নতুন করে আর কেউ গণরুম-গেস্টরুমের সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে পারবে না
ছাত্ররাজনীতির হালচাল, পরবর্তী ডাকসু নির্বাচন, হলে হলে গণরুম-গেস্টরুম সংস্কৃতির প্রত্যাবর্তনের শঙ্কাসহ ক্যাম্পাসের সমসাময়িক নানা ইস্যু নিয়ে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের সঙ্গে কথা বলেছেন ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) শাখার সেক্রেটারি কাজী আশিক—
ডাকসু নির্বাচন নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী? পরবর্তী ডাকসু নির্বাচন কবে হওয়া উচিত বলে মনে করেন?
কাজী আশিক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন শিক্ষার্থীদের অধিকার। প্রতিবছর এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আমরা যখন ডাকসু নির্বাচনে অংশ নিয়েছি, তখন বলেছি, পরবর্তী ডাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা আমাদের দায়িত্ব ছেড়ে দেব। আমরা দায়িত্বে থাকতে চাই না। কিন্তু প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো গড়িমসি করছে এবং ডাকসু নির্বাচন আয়োজনের উপযুক্ত পরিস্থিতি বজায় রাখছে না।
এ জন্য আমাদের দাবি, যেকোনো মূল্যে ডাকসু নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। প্রয়োজনে আমরা আন্দোলন করব, তবুও ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে। ডাকসু শিক্ষার্থীদের অধিকার। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক উন্নয়ন সাধিত হয়। শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের সবচেয়ে কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হলো ডাকসু। সুতরাং ডাকসু নির্বাচন হতেই হবে।
৫ আগস্টের পর ছাত্ররাজনীতিতে গুণগত কোনো পরিবর্তন এসেছে কি? এলে সেই পরিবর্তনগুলো কেমন?
কাজী আশিক: ছাত্ররাজনীতিতে অবশ্যই গুণগত পরিবর্তন এসেছে। বেশ কিছু পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, গণরুম-গেস্টরুমের সংস্কৃতি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়েছে। নতুন করে কেউ এই সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে পারবে না, এ বিষয়ে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
শিক্ষার্থীদের আবাসিক আসনকে কেন্দ্র করেই মূলত ছাত্ররাজনীতি কলুষিত হতো। এখন সেই সমস্যার সমাধান হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা প্রশাসনের মাধ্যমেই আসন পাচ্ছেন। এটি অবশ্যই একটি ইতিবাচক পরিবর্তন। শিক্ষার্থীরা এখন পড়াশোনার প্রতিও আগের তুলনায় বেশি আগ্রহী হচ্ছেন। সরকার দলীয়দের পূর্বে প্রচলিত নোংরা রাজনৈতিক চর্চা না রাজনীতির যে ধরন ছিল, তা এখন আর ক্যাম্পাসে প্রচলিত নেই।
৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে এই পরিবর্তনগুলো এসেছে। শিক্ষার্থীরা এখন নিজেদের অধিকার নিয়ে কথা বলার সাহস পাচ্ছেন। আগে তারা কারও বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পেতেন না। কিন্তু ৫ আগস্টের পর শিক্ষার্থীরা এই পরিবর্তন গ্রহণ করেছেন এবং তা চর্চা করছেন। এগুলো নিঃসন্দেহে বড় ধরনের পরিবর্তন।
হলগুলোতে গণরুম ও গেস্টরুম সংস্কৃতি ফিরে আসার যে আশঙ্কা ছিল, তা কতটা বাস্তব? এই সংস্কৃতি ঠেকাতে আপনারা কী ভূমিকা রাখছেন?
কাজী আশিক: পূর্বের এই সংস্কৃতি ফিরে আসতে দেওয়া হবে না, এ বিষয়ে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। আমরা কোনোভাবেই এটি ফিরে আসতে দেব না। যেকোনো মূল্যে ৫ আগস্টে এই সংস্কৃতির অবসান ঘটানো হয়েছে। এটিকে নতুন করে ফিরিয়ে আনার সুযোগ দেওয়া হবে না।
ডাকসু এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। যদিও ছাত্রদল বিভিন্ন জায়গায় এই সংস্কৃতি পুনরায় চালু করার চেষ্টা করেছে। পুরোনো ও কলুষিত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ফিরে যাওয়ার জন্য ছাত্রদল বারবার চেষ্টা করেছে। কিন্তু আমরা এ বিষয়ে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। অন্তত গণরুম-গেস্টরুমের মতো নেতিবাচক সংস্কৃতি ক্যাম্পাসে ফিরতে দেব না। এ বিষয়ে আমরা সর্বোচ্চ সচেষ্ট থাকব।
আবাসিক হলের আবাসন সংকট, খাবারের মান ও লাইব্রেরির পরিবেশে কোনো পরিবর্তন এসেছে কি? এসব সমস্যা সমাধানে ডাকসুর ভূমিকা কেমন ছিল?
কাজী আশিক: হলের আবাসনসংকট ও খাবারের মান দীর্ঘদিনের বড় সমস্যা। ডাকসুর পক্ষ থেকে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। বেশ কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তনও এসেছে। তবে সামগ্রিকভাবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে যেসব উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন ছিল, সে ক্ষেত্রে যথেষ্ট গাফিলতি দেখা গেছে। এ কারণে হয়তো প্রত্যাশা অনুযায়ী পরিবর্তন আসেনি। তবে আমরা চেষ্টা করেছি এবং কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছি।
প্রশাসন আন্তরিক হলে কিংবা এখনো আন্তরিকতার সঙ্গে উদ্যোগ নিলে এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা সম্ভব। তবে সব সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান করা বেশ কঠিন। ডাকসুর পক্ষ থেকে বিভিন্ন হলের খাবারের মান পরীক্ষা, তদারকি এবং ক্যান্টিনগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে।
একই সঙ্গে শিক্ষার্থীরা যেন নির্ধারিত আসনের ভিত্তিতে আবাসন পান, অর্থাৎ প্রশাসনের মাধ্যমেই আসন বরাদ্দ পান, তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। মাস্টার্স শেষ হওয়ার পরও অতিরিক্ত দুই-তিন বছর হলে থাকার যে পুরোনো সংস্কৃতি ছিল, তা যেন ফিরে না আসে এবং ছাত্রত্ব শেষ হওয়ার পর কেউ যেন হলে অবস্থান না করেন, সে বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ছাত্রশিবিরের নেতৃবৃন্দ মাস্টার্স শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হল ছেড়ে দিচ্ছেন। অন্যরাও যেন হল ছেড়ে দেন, সে বিষয়ে তাদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে এবং বিষয়টি নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।
৫ আগস্ট-পরবর্তী প্রশাসন ও বর্তমান প্রশাসনের মধ্যে বড় কোনো পার্থক্য দেখছেন কি? শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষায় বর্তমান প্রশাসনের ভূমিকা কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
কাজী আশিক: ৫ আগস্টের পর দায়িত্ব পালন করা প্রশাসন এবং বর্তমান প্রশাসনের মধ্যে অবশ্যই অনেক পার্থক্য রয়েছে। প্রথমত, ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে, অর্থাৎ বর্তমান প্রশাসনের আগে দায়িত্বে থাকা প্রশাসন মোটামুটি আন্তরিক ছিল। তারা হয়তো শতভাগ কাজ করতে পারেনি, তবে শিক্ষার্থীদের জন্য কিছু করার আন্তরিকতা ছিল এবং তারা চেষ্টা করেছে।
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বর্তমান প্রশাসনকে সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করতে দেখি। তারা স্পষ্টভাবে শিক্ষার্থীদের পক্ষে অবস্থান না নিয়ে সরকারের পক্ষে অবস্থান নেয়। ডাকসুর কার্যক্রমে সামগ্রিকভাবে অসহযোগিতা করেছে। আগের প্রশাসনের সময়ে, অর্থাৎ ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে ও ডাকসু নির্বাচনের আগে, বেশ কিছু প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেসব প্রকল্প আটকে দেওয়া হয়েছে। এরকম আরও বেশ কিছু প্রকল্প রয়েছে।
এ ছাড়া ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে হামলার ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু প্রশাসন এসব ঘটনার বিচার নিশ্চিত করতে পারেনি। দুই প্রশাসনের মধ্যে অবশ্যই পার্থক্য রয়েছে। বর্তমান প্রশাসন শিক্ষার্থীদের অধিকারের বিষয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ নয়। শিক্ষার্থীদের অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে তাদের মনোযোগ নেই। তাদের প্রধান মনোযোগ দলীয় অবস্থান টিকিয়ে রাখা এবং সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করা। আমরা এমন চিত্রই দেখতে পেয়েছি।
সামগ্রিকভাবে বলতে চাই, দিন শেষে প্রশাসন সব সময় শিক্ষার্থীদের পক্ষে থাকবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত প্রশাসন সেই ভূমিকা পালন না করে সরকারি বাহিনীর সম্প্রসারিত অংশ হিসেবে কাজ করছে। তারা ছাত্রদলকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে।
স্যার এ এফ রহমান হল ও ফজলুল হক মুসলিম হলের প্রভোস্টের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থী নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। নির্যাতনের প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি; বরং উল্টো তাকে সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে আমরা মনে করি। এ ধরনের কার্যক্রম চলতে থাকলে শিক্ষার্থীদের অধিকার নিশ্চিত করা কখনোই সম্ভব হবে না। একইভাবে ক্যাম্পাসে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করাও সম্ভব হবে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মব কালচার বন্ধ হয়েছে কি? এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে প্রশাসনের ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত বলে মনে করেন?
কাজী আশিক: প্রকৃতপক্ষে, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এ ধরনের মব কালচার কখনোই সেভাবে ছিল না। বরং কিছু ক্ষেত্রে আন্দোলনগুলোকে মব হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে প্রকৃত মবের ঘটনাগুলো প্রশাসন নিরপেক্ষভাবে মোকাবিলা করেনি।
উদাহরণস্বরূপ, শাহবাগে কয়েকশ শিক্ষার্থী ও অন্যান্য ব্যক্তিকে নিয়ে একটি দল সাংবাদিকদের এবং ডাকসুর প্রতিনিধিদের ওপর হামলা করেছে। ওই ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন আজ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি। আমাদের অভিযোগ, এক্ষেত্রে প্রশাসন অসহযোগিতা করেছে।
মূলত এ ধরনের ঘটনাগুলোই মবের উদাহরণ। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে প্রশাসন সহযোগিতা করেনি। অন্যদিকে, ছোটখাটো যেসব ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে আমরা মনে করি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকৃতপক্ষে সে ধরনের মব কালচারের অস্তিত্ব নেই। মব কালচার হিসেবে যেসব ঘটনার কথা বলা হয়, সেগুলোকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এবং এ নিয়ে বিভিন্নভাবে অপপ্রচার চালানো হয়েছে বলে আমরা মনে করি।
আমরা বিশ্বাস করি, যেসব হামলা ও মবের ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর বিচার নিশ্চিত করা গেলে ক্যাম্পাসে নতুন করে এ ধরনের ঘটনা ঘটার আশঙ্কা কমবে। এটাই আমাদের প্রত্যাশা।