২০ মার্চ ২০২৬, ১৬:৩৭

নবীজী (সা.) ও সাহাবাদের জীবনে ঈদ: আনন্দ, ইবাদত ও মানবিকতার অনন্য শিক্ষা

প্রতীকী ছবি  © সংগৃহীত

মুসলমানদের জন্য বছরে দুটি ঈদ পবিত্র ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। মুসলিম উম্মাহর জন্য আনন্দ, কৃতজ্ঞতা ও ভ্রাতৃত্বের এক মহিমান্বিত দিন এটি। এক মাস সিয়াম সাধনার পর আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে পবিত্র ঈদুল ফিতর যেন পুরস্কারের দিন। কিন্তু এই ঈদের প্রকৃত শিক্ষা কী তা সবচেয়ে সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এবং তাঁর সাহাবাদের জীবনে। তাদের জীবনধারা থেকে জানা যায়, ঈদ ছিল কেবল আনন্দের নয়; বরং ইবাদত, দান-সদকা, পারস্পরিক ভালোবাসা এবং মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

ইসলামে ঈদের সূচনা

ইসলামের আগমনের আগে আরব সমাজে বিভিন্ন উৎসব পালনের প্রচলন ছিল। মদিনায় হিজরতের পর নবীজী (সা.) দেখলেন, মানুষ বছরে দুটি দিন আনন্দ-উৎসব করে। তখন তিনি বলেন, আল্লাহ তোমাদের সেই দুটি দিনের পরিবর্তে এর চেয়েও উত্তম দুটি দিন দান করেছেন ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা।(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১১৩৪) এর মাধ্যমে ইসলামে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার প্রবর্তন ঘটে।

ঈদের দিন নবীজী (সা.)-এর আমল

হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ঈদের দিন মহানবী (সা.) কয়েকটি বিশেষ আমল করতেন। প্রথমত, ঈদের দিন তিনি ফজরের পর গোসল করতেন এবং উত্তম পোশাক পরিধান করতেন। দ্বিতীয়ত, ঈদুল ফিতরের দিন ঈদের নামাজে যাওয়ার আগে তিনি খেজুর খেতেন। হাদিসে এসেছে নবী (সা.) ঈদুল ফিতরের দিন কয়েকটি খেজুর না খেয়ে বের হতেন না। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯৫৩)
তৃতীয়ত, তিনি খোলা ময়দানে ঈদের নামাজ আদায় করতেন এবং সবাইকে এতে অংশগ্রহণের উৎসাহ দিতেন এমনকি নারীদেরও।

উম্মে আতিয়্যা (রা.) বর্ণনা করেন, আমাদেরকে ঈদের দিনে বের হতে নির্দেশ দেওয়া হতো, এমনকি পর্দানশীন নারীরাও বের হতো। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩২৪)

খাবার গ্রহণ 

ঈদুল ফিতরের দিনে ঈদের সালাত আদায়ের পূর্বে খাবার গ্রহণ করা এবং ঈদুল আজহার দিন ঈদের সালাতের পূর্বে কিছু না খেয়ে সালাত আদায়ের পর কুরবানির গোশত খাওয়া সুন্নাত। বুরাইদা (রা) থেকে বর্ণিত, ‘নবী কারীম (স) ঈদুল ফিতরের দিনে না খেয়ে বের হতেন না, আর ঈদুল আজহার দিনে ঈদের সালাতের পূর্বে খেতেন না।’ [সুনান আততিরমীযি : ৫৪৫]

শুভেচ্ছা বিনিময়

ঈদে পরস্পরকে শুভেচ্ছা জানানো শরিয়ত অনুমোদিত একটি বিষয়। বিভিন্ন বাক্য দ্বারা এ শুভেচ্ছা বিনিময় করা যায়। যেমন, (ক) হাফেয ইবনে হাজার (রহ.) বলেছেন, সাহাবায়ে কিরামগণ ঈদের দিন সাক্ষাৎকালে একে অপরকে বলতেন, ‘তাকাববালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকা’ অর্থ- আল্লাহতায়ালা আমাদের ও আপনার ভালো কাজগুলো কবুল করুন। (খ) ‘ঈদ মুবারক’ ইনশাআল্লাহ। (গ) ‘ঈদুকুম সাঈদ’ বলে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করা যায়।

ঈদের চাঁদ দেখার পর থেকে তাকবির পাঠ করা

তাকবির পাঠ করার মাধ্যমে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করা হয়। তাকবির হলো, আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার। লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ। আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার। ওয়া লিল্লাহিল হামদ। বাক্যটি উচ্চস্বরে পড়া। আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রা) থেকে বর্ণিত, ‘রসুলুল্লাহ (স) ঈদুল ফিতরের দিন ঘর থেকে বের হয়ে ঈদগাহে পৌঁছা পর্যন্ত তাকবির পাঠ করতেন।’ [মুসতাদরাক : ১১০৬] যখন সালাত শেষ হয়ে যেত তখন আর তাকবির পাঠ করতেন না। 

নতুন বা পরিচ্ছন্ন পোশাক পরিধান করা

আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (স) বলেছেন, ‘আল্লাহ রাববুল আলামিন তাঁর বান্দার উপর তাঁর প্রদত্ত নিয়ামতের প্রকাশ দেখতে পছন্দ করেন।’ [সহীহ আলজামে : ১৮৮৭] ইবনুল কায়্যিম (রহ.) বলেছেন, ‘নবী কারীম (স) দুই ঈদেই ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে সর্বোত্তম পোশাক পরিধান করতেন।’ [যাদুল মায়াদ]

খুতবা শ্রবণ করা

আব্দুল্লাহ বিন সায়েব (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি নবী কারীমের (স) সাথে ঈদ উদযাপন করলাম। যখন তিনি ঈদের সালাত শেষ করলেন, বললেন, আমরা এখন খুতবা দেব। যার ভালো লাগে সে যেন বসে আর যে চলে যেতে চায় সে যেতে পারে।’ [সুনান আবু দাউদ : ১১৫৭]

দোয়া ও ইস্তেগফার করা

ঈদের দিনে আল্লাহ তায়ালা অনেক বান্দাহকে মাফ করে দেন। মুয়ারিরক আলঈজলী (রহ.) বলেন, ঈদের এই দিনে আল্লাহ তায়ালা একদল লোককে এভাবে মাফ করে দেবেন, যেমনি তাদের মা তাদের নিষ্পাপ জন্ম দিয়েছিল। নবী কারীম (স) এরশাদ করেন, ‘তারা যেন এই দিনে মুসলিমদের জামায়াতে দোয়ায় অংশগ্রহণ করে।’ [লাতাইফুল মায়ারিফ]

মুসাফাহা ও মুআনাকা করা

মুসাফাহা ও মুআনাকা করার মাধ্যমে পারস্পরিক সম্পর্ক বৃদ্ধি হয়। আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, ‘একদা হাসান (রা) নবী কারীমের (স) কাছে আসলেন, তিনি তখন তাকে জড়িয়ে ধরলেন এবং কোলাকুলি করলেন।’  [শারহুস সুন্নাহ]

ফিতরাহ দেয়া

রমজান মাসে সিয়ামের ত্রুটি-বিচ্যুতি পূরণার্থে এবং অভাবগ্রস্তদের খাবার প্রদানের উদ্দেশ্যে ঈদের সালাতের পূর্বে নির্ধারিত পরিমাণের যে খাদ্য সামগ্রী দান করা হয়ে থাকে, শরিয়তের পরিভাষায় তাকেই যাকাতুল ফিত্র বা ফিতরাহ বলা হয়ে থাকে। হাদীসে বর্ণিত, ‘রসুল (স) ঈদের সালাতে যাওয়ার পূর্বে ফিতরাহ আদায় করার আদেশ দিলেন।’ [সহীহ বোখারী : ১৫০৩]

এতিম ও অভাবীকে খাবার খাওয়ানো

নবীজী (স) তখন মদিনাতে রাষ্ট্রপ্রধান। একবার ঈদের নামাজ শেষে তিনি ফিরে আসছেন। একটা ছোট্ট বাচ্চাকে দেখলেন মাঠের এককোণে বসে কাঁদছে। নবীজী (স) জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কাঁদছ কেন? ছেলেটি  বলল, আমার বাবা মারা গেছেন। মা-র আরেক জায়গায় বিয়ে হয়েছে, সেখানে আমার জন্যে কোনো জায়গা নাই। নবীজী বললেন, আমিও এতিম, আমারও বাবা ছিল না। তুমি আমার সাথে চলো। আয়েশা তোমার মা হবে, মানে ফাতেমা তোমার বোন হবে।  ছেলেটি তাকিয়ে যখন নবীজীকে (সা.) দেখল তখন তার কান্না বন্ধ হয়ে গেল। তিনি তাকে নিয়ে গেলেন। মা আয়েশাকে বললেন, একে গোসল করিয়ে জামাকাপড় দাও পরুক। নবীজী (স) তাকে নিজের বাড়িতেই লালন করতে লাগলেন। 

আবার যখন নবীজীর (স) ওফাত হলো ছেলেটির আবারও একই কান্না, আমি এখন কোথায় থাকব? হযরত আবুবকর শুনে তাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে গেলেন। যে এখন আমি তোমার অভিভাবক। আত্মীয়-স্বজনের ও পাড়া-প্রতিবেশীর খোঁজখবর নেয়া ঈদের সময় বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজনের খোঁজখবর নেয়া ও তাদের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার বিশেষ সুযোগ তৈরি হয়। এ সম্পর্কে রসুল (স) বলেছেন, ‘যে আখেরাতে বিশ্বাস করে, সে যেন আত্মীয়-স্বজনের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখে।’ [সহীহ বুখারি : ৬১৩৮] এ ছাড়াও, ঈদের সময় প্রতিবেশীর হক আদায়ের সুযোগ তৈরি হয়। নবীজী (স) ও তার সাহাবারা এই সুযোগটি নিতেন। 

মনোমালিন্য দূর করা

জীবন চলার পথে বিভিন্ন পর্যায়ে কারো কারো সম্পর্কের অবনতি হতে পারে। ঈদের সময় পারস্পরিক মনোমালিন্য দূর করা ও সম্পর্ক সুদৃঢ় করার উত্তম সময়। হাদীসে এসেছে, রসুলুল্লাহ (স) বলেছেন, ‘কোনো মুসলিমের জন্য বৈধ নয় যে তার ভাইকে তিন দিনের বেশি সময় সম্পর্ক ছিন্ন রাখবে। তাদের অবস্থা এমন যে দেখা সাক্ষাৎ হলে একজন অন্য জনকে এড়িয়ে চলে। এ দুজনের মাঝে ঐ ব্যক্তি শ্রেষ্ঠ যে প্রথম সালাম দেয়।’ [সহীহ মুসলিম : ৬৬৯৭]