২১ মার্চ ২০২৬, ০৬:১১

পবিত্র ঈদুল ফিতর আজ

পবিত্র ঈদুল ফিতর  © সংগৃহীত

সিয়াম সাধনার মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে পবিত্র রমজান মাস। আনন্দ, উৎসব ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা নিয়ে আজ শনিবার (২১ মার্চ) সারা দেশে উদযাপিত হচ্ছে মুসলিম উম্মাহর প্রধান ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল ফিতর। দীর্ঘ ৩০ দিন রোজা পালনের পর ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা আজ ঈদের জামাতে অংশ নেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছেন এবং রাজধানীসহ সারা দেশের ঈদগাহ ও মসজিদগুলোতে ইতোমধ্যে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার দেশের কোথাও ১৪৪৭ হিজরি সনের পবিত্র শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা যায়নি। ফলে শনিবার সারা দেশে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে অবস্থিত ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের সম্মেলন কক্ষে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। 

বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ। বৈঠক শেষে তিনি দেশবাসী ও মুসলিম উম্মাহকে ঈদের শুভেচ্ছা জানান। এ বৈঠকে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক আ. ছালাম খান, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (পশ্চিম এশিয়া) মো. হুমায়ুন কবীর, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব ছাদেক আহমদ, প্রধান তথ্য অফিসার ইয়াকুব আলীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

আজ সকাল থেকেই রাজধানীসহ সারা দেশের ঈদগাহ ও মসজিদগুলোতে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হবে। কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান, ঢাকার জাতীয় ঈদগাহ, জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমসহ প্রধান প্রধান ঈদগাহগুলোতে প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবাই আজ ঈদের আনন্দে মেতে উঠবে।

জানা গেছে, এবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ব্যবস্থাপনায় জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হবে সকাল সাড়ে ৮টায়। আবহাওয়া প্রতিকূল বা অন্য কোনো অনিবার্য কারণে এ জামাত সম্ভব না হলে সকাল ৯টায় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হবে। ঈদের প্রধান জামাতে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মুফতি মুহাম্মদ আবদুল মালেক জাতীয় ঈদগাহে ইমামতি করবেন এবং বিকল্প ইমাম হিসেবে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মুফাসসির ড. মাওলানা মো. আবু ছালেহ পাটোয়ারী প্রস্তুত থাকবেন।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে ঈদের প্রধান জামাতে একসঙ্গে নামাজ আদায় করবেন। বৈরী আবহাওয়ার কথা মাথায় রেখে ঈদের প্রধান জামাতের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম ঢাকাবাসীকে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে প্রধান জামাতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি জানান, ঈদগাহ ময়দানে ৩ হাজার ৫০০ নারীসহ মোট ৩৫ হাজার মুসল্লির নামাজের ব্যবস্থা করা হয়েছে। নারীদের জন্য আলাদা প্রবেশপথ, ওজু ও নামাজের ব্যবস্থা এবং মেডিকেল টিম রাখা হয়েছে।

আরও পড়ুন: সদরঘাট ট্র্যাজেডি: দুই দিন পর মিরাজের লাশ উদ্ধার

রাজধানীতে ঈদ জামাতকে ঘিরে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার। তিনি বলেন, ঈদকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের নিরাপত্তা শঙ্কা নেই। জাতীয় ঈদগাহ ময়দান ও আশপাশের এলাকায় সিসি ক্যামেরা দিয়ে নজরদারি করা হবে এবং মৎস্যভবন, প্রেস ক্লাব ও শিক্ষা ভবন এলাকায় ব্যারিকেড বসানো হবে। ঈদগাহে প্রবেশের সময় আর্চওয়ে ও মেটাল ডিটেক্টর ব্যবহার করা হবে। নারীদের জন্য আলাদা প্রবেশ গেট ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এছাড়া সিটিটিসির ডগ স্কোয়াড ও স্পেশাল ব্রাঞ্চের টিম মোতায়েন থাকবে।

জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে প্রতি বছরের মতো এবারও পাঁচটি ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হবে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সেখানে সকাল ৭টা, ৮টা, ৯টা, ১০টা ও বেলা পৌনে ১১টায় পর্যায়ক্রমে পাঁচটি জামাত অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম জামাতে ইমামতি করবেন সিনিয়র পেশ ইমাম মাওলানা মিজানুর রহমান, দ্বিতীয় জামাতে মুফতি মুহিব্বুল্লাহিল বাকী নদভী, তৃতীয় জামাতে মাওলানা মো. জাকির হোসেন, চতুর্থ জামাতে মাওলানা যোবায়ের আহমেদ আল আযহারী এবং পঞ্চম জামাতে ইমামতি করবেন মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল্লাহ। বিকল্প ইমাম হিসেবে থাকবেন মাওলানা শহীদুল ইসলাম।

এদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র সংলগ্ন পুরাতন বাণিজ্য মেলার মাঠে সকাল ৮টায় কেন্দ্রীয় ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হবে। জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায়ও সকাল ৮টায় ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে স্পিকার, চিফ হুইপ, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অংশ নেবেন। এ জামাত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ মসজিদুল জামি’আয় এ বছর দুটি ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম জামাত সকাল ৮টায় এবং দ্বিতীয় জামাত সকাল ৯টায় অনুষ্ঠিত হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তর এ তথ্য জানিয়েছে।

রাজধানীর বাইরে কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে দেশের বৃহত্তম ঈদ জামাতের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। ১৮২৮ সালে শুরু হওয়া এ জামাতের ধারাবাহিকতায় এবার সেখানে ১৯৯তম ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হবে। সকাল ১০টায় জামাত শুরু হবে এবং রেওয়াজ অনুযায়ী জামাত শুরুর আগে তিনবার বন্দুকের ফাঁকা গুলি ছোড়া হবে। মুসল্লিদের জন্য পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। মুসল্লিদের সুবিধার্থে কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ ও ভৈরব-কিশোরগঞ্জ রুটে শোলাকিয়া এক্সপ্রেস নামে দুটি বিশেষ ট্রেন চলাচল করবে।

চট্টগ্রাম নগরের জমিয়াতুল ফালাহ জাতীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে সকাল ৮টায় প্রধান ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হবে এবং সকাল পৌনে ৯টায় দ্বিতীয় জামাত অনুষ্ঠিত হবে। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে জেলা স্টেডিয়ামের জিমনেসিয়াম মাঠেও সকাল সাড়ে ৮টায় ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া দিনাজপুরের গোর-এ-শহীদ বড় মাঠে সকাল ৯টায় ঈদের বড় জামাত অনুষ্ঠিত হবে।

এর আগে পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশবাসীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও মোবারকবাদ জানিয়েছেন। আলাদা বাণীতে তারা দেশবাসীর সুখ, সমৃদ্ধি ও শান্তি কামনা করেছেন এবং প্রধানমন্ত্রী ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে দেশ গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

ঈদ উপলক্ষে মঙ্গলবার থেকে টানা সাত দিনের সরকারি ছুটি শুরু হয়েছে। সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং ‘ঈদ মোবারক’ লেখা ব্যানার প্রদর্শন করা হয়েছে। সরকারি ভবন ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আলোকসজ্জা করা হয়েছে। এছাড়া হাসপাতাল, কারাগার, সরকারি শিশু সদন, বৃদ্ধ নিবাস, প্রতিবন্ধী কেন্দ্র, আশ্রয় কেন্দ্র ও বিভিন্ন কল্যাণ প্রতিষ্ঠানে উন্নতমানের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

ঈদ উপলক্ষে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন শিশু পার্কে বিনা টিকিটে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জাদুঘর, আহসান মঞ্জিল, লালবাগের কেল্লাসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে বিনা টিকিটে প্রবেশের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমিতে শিশুদের ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানের আয়োজনও করা হয়েছে। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস ও মিশনগুলোও যথাযথভাবে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপন করবে।

সারা দেশে যথাযথ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, ব্যাপক উৎসাহ, আনন্দ ও উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে মুসলমানরা আজ তাদের বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপন করছেন।