২১ মার্চ ২০২৬, ১৮:৪৮

‎রেকর্ড গড়ে শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে ঈদের নামাজ আদায় করলেন ৭ লাখ মুসল্লি

কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান  © সংগৃহীত

এ এক অভূতপূর্ব দৃশ্য! ঈদে বরাবরই লাখো মুসল্লির পদভারে মুখরিত হয় কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান। এবার সেই শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান  নতুন এক ইতিহাসের সাক্ষী হল। পবিত্র ঈদুল ফিতরের জামাতকে ঘিরে মুসলিম সম্প্রদায়ের মহামিলন কেন্দ্র হয়ে ওঠলো ঐতিহ্যবাহী এ ঈদগাহ ময়দান। আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও আনুগত্য প্রকাশের দৃষ্টান্ত রাখতে অন্তত সাত লাখ মুসল্লি অংশ নিলেন শোলাকিয়ার ঈদ জামাতে।

শনিবার (২১ মার্চ) সকাল ১০টায় ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হলেও সকাল ৯টার মধ্যেই জনসমুদ্রে পরিণত হয় ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান। তখনো চলছিল শোলাকিয়া অভিমুখে মুসল্লিদের ঢল।

লাখ লাখ মুসল্লির সঙ্গে একত্রিত হওয়ার বিরল অভিজ্ঞতা ও মানসিক প্রশান্তির জন্য শোলাকিয়া অভিমুখে ছুটে আল্লাহর সান্নিধ্য পেতে ব্যাকুল হৃদয়। ফলে জামাত শুরুর আগেই শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান ছাড়িয়ে মাঠের আশে-পাশের রাস্তা, ঈদগাহ পুকুর, শোলাকিয়া সেতু, সেতু পেরিয়ে কিশোরগঞ্জ-করিমগঞ্জ সড়কে ছড়িয়ে যায় জন¯্রােত। তাতেও জায়গা না পেয়ে বাসাবাড়ির ছাদ, উঠান, অদূরের গাছবাজার এলাকা এবং বিভিন্ন গলিপথে জামাতের জন্য দাঁড়ান বিপুল সংখ্যক মুসল্লি। স্বভাবতই শোলাকিয়ার ঈদ জামাত হয়ে যায় এক মহাসমুদ্র।

‎লাখো কণ্ঠের আল্লাহু আকবর ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে শোলাকিয়া ঈদগাহ এলাকা। এতো বড় ঈদ জামাত এর আগে কখনো দেখেনি শোলাকিয়া।
‎ঐতিহ্যবাহী শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে এবার ১৯৯তম ঈদুল ফিতরের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। শোলাকিয়ার মূল ইমাম মুফতি আবুল খায়ের মুহাম্মদ ছাইফুল্লাহ ঈদ জামাতে ইমামতি করেন।
‎রেওয়াজ অনুযায়ী, সকাল ১০টায় ঈদ জামাত শুরু হওয়ার ১৫, ৫ ও ১ মিনিট আগে শর্টগানের ফাঁকা গুলির আওয়াজ করে নামাজের প্রস্তুতির সংকেত দেওয়া হয়।

জামাত শেষে ইমাম মুফতি আবুল খায়ের মুহাম্মদ ছাইফুল্লাহ দেশ-জাতি ও মুসলিম উম্মাহর জন্য মঙ্গল কামনা. পাপ থেকে মুক্তি এবং আল্লাহর রহমত কামনা করে বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করেন। লাখো মুসল্লির উচ্চকিত হাত আর আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার আমীন, আমীন ধ্বনিতে এ সময় মুখরিত হয়ে উঠে পুরো ঈদগাহ এলাকা।
‎ঈদ জামাতকে কেন্দ্র করে এবারও নেওয়া হয় নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা। মাঠে স্থাপন করা হয় ওয়াচ টাওয়ার। ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার আওতায় নিয়ে আসা হয় ঈদগাহ ময়দান, আশেপাশের এলাকা এবং অলিগলিসহ মাঠ সংলগ্ন চারপাশ। পুলিশের নিরাপত্তা পরিকল্পনায় এবারো যুক্ত ছিল ড্রোন। সেনাবাহিনী, বিজিবি, র‌্যাব, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ান এবং পুলিশের ১১০০ জন সদস্যসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেড় হাজারের মতো সদস্য দিয়ে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেয়া হয় শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানকে।

ঈদগাহ ময়দানের প্রবেশপথে স্থাপিত আর্চওয়ে দিয়ে মুসল্লিদের ঢুকতে হয় ঈদগাহ ময়দানে। এর আগে আরো অন্তত কয়েক দফা মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে মুসল্লিদের দেহ তল্লাসি করা হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে মুসল্লিদের শুধু জায়নামাজ নিয়ে ঈদগাহে ঢুকতে দেয়া হয়।

ঈদের দিন শোলাকিয়ায় ঈদের জামাতে অংশগ্রহণকারী মুসল্লিদের যাতায়াতের সুবিধার্থে ২টি স্পেশাল ট্রেন চলাচল করেছে। একটি ট্রেন ভৈরব থেকে সকাল ৬টায় ছেড়ে আসে এবং অন্যটি ময়মনসিংহ থেকে সকাল পৌনে ৬টায় ছেড়ে আসে। মাঠের সুনাম ও জনশ্রুতির কারণে কিশোরগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চল ও সারাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে শোলাকিয়ায় মুসল্লিদের সমাগম ঘটে।

‎ঈদ জামাত শুরুর আগে বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম এমপি, কিশোরগঞ্জ-১ (সদর-হোসেনপুর) আসনের সংসদ সদস্য মাজহারুল ইসলাম, ঈদগাহ মাঠ পরিচালনা কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা, পুলিশ সুপার ড. এস এম ফরহাদ হোসেন এবং জেলা পরিষদ প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল খান মুসল্লিদের স্বাগত ও শুভেচ্ছা জানিয়ে বক্তব্য রাখেন।

ঈদ জামাতে জেলা প্রশাসন, বিচার বিভাগ, রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ অংশ নেন। জামাতে অংশ নেওয়া মুসল্লিদের মধ্যে গাজীপুর জেলার কাশিমপুর এলাকার হাজী সিরাজ (৭৭) জানান, গত ৫৪ বছরে শোলাকিয়া মাঠে তাঁর কোন জামাত বাদ পড়েনি। তিনি বলেন, ‘লাখ লাখ মানুষের সাথে আল্লাহর সামনে হাজির হই। লাখ লাখ হাতের সঙ্গে আমিও দুই হাত তুলে দেশ ও দশের মঙ্গল কামনা করে মোনাজাত করি। এ এক বিরল অভিজ্ঞতা ও শান্তি। তাই বাড়িতে বসে থাকতে পারি না। শত কষ্ট উপেক্ষা করে চলে আসি শোলাকিয়ায়।’