২৬ মার্চ ২০২৬, ০৮:৪৩

শাওয়ালের ছয় রোযা: ফাযায়েল ও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মাসায়েল

প্রতীকী ছবি   © সংগৃহীত

শাওয়াল মাসের ছয়টি রোজা রাসূল ﷺ নিজে রাখতেন এবং সাহাবিদেরকে রাখতে উদ্বুদ্ধ করতেন। এই ছয় রোজার রয়েছে অপরিসীম গুরুত্ব ও ফযিলত। হাদীস শরিফে আছে, হযরত আবু আইয়ূব আনসারী রা. থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেছেন- مَنْ صَامَ رَمَضَانَ ثُمّ أَتْبَعَهُ سِتّا مِنْ شَوّالٍ، كَانَ كَصِيَامِ الدّهْرِ [যে মাহে রমযানের রোযা রাখল এরপর শাওয়ালে ছয়টি রোযা রাখল এটি তার জন্য সারা বছর রোযা রাখার সমতুল্য হবে। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ১১৬৪]

এ মর্মে আরো ইরশাদ হয়েছে, হজরত সাওবান (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল ﷺ বলেছেন, রমজানের রোজা দশ মাস রোজার সমতুল্য আর (শাওয়ালের) ছয় রোজা দুই মাসের সমকক্ষ। এই হল মোট এক বছরের রোজা। (সুনানুন নাসায়ি কুবরা: ২৮৬০, সহীহ ইবনে খুযায়মা, হাদীস ২১১৫; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২২৪১২; সুনানে কুবরা, বায়হাকী ৪/২৯৩)

এই রোজার সওয়াব আল্লাহ তা'য়ালা দশগুণ বৃদ্ধি করে দেন। রমজান দশ মাস সমান আর শাওয়ালের ছয় দিন দুই মাস সমান। মোট এক বছর।

শাওয়ালের ছয় রোজার সময়

পুরো শাওয়াল মাস। ঈদুল ফিতরের পরের দিন থেকে জিলকদ মাসের চাঁদ দেখা পর্যন্ত। এই ছয় রোজা ধারাবাহিক রাখা জরুরি নয়। পুরো সময়ের ভেতর ছয়টি রোজা পূর্ণ করতে পারলেই সুন্নত আদায় হয়ে যাবে।শাওয়ালের ছয় রোযা ধারাবাহিকভাবে একত্রে রাখা যায়, আবার বিরতি দিয়েও রাখা যায়। যেভাবেই রাখা হোক তা আদায় হয়ে যাবে এবং নির্ধারিত ফযীলতও লাভ হবে।

-লাতাইফুল মাআরিফ ৪৮৯; বাদায়েউস সানায়ে ২/২১৫; আলমাজমূ ৬/৪২৬-৪২৭; আলমুহীতুল বুরহানী ৩/৩৬২; ফাতহুল মুলহিম ৩/১৮৭; আলমুগনী ৪/৪৩৮

তবে ধারাবাহিকতা রক্ষা করা উত্তম। একটি বর্ণনায় ঈদের পর দিন থেকে ধারাবাহিকভাবে রাখার কথা আছে। ঈদুল ফিতরের পরের দিন থেকে রোজা রাখা শুরু করা যায়; এটাই উত্তম। 

সহীহ মুসলিমের ভাষ্যকার ইমাম নববী রাহ. একটি হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘আমাদের মনীষীদের মতে, উত্তম হচ্ছে ঈদুল ফিতরের পরের ছয় দিন পরপর রোযাগুলো রাখা। তবে যদি বিরতি দিয়ে দিয়ে রাখে বা মাসের শেষে রাখে তাহলেও ‘রমাযানের পরে’ রোযা রাখার ফযীলত পাওয়া যাবে। কারণ সব ছুরতেই বলা যায়, ‘রমযানের পরে শাওয়ালের ছয় রোযা রেখেছে।’ -শরহু সহীহ মুসলিম, নববী।

রমযানের কাযা রোযা এবং শাওয়ালের ছয় রোযার একত্রে নিয়ত করা যাবে কি?

রমযানের কাযা রোযা এবং শাওয়ালের ছয় রোযা একত্রে নিয়ত করলে শুধু রমযানের কাযা রোযা আদায় হবে। শাওয়ালের ছয় রোযা আদায় হবে না। শাওয়ালের ছয় রোযা রাখতে হলে পৃথকভাবে শুধু এর নিয়তে রোযা রাখতে হবে।

-বাদায়েউস সানায়ে ২/২২৮; আদ্দুররুল মুখতার ২/২৭৯; ফাতহুল কাদীর ২/২৪৮; আলমুহীতুল বুরহানী ৩/৩৪৪; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/১৯৭

শাওয়ালের রোজা কি শুধু নারী বা শুধু পুরুষের জন্য? না, এটি নারী-পুরুষ সবার জন্যই মুস্তাহাব।

কীভাবে নিয়ত করবেন?

শাওয়ালের রোজার নিয়তের জন্য আলাদা কোনো নির্দিষ্ট আরবি দোয়া নেই। মনে মনে এই নিয়ত করলেই যথেষ্ট: ‘আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য শাওয়ালের ছয় রোজার মধ্যে আজকের রোজার নিয়ত করলাম।’

শাওয়াল মাসের ছয় রোজা রাখার আগেই মাস শেষ হয়ে গেলে করণীয়?

যেহেতু নফল রোজা তাই শাওয়াল মাসের ছয়টি রোজার এক/একাধিক/সবগুলো রোজা রাখার আগেই শাওয়াল মাস শেষ হয়ে গেলে এক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক কিছু করতে হবে না। তবে সামনে থেকে খেয়াল রাখতে হবে যেন মাস শেষ হওয়ার আগেই শাওয়ালের রোজাগুলো রাখা সম্ভব হয়। এছাড়া বছরজুড়ে ফজিলতপূর্ণ আরো অনেক নফল রোজা আছে, সেগুলোও রাখার চেষ্টা করতে হবে। যেমন, জিলহজের প্রথম নয়দিনের রোজা, মহররমের দুইটি রোজা, শাবানের রোজা, প্রতি আরবি মাসের ১৩,১৪,১৫ তারিখের রোজা, সোম ও বৃহস্পতিবারের রোজা ইত্যাদি।

শাওয়ালের ছয় রোজা এবং আইয়ামে বীজের ৩ টি রোজা কি এক সাথে রাখা যায়?

নফল রোযার ক্ষেত্রে একই দিন একত্রে একাধিক নিয়ত করার অবকাশ রয়েছে। শাওয়ালের ছয় রোযা এবং আইয়ামুল বীযের (প্রতি আরবি মাসের ১৩,১৪,১৫ তারিখের) রোযা একই দিনে নিয়ত করতে পারবেন। মনে মনে এইভাবে নিয়ত করবেন, আল্লাহ ! আমি আগামীকাল আইয়ামুল বীযের প্রথম রোযা এবং শাওয়ালের ছয় রোযার নিয়ত করলাম।

শাওয়ালের ছয় রোজা আগে, নাকি রমজানের কাজা রোযা?

এ বিষয়ে আলেমগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। প্রথম মত: আগে কাজা, পরে শাওয়ালের ছয় রোজা

অনেক আলেমের মত হলো, রমজানের কাজা রোজা আগে আদায় করতে হবে, এরপর শাওয়ালের ছয় রোজা রাখতে হবে। কারণ হাদীসে বলা হয়েছে, ‘যে রমজানের রোজা রাখল, অতঃপর শাওয়ালে ছয়টি রোজা রাখল... এখানে অতঃপর শব্দটি ক্রমধারা বোঝায়, অর্থাৎ আগে রমজান পূর্ণ করতে হবে, তারপর শাওয়ালের রোজা। যার কাজা বাকি আছে সে তো পূর্ণ রমজান রোজা রাখেনি, তাই কাজা আদায়ের আগে সে এই বিশেষ সওয়াব পাবে না। এ ছাড়া রমজানের কাজা ফরজ, আর শাওয়ালের ছয় রোজা মুস্তাহাব- তাই ফরজ দায়িত্বকেই অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

দ্বিতীয় মত: শাওয়ালের ছয় রোজা আগে রাখা যায়

আরেকটি মতে বলা হয়েছে, শাওয়ালের ছয় রোজা আগে রেখে পরে কাজা আদায় করলেও চলবে। কারণ শাওয়ালের রোজার সময় সীমিত- মাস শেষ হলে আর রাখার সুযোগ নেই। পক্ষান্তরে কাজা রোজার জন্য পুরো এগারো মাস হাতে আছে, এমনকি পরের শাবান মাস পর্যন্তও রাখা যায়। হজরত আয়েশা (রা.) নিজেও রমজানের কাজা শাবান মাসে রাখতেন, কারণ রাসূল ﷺ-এর খেদমতে ব্যস্ত থাকায় আগে সুযোগ পেতেন না। (সহীহ মুসলিম: ২৫৭৭) সুতরাং এই মতে, শাওয়ালের সীমিত সময়ের কথা বিবেচনা করে ছয় রোজা আগে রেখে কাজা পরে পূর্ণ করা অযৌক্তিক নয়।

শাওয়ালের ছয় রোজার আরো কিছু উপকারিতা

ক. ফরজ নামাজের আগে পরে যেমন সুন্নত নামাজ আছে, রমজানের ফরজ রোজার জন্য শাবান ও শাওয়ালের রোজা তেমনি। হাদীসে আছে রাসূল সা. বলেছেন, “কিয়ামতের দিন ফরজ নামাজে ত্রুটি-বিচ্যুতি দেখা দিলে সেটা নফল নামাজ দিয়ে পূর্ণ করা হবে।” অনেক সময় ফরজ রোজায় ত্রুটি ও অপূর্ণতা থেকে যায়। সেই ত্রুটি পূর্ণ হবে এই সব নফল রোজার দ্বারা।

খ. রমজানের রোজার পর আবার শাওয়ালের রোজা রাখতে পারাটা রমজানের রোজা কবুল হওয়ার একটি আলামত। কারণ আল্লাহ তাআলা যখন কোনো বান্দার নেক কাজ কবুল করেন তখন অন্য আরও নেক কাজের তাওফিক দান করেন।

গ. রমজানের রোজার কারণে আল্লাহ পেছনের গুনাহ মাফ করে দেন। ফলে বান্দার উচিত কৃতজ্ঞতা স্বরূপ আরও রোজা রাখা। (লাতাইফুল মাআরিফ লি ইবনি রজব: ২২০-২২১)।

সমাপনী

রমজান চলে গেছে, কিন্তু আল্লাহর রহমতের দরজা বন্ধ হয়নি। রমজানে যে ভালো অভ্যাসগুলো গড়ে উঠেছে, সেগুলো যেন রমজানের সাথেই শেষ না হয়ে যায়। শাওয়ালের ছয় রোজা সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখার এক অসাধারণ সুযোগ এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ উপহার, যা হাতছাড়া করা উচিত নয়।

তবে শুধু শাওয়ালের ছয়টি রোজা রাখাই যথেষ্ট নয়; কুরআন তিলাওয়াত, একাগ্রচিত্তে সালাত আদায়, নিয়মিত সাদাকা, দোয়া ও ইস্তিগফার- রমজানে গড়ে ওঠা এই অভ্যাসগুলো অব্যাহত রাখাই হোক আমাদের লক্ষ্য। রমজান আমাদের বদলে দিয়েছে; এখন সেই পরিবর্তনকে আজীবনের সঙ্গী করে নেওয়ার পালা।

মোহাম্মদ আলী হাসান, প্রভাষক, আল-ফিকহ এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়া, ঢাকা।