্য ইসলামিক পবিত্র স্থানগুলো পরিচালনার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত। তারা সবসময়ই ওয়াকফের অতিথিদের পরিদর্শনের বিষয়ে ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীকে আগে থেকে অবহিত করে থাকে।

কয়েক দিন আগে, বেন গভির কর্তৃক আল-আকসায় জোরপূর্বক প্রবেশের পরিপ্রেক্ষিতে এক বিবৃতিতে আবু সোয়ে মিডল ইস্ট আই-কে বলেছিলেন যে, ইসরায়েলের উচিত এই পবিত্র স্থানটিকে নিয়ে "ছিনিমিনি না খেলা"।

তবে আমাদের এই পরিদর্শনের সাথে ইসরায়েলিদের অনধিকার অনুপ্রবেশের কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা এখানে এসেছি পশ্চিম তীরের আল-কুদস বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে দর্শন ও ইসলামিক স্টাডিজের অধ্যাপক হিসেবে নিয়োজিত আবু সোয়ের সঙ্গে কথা বলতে। তিনি আল-আকসায় জর্ডানের রাজা দ্বিতীয় আবদুল্লাহ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত একটি সম্মানিত একাডেমিক চেয়ারের 'আল-গাজ্জালী অধ্যাপক' হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

যে কক্ষটিতে বসে আল-গাজ্জালী কালজয়ী মাস্টারপিসটি লিখেছিলেন, আমরা অধ্যাপক সোয়ের সাক্ষাৎকারটি সেই কক্ষের ভেতরে নিতে পারব কি না তা জানতে চেয়েছিলাম। এটি হতে পারত এক জাদুকরী মুহূর্ত, কিন্তু পুরো ভবনটি ইসরায়েলি দখলদার বাহিনী তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে। তারা বসতি স্থাপনকারীদের অভিযানের সময় মসজিদের পূর্ব অংশে প্রবেশাধিকারও সীমিত করে দিয়েছিল।

একদা গাজ্জালীর চিন্তা-ভাবনা এবং লেখালেখির সেই কক্ষটির ওপর এখন দুটি পুলিশ চৌকি বসানো হয়েছে। আর তাই আমরা ছোট এবং সাধারণ একটি ইমামের কার্যালয়ের ভেতরে অধ্যাপক সোয়ের সঙ্গে দেখা করি। সোয়ে তার গৌরবময় একাডেমিক কর্মজীবনে ইমাম গাজ্জালীর ওপর অনেক বই লিখেছেন। আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিলাম যখন তিনি আমাদের গাজ্জালীর সেই চিরন্তন গল্পগুলো শোনাচ্ছিলেন।

তরুণ বয়সেই আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ একাডেমিক পদে নিয়োগ দেওয়া হয় গাজ্জালীকে

১০৫৮ সালে বর্তমান ইরানের তুস নগরীতে জন্মগ্রহণকারী আল-গাজ্জালীকে এতটাই প্রতিভাবান পণ্ডিত মনে করা হতো যে, তরুণ বয়সেই তাকে আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ একাডেমিক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। আর সেটি ছিল বাগদাদের নিজামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পদ।

অধ্যাপক সোয়ে জানান যে, শত শত ছাত্র এবং পণ্ডিত গাজ্জালীর বক্তৃতায় অংশ নিতেন। "তিনি সেলজুক সাম্রাজ্যের শক্তিশালী উজির নিজাম আল-মুলকের দরবারের অংশ হয়ে ওঠেন। তার বইগুলো ব্যাপকভাবে প্রশংসিত ও অনূদিত হয়েছিল।" 

ত্রিশের কোঠার মাঝামাঝি সময়ে গাজ্জালী নিজেকে তার যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রকাশ্য চিন্তাবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। কিন্তু ৪০ বছর বয়সে পৌঁছানোর আগেই তিনি এক গভীর ব্যক্তিগত সংকটে নিমজ্জিত হন। ‘গাজ্জালী তার ছাত্রদের পড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু মুখ থেকে একটি শব্দও উচ্চারণ করতে পারছিলেন না। তিনি খাবার খেতে পারছিলেন না। চিকিৎসকেরা তার আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন।’

অধ্যাপক সোয়ের রচিত 'এ ট্রেজারি অব গাজ্জালী' গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, কীভাবে খ্যাতি ও প্রাচুর্যের চূড়ায় থাকা সত্ত্বেও ইমাম গাজ্জালী পার্থিব মোহ ত্যাগ করে আধ্যাত্মিক শান্তির খোঁজে সুফি 'খুমুল' বা আত্মগোপনের পথ বেছে নিয়েছিলেন। তিনি বাগদাদ ত্যাগ করে দামেস্ক, জেরুজালেম ও হেব্রনে নির্জনতা ও ইবাদতে সময় কাটান এবং ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু থেকে দূরে থাকার শপথ গ্রহণ করেন।

অধ্যাপক সোয়ে গাজ্জালীর নিজের ভাষায় তার মানসিক আঘাতের বিবরণটি এভাবে তুলে ধরেছেন: ‘প্রায় ছয় মাস ধরে আমি পার্থিব আকাঙ্ক্ষার আকর্ষণ এবং চিরন্তন পরকালের আহ্বানের মধ্যে ক্রমাগত দোদুল্যমান ছিলাম। বিষয়টি আর পছন্দের পর্যায়ে ছিল না, বরং তা এক প্রকার বাধ্যবাধকতায় রূপ নিয়েছিল। আমার জিহ্বা শুকিয়ে দিয়েছিলেন যার ফলে আমি লেকচার দেওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছিলাম। আমার মুখ থেকে একটি শব্দও বের হচ্ছিল না, এবং আমি কোনো কাজই সম্পন্ন করতে পারছিলাম না।’

সোয়ে ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘গাজ্জালী এতটাই বিখ্যাত হয়ে উঠেছিলেন যে খলিফা এবং উজিরও তার সান্নিধ্য চাইতেন। তার খ্যাতি, ক্ষমতা ও প্রাচুর্য সবই ছিল। কিন্তু গাজ্জালী এই সবকিছুকেই প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।’ 


সোয়ে জানান যে, এই মহান চিন্তাবিদ তার আধ্যাত্মিক সংকট কাটিয়ে ওঠার সমাধান হিসেবে সবকিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার পথ বেছে নিয়েছিলেন। ‘তিনি তার চাকরি ছেড়ে দেন, পরিবারের প্রয়োজনের জন্য খুব সামান্য অংশ রেখে বাকি সমস্ত সম্পদ বিলিয়ে দেন। নিজের ক্ষমতা ও খ্যাতি বিসর্জন দিতে তিনি বাগদাদ ছেড়ে এমন সব দেশে চলে যান যেখানে তাকে কেউ চিনত না। সুফিদের ভাষায়, তিনি 'খুমুল' (নিভৃতবাস বা অখ্যাত থাকার অবস্থা) এর মধ্যে ছিলেন, যা খ্যাতির সম্পূর্ণ বিপরীত মেরু।’

সোয়ে আমাদের বলেন যে, ‘তিনি আল্লাহর  শরণাপন্ন হয়েছিলেন এবং এর সমাধানটি একটি আলোর মতো করে এসেছিল যা আল্লাহ তার অন্তরে নিক্ষেপ করেছিলেন।’

গাজ্জালী সম্ভবত কাফেলার সাথে দামেস্কে ভ্রমণ করেছিলেন, যেখানে তিনি উমাইয়া মসজিদে নির্জনতা খুঁজে নিয়েছিলেন। সেখানে যখন তিনি খুব বেশি পরিচিত হয়ে ওঠেন, তখন তিনি জেরুজালেমের দিকে যাত্রা করেন। ধারণা করা হয় যে, তিনি সেখানে আল-আকসা মসজিদের গোল্ডেন গেটের (বাব আল-রাহমাহ) ওপরের কক্ষগুলোতে দুই বছর অবস্থান করেছিলেন। এরপর তিনি হেব্রন (আল-খলিল) পরিদর্শন করেন।

সোয়ে বর্ণনা করেন, ‘সেখানে ইব্রাহিমি মসজিদে বসে তিনি শপথ নেন যে তিনি আর কারও সাথে কোনো তর্কে জড়াবেন না, ক্ষমতাবান কোনো ব্যক্তির দরবারে যাবেন না এবং তাকে প্রভাবিত করতে পারে এমন আশঙ্কায় কোনো উপহারও গ্রহণ করবেন না।’

১১ বছর নির্বাসনে থাকার পর নিজ জন্মভূমিতে ফিরে আসেন গাজ্জালী

অবশেষে তিনি হজ্জ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কা ও মদিনায় যাত্রা করেন এবং দীর্ঘ ১১ বছর নির্বাসনে থাকার পর নিজ জন্মভূমি তুস নগরীতে ফিরে আসেন। সেখানে তিনি নিভৃতবাসে চলে যান; গভীর চিন্তাভাবনা ও জ্ঞানচর্চায় জীবন কাটানোর পাশাপাশি শিক্ষকতাও চালিয়ে যান।

তৎকালীন প্রধান উজির গাজ্জালীকে অনুরোধ করেন যেন তিনি নিশাপুরের নিজামিয়া মাদ্রাসায় তার আগের শিক্ষাজীবনে ফিরে আসেন এবং পুনরায় পড়ানো শুরু করেন। এটি ছিল সেলজুকদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত বেশ কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী মাদ্রাসার একটি, যারা মধ্য এশিয়া থেকে আনাতোলিয়া পর্যন্ত এক বিশাল সাম্রাজ্য শাসন করত।

অধ্যাপক সোয়ে আমাদের বলেন যে, আল-গাজ্জালী প্রথমে এই পদটি গ্রহণ করতে দ্বিধাবোধ করছিলেন। তিনি নিজেকে প্রশ্ন করেছিলেন: ‘অহংকার বা দম্ভ ছাড়া শিক্ষা দেওয়ার মতো আধ্যাত্মিক শক্তি কি আমার আছে?’ শেষ পর্যন্ত তিনি রাজি হয়েছিলেন, কিন্তু অল্প সময়ের ব্যবধানে উজিরের হত্যাকাণ্ডের পর তিনি আবারও তুস নগরীতে ফিরে আসেন এবং সেখানেই ১১১১ সালে ৫৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

অধ্যাপক বলেন, ‘গাজ্জালীর শিক্ষা হলো আধুনিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের (সোশ্যাল মিডিয়া) নিয়মের সম্পূর্ণ বিপরীত আচরণ করা। বর্তমানের এই ভার্চুয়াল জগৎটি অন্যের প্রতি যত্নহীনতা এবং চরম আত্মকেন্দ্রিকতায় আচ্ছন্ন।’

সোয়ে উদাহরণ হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথা উল্লেখ করে বলেন; ‘তার নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যাল' মূলত তার অহংবোধ বা ইগোরই একটি রূপ। এমনকি তার বিশাল আকৃতির স্বাক্ষরটিও তার অহংকারেরই বহিঃপ্রকাশ।’ 

তার মতে, ট্রাম্প হলেন গাজ্জালীর দর্শনের সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর এক প্রতীক। তবে সোয়ে সতর্ক করে দিয়ে বলেন যে, কেবল ক্ষমতাবান মানুষেরাই এই অহংবোধের শিকার হন না। 

তিনি জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রেও মানসিক ও ধর্মীয় ফাঁদ সম্পর্কে গাজ্জালীর একটি বিখ্যাত সতর্কবাণী স্মরণ করিয়ে দেন; "হে জ্ঞানপিপাসু ব্যক্তি, যার মনে জ্ঞান অর্জনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা ও গভীর তৃষ্ণা রয়েছে। যদি জ্ঞান অর্জনের পেছনে তোমার উদ্দেশ্য হয় অন্যের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা, বড়াই করা, সমকক্ষদের ছাড়িয়ে যাওয়া, মানুষের দৃষ্টি নিজের দিকে আকর্ষণ করা এবং এই নশ্বর দুনিয়ার জাঁকজমক জড়ো করা, তবে জেনে রাখো, তুমি প্রকৃতপক্ষে তোমার ধর্মকে ধ্বংস করছো্, নিজেকে বিনাশ করছ এবং এই পার্থিব জীবনের বিনিময়ে তোমার পরকালকে বিক্রি করে দিচ্ছ।’


আধুনিক বিশ্বের জন্যও গাজ্জালীর বইয়ে ছিল প্রত্যক্ষ বার্তা

ইমাম গাজ্জালী তার বইগুলো লেখার পর প্রায় এক হাজার বছর পার হয়ে গেছে। অধ্যাপক সোয়ের মুখোমুখি বসে আমাদের কাছে একটা জিনিস পরিষ্কার হয়ে উঠছিল যে, এই মহান পণ্ডিত কেবল তার নিজের সময়ের উদ্দেশ্যেই কথা বলেননি। বরং এই মহান দূরদর্শী চিন্তাবিদ আমাদের বর্তমান আধুনিক বিশ্বের জন্যও একটি প্রত্যক্ষ বার্তা রেখে গেছেন।

সোয়ে বলেন, ‘পশ্চিমা বিশ্বের মানুষেরা রমজান সম্পর্কে শুনেছে এবং তারা জানে যে কীভাবে মুসলমানরা এই মাসে পানাহার থেকে বিরত থাকে। কিন্তু গাজ্জালী আমাদের শিখিয়েছেন যে সংযম বা আত্মনিয়ন্ত্রণের আরও অনেক রূপ রয়েছে।’

‘যেমন, জিহ্বার ক্ষতি বা অপব্যবহার থেকে বিরত থাকা: মিথ্যা বলা, গীবত (পরনিন্দা) করা, অভিশাপ দেওয়া, অপমান করা এবং অনর্থক কথাবার্তা পরিহার করা। হাতের সংযম রক্ষা করা—জাল চেক তৈরি না করা, কোনো ধরনের আর্থিক দুর্নীতি না করা এবং কাউকে নির্যাতন না করা। পায়ের সংযম বজায় রাখা; আপনার পা যেন কোনো ক্ষতিকর বা অনৈতিক স্থানে না চলে যায়, যেমন নাইটক্লাব, জুয়ার আড্ডা বা ক্যাসিনো। এমনকি কোনো স্বৈরাচারী শাসকের সমর্থনে আয়োজিত সমাবেশেও আপনার পা যেন আপনাকে নিয়ে না যায়।’

‘তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো অন্তরের সংযম। প্রতিটি মানুষকে এর মধ্য দিয়ে যেতে হয়, কারণ এর জন্য জাগতিক লোভ-লালসার বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হয়।

আপনি যদি কোনো বুনো ঘোড়াকে একবার বশ করতে পারেন, তবে সেটি সারাজীবনের জন্যই শান্ত হয়ে যায়। কিন্তু আপনি যদি আজ সন্ধ্যায় নিজের নফস বা অহংকে বশ করেন, তবে আগামীকাল সকালেই সেটি আবার বুনো রূপ ধারণ করবে। আমাদের প্রত্যেকের অন্তরেই ফেরেশতাসুলভ শক্তি এবং শয়তানি শক্তির মধ্যে এই যুদ্ধ প্রতিনিয়ত চলছে।’

আল-গাজ্জালীর এক বিশাল ঐতিহাসিক অবদান ছিল তৎকালীন গোঁড়া মুসলিম ধর্মতাত্তিক ও আইনবিদদের (ফকীহ) এটি বোঝানো যে, সুফি ইসলাম; যা আল্লাহর সাথে সরাসরি যোগাযোগের উদ্দেশ্যে মানুষের অহং বা ইগো দমনের শিক্ষা দেয়, তা কোনো ধর্মদ্রোহিতা বা বিদআত নয়।

তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, সুফিবাদ কেবল প্রচলিত সুন্নি ইসলামের নিয়মকানুন ও বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতার সাথেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, বরং এটি সরাসরি পবিত্র কুরআনের শিক্ষার অনুসারী।

কিছু পশ্চিমা বুদ্ধিজীবী অভিযোগ তোলেন যে, ইমাম গাজ্জালী ইসলামে বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনার বিকাশকে স্তব্ধ করে দিয়েছিলেন। অধ্যাপক সোয়ে এই অভিযোগের বিরুদ্ধে অত্যন্ত জোরালোভাবে গাজ্জালীর পক্ষ সমর্থন করেন।

‘বিজ্ঞানের সাথে গাজ্জালীর কোনো বিরোধ ছিল না। তার আপত্তি ছিল মূলত গ্রীক অধিবিদ্যা (মেটাফিজিক্স) নিয়ে। যুক্তিশাস্ত্র (লজিক) নিয়ে তার কোনো সমস্যা ছিল না। যুক্তি একটি প্রয়োজনীয় বিষয়। গণিতের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই রকম। এই সমালোচকরা গাজ্জালীকে বোঝেননি। ১২৫৮ সালে মঙ্গোলরা প্রাচ্যের ইসলামিক সভ্যতার কেন্দ্রস্থল বাগদাদকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছিল। তারা অভিজাত শ্রেণী, রাজনীতিবিদ ও পণ্ডিতদের হত্যা করেছিল; বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও লাইব্রেরি ধ্বংস করেছিল এবং নারীদের উপপত্নী বানিয়েছিল। এটি গাজ্জালীর কারণে ঘটেনি, ঘটিয়েছিল মঙ্গোলরা।’

‘আমি আন্দালুসিয়া (তৎকালীন মুসলিম স্পেন) ভ্রমণ করেছি এবং সেখানকার ইসলামী ঐতিহ্য দেখেছি। আমি মধ্যযুগীয় আন্দালুসিয়ায় পেট কাটার (ওপেন অ্যাবডোমিনাল) অস্ত্রোপচারে ব্যবহৃত শল্যচিকিৎসার যন্ত্রপাতি দেখেছি। এই সরঞ্জামগুলো ছিল অত্যন্ত উন্নত ও পরিশীলিত, যা বর্তমান যুগে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির কাছাকাছি। কৃষি, চিকিৎসা, স্থাপত্য এবং সাহিত্যের অর্জনগুলোর দিকে তাকান। জ্যোতির্বিজ্ঞানে অ্যাস্ট্রোল্যাব (নক্ষত্র মাপার যন্ত্র) তৈরিতে মরিয়ম আল-অ্যাস্ট্রোল্যাবীর অনন্য অবদানের কথা বিবেচনা করুন।’

অধ্যাপক সোয়ে ইঙ্গিত করেন যে, ১৫ শতকে ফার্ডিনান্ড এবং ইসাবেলার অধীনে স্পেনের পুনর্দখল ও একীভূতকরণ ঘটেছিল। তখন বহু মুসলমান ও ইহুদিকে খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য করা হয় অথবা আইবেরিয়ান উপদ্বীপ ছেড়ে চলে যেতে হয়। এর মাধ্যমেই অবসান ঘটে আন্দালুসীয় সভ্যতার। এছাড়া দ্বাদশ শতাব্দীর দীর্ঘ সময় জুড়ে ক্রুসেডারদের দ্বারা জেরুজালেমের ওপর চাপিয়ে দেওয়া নৃশংস শাসন ব্যবস্থা ইসলামের বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যকে ধ্বংস করার পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছিল। 

তিনি বলেন, ‘ইসলামের পূর্ব প্রান্ত, পশ্চিম প্রান্ত এবং কেন্দ্রস্থল—সবকিছুই বহিরাগত শক্তি দ্বারা ধ্বংস ও বিধ্বস্ত হয়েছিল। এর জন্য একজন মুসলিম পণ্ডিতকে দোষারোপ করা একেবারেই অন্যায়।’

আমরা পুরো সকাল জুড়ে অধ্যাপক সোয়ের কথা শুনতে পারতাম, কিন্তু ইসরায়েলি দখলদারিত্বের বিরক্তিকর নিয়মের কারণে আমাদের সময় শেষ হয়ে গিয়েছিল এবং আমাদের চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

ক্রুসেডারদের প্রত্যাবর্তন: সে সময় রাস্তাগুলো হাঁটু সমান রক্তে ভেসে গিয়েছিল

১০৯৯ সালে ক্রুসেডার বাহিনী জেরুজালেম দখল করার পর থেকে এটিই ছিল এই মসজিদের দীর্ঘতম বন্ধের ঘটনা। সে সময় হাজার হাজার মুসলমান ও ইহুদিকে হত্যা করা হয়েছিল, যাকে আধুনিক ইতিহাসবিদরা ‘জেরুজালেম গণহত্যা’ বলে অভিহিত করেন। সমসাময়িক ইতিহাস লেখকরা উল্লেখ করেছিলেন যে, সে সময় রাস্তাগুলো হাঁটু সমান রক্তে ভেসে গিয়েছিল।


ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথের বাইসেপে ক্রুসেডারদের যুদ্ধের স্লোগান ‘Deus Vult’ (ইশ্বরের ইচ্ছা) ট্যাটু করা রয়েছে এবং তার বুকে খোদাই করা আছে ক্রুসেডারদের প্রতীক 'ক্রুস'। ক্রুসেডাররা এই পবিত্র চত্বরটিকে 'নাইটস টেম্পলার'- এর সদর দপ্তরে পরিণত করেছিল। ১১৮৭ সালে সালাহউদ্দিন আইয়ুবী জেরুজালেম পুনর্দখল করার আগ পর্যন্ত সেখানে মুসলমানদের ইবাদত নিষিদ্ধ করেছিল তারা। এই চত্বরটি ক্রুসেডারদের হস্তগত হওয়ার মাত্র কয়েক মাস আগে ইমাম গাজ্জালী এখান থেকে চলে গিয়েছিলেন। আর আজ আল-আকসা মসজিদ আবারও হুমকির মুখে।


বেন গভিরের মতো ইসরায়েলি রাজনীতিবিদদের উসকানিতে, ধর্মান্ধ 'টেম্পল মাউন্ট' আন্দোলন ডোমে অব দ্য রক (কুব্বাতুস সাখরা) এবং আল-আকসা মসজিদের স্থানে একটি তৃতীয় মন্দির নির্মাণের ধর্মীয় মিশন নিয়ে কাজ করছে। ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ সমর্থন থাকায়, গাজ্জালী এই শহর ত্যাগ করার প্রায় এক হাজার বছর পর তারা হয়তো সফলও হয়ে যেতে পারে, এমন একটি আশঙ্কাই তৈরি হয়েছে এখন।


গত ১৩ শতাব্দী ধরে আল-আকসা তীর্থযাত্রী, সত্যসন্ধানী, পণ্ডিত এবং বিশ্বাসী নারী-পুরুষদের অন্যতম গন্তব্যস্থল ছিল। যার মধ্যে ৯০০ বছরেরও বেশি সময় আগে এখানে আসা আবু হামিদ আল-গাজ্জালীও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। কিন্তু আজ ইসরায়েলি দখলদারিত্বের কারণে অনেক মুসলমানের জন্য আল-আকসায় প্রবেশ করাই কঠিন হয়ে পড়েছে, নামাজ পড়া তো দূরের কথা।