পবিত্র শবে বরাত আজ, রাতে যেভাবে ইবাদত করবেন
আজ মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) পবিত্র শাবান মাসের ১৪ তারিখ। এই দিনের দিবাগত রাত মুসলমানদের কাছে পরিচিত শবে বরাত হিসেবে। হাদিসে এ রাতকে বলা হয়েছে ‘লাইলাতুন নিসফে মিন শাবান’ বা মধ্য শাবানের রজনী। ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের জন্য এটি ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ রাত।
মহান আল্লাহ তাআলা উম্মতে মুহাম্মদী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য ইবাদতের কিছু বিশেষ রাত নির্ধারণ করেছেন। এর মধ্যে পাঁচটি রাত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যার একটি হলো শবে বরাত বা মুক্তির রাত, যাকে নিসফে শাবানও বলা হয়।
এ রাতের ফজিলত সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যখন শাবানের মধ্য দিবস আসবে, তখন তোমরা রাতে নফল ইবাদত করবে এবং দিনে রোজা পালন করবে।’ (ইবনে মাজাহ)
বিখ্যাত সাহাবি হজরত মুয়াজ বিন জাবাল রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহ তায়ালা অর্ধ শাবানের রাতে, অর্থাৎ শাবানের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতে, তার সৃষ্টির দিকে রহমতের দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যতীত সবাইকে ক্ষমা করে দেন।’ (ইবনে হিব্বান, হাদিস: ৫৬৬৫)
এ রাতের ইবাদতের গুরুত্ব তুলে ধরে আরেক হাদিসে হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা বর্ণনা করেন, একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে নামাজে দাঁড়িয়ে এত দীর্ঘ সেজদা করেন যে, তার ধারণা হয়েছিল তিনি হয়তো মৃত্যুবরণ করেছেন। তিনি উঠে নবীজির বৃদ্ধাঙ্গুলি নাড়িয়ে দেখেন, তখন তা নড়ে ওঠে। সেজদা থেকে উঠে নামাজ শেষ করার পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেন, ‘হে আয়েশা, তোমার কি এ আশঙ্কা হয়েছে যে আল্লাহর রাসুল তোমার হক নষ্ট করবেন?’ উত্তরে তিনি বলেন, ‘না হে আল্লাহর রাসুল, আপনার দীর্ঘ সেজদা দেখে আমার এই আশঙ্কা হয়েছিল যে আপনি মৃত্যুবরণ করেছেন কি না।’
আরও পড়ুন: শবে বরাত উপলক্ষে ৬ আমল পালনের পরামর্শ দিলেন শায়খ আহমাদুল্লাহ
এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করেন, তিনি কি জানেন এটি কোন রাত। উত্তরে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই ভালো জানেন। তখন নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘এটি হলো অর্ধ শাবানের রাত (শবে বরাত)। এ রাতে আল্লাহ তায়ালা তার বান্দাদের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেন, ক্ষমাপ্রার্থনাকারীদের ক্ষমা করেন, অনুগ্রহপ্রার্থীদের অনুগ্রহ করেন এবং বিদ্বেষ পোষণকারীদের তাদের অবস্থাতেই ছেড়ে দেন।’ (শুআবুল ঈমান, বায়হাকি: ৩/৩৮২-৩৮৩; তাবারানি: ১৯৪)
শবে বরাতের রাতে নফল নামাজ আদায়ের ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম বা বিশেষ নিয়ত নেই। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিংবা সাহাবায়ে কেরাম কেউই এ রাতে আলাদা কোনো নিয়মে নফল নামাজ আদায় করেননি। অন্যান্য নফল নামাজের মতোই স্বাভাবিক নিয়মে ইবাদত করতে হবে। শবে বরাতের জন্য নির্দিষ্ট কোনো আমল বা নামাজ উদ্ভাবন করলে তা বিদআতের অন্তর্ভুক্ত হবে। এ রাতে মুসলমানরা নফল নামাজ আদায় করবেন, কোরআন তিলাওয়াত করবেন, জিকির করবেন এবং নামাজ শেষে আল্লাহ তায়ালার কাছে দোয়া করবেন।
শবে বরাতের রাতে নির্দিষ্ট কোনো দোয়া নেই। তবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত একটি দোয়া এ রাতে পড়া যেতে পারে। দোয়াটি হলো— আরবি: اللَّهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِي رَجَبٍ، وَشَعْبَانَ، وَبَلِّغْنَا رَمَضَانَউচ্চারণ: আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি রজবা ওয়া শাবান, ওয়া বাল্লিগনা রমাদান
অর্থ: হে আল্লাহ! রজব ও শাবান মাস আমাদের জন্য বরকতময় করুন এবং আমাদের রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দিন। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২৫৯)
শবে বরাতের রোজা সম্পর্কেও হাদিসে নির্দেশনা রয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যখন শাবানের মধ্য দিবস আসে, তখন তোমরা রাতে নফল ইবাদত করো এবং দিনে রোজা পালন করো।’ (ইবনে মাজাহ)
এছাড়া আরবি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ ‘আইয়ামে বিদ’-এর নফল রোজা সুন্নত। আদি পিতা হজরত আদম আলাইহিস সালাম এবং প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ রোজা পালন করতেন। সে হিসেবে শাবান মাসেও এই তিন দিন রোজা রাখা সুন্নত। হাদিস থেকে আরও জানা যায়, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজান মাস ছাড়া রজব ও শাবান মাসে বেশি বেশি নফল ইবাদত করতেন। শাবান মাসে তিনি কখনো ১০টি, কখনো ২০টি নফল রোজা রাখতেন বলেও হাদিসে বর্ণিত রয়েছে।
এ কারণে শবে বরাত ও শাবান মাসকে কেন্দ্র করে মুসলমানদের নফল ইবাদত, দোয়া ও আত্মশুদ্ধির প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।