মাদ্রাসা থেকে ঢাবিতে—প্রয়াত মায়ের স্বপ্ন পূরণে প্রথমবারেই বিচারক রুহানি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ফজলে রুহানি। প্রথমবার পরীক্ষায় অংশ নিয়েই বাজিমাত করেছেন ১৮তম জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের সিভিল জজ পদের নিয়োগ পরীক্ষায়। স্নাতক শেষেই হয়েছেন সিভিল জজ। একাডেমিক পড়াশোনাকেই বিজেএস প্রস্ততির মূল ভিত্তি হিসেবে নিয়েছিলেন তিনি। আইনি বিষয় নিয়ে করেছেন বিভিন্ন গবেষণা এবং লেখালেখিও। বিজেএস প্রস্ততি, পড়াশোনা ও শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তার পরামর্শ তুলে ধরেছেন আরিফ বিল্লাহ-
দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস: ১৮তম জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনে উত্তীর্ণ হওয়ায় আপনাকে অভিনন্দন। আপনার শৈশব ও পড়াশোনার দীর্ঘ যাত্রা সম্পর্কে জানতে চাই।
রুহানি: আমার পড়াশোনার শুরুটা মাদ্রাসায়। কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদীর ঝিরারপাড় দারুল উলুম দাখিল মাদ্রাসা দাখিল এবং ঢাকার একটি স্বনামধন্য মাদ্রাসা থেকে ২০২০ সালে আলিম (এইচএসসি) সম্পন্ন করি। পরে ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হই। সেখান থেকে এলএলবি অনার্স সম্পন্ন করে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে এলএলএম অধ্যয়নরত আছি।
দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস: প্রথম বিজেএসেই উত্তীর্ণ হওয়ার গল্প জানতে চাই। অনুপ্রেরণা কী
ছিল?
রুহানি: বিজেএসে প্রথমবারেই সফল হওয়াটা আনন্দের ও একই সঙ্গে দায়িত্বেরও বিষয়। এর পেছনে দীর্ঘদিনের পড়াশোনা, ধৈর্য, পরিবারের ত্যাগ এবং শিক্ষকদের দিকনির্দেশনা রয়েছে। বিশেষ করে আমার প্রয়াত মায়ের কথা খুব মনে পড়েছে। মা পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখতেন, আইন পড়ার ব্যাপারে উৎসাহ দিতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও একাডেমিক জ্ঞানের পাশাপাশি গভীরভাবে চিন্তা করতে শিখিয়েছেন। বিশেষভাবে বিভাগের শিক্ষক সাইমী ওয়াদুদ ম্যামের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। তাই এই সাফল্যকে আমি পরিবার, শিক্ষক ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রতি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে দেখি।
দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস: বিজেএসের পড়াশোনা কখন থেকে শুরু করেছিলেন? কীভাবে প্রস্তুতি নিয়েছেন?
রুহানি: আইনে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই বিচার বিভাগ সম্পর্কে আগ্রহ তৈরি হয়। মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব বিচারক হওয়ার প্রতি বেশি আকৃষ্ট করেছে। আমার প্রস্তুতি মূলত একাডেমিক পড়াশোনাকেন্দ্রিক ছিল। একাডেমিক পড়াশোনার মাধ্যমে আইন ও মৌলিক বিষয়গুলোর ভিত্তি শক্ত করার চেষ্টা করেছি। চতুর্থ বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা শেষে বিজেএসের সিলেবাস বিশ্লেষণ করে বিষয়ভিত্তিক প্রস্তুতি শুরু করি। আইন বিষয়ে মূল আইন, গুরুত্বপূর্ণ ধারা, মামলার সিদ্ধান্ত এবং প্রয়োগভিত্তিক বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়েছি। বিজ্ঞান ও গণিতে আমি তুলনামূলকভাবে দুর্বল ছিলাম। তাই প্রিলিমিনারি পরীক্ষার পর এসব বিষয়ে বেশি সময় দিয়েছি।
দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস: অ্যাকাডেমিক পড়াশোনার সঙ্গে জুডিশিয়ারির প্রস্তুতি কীভাবে সামলে নিয়েছেন?
রুহানি: আমি দুটিকে আলাদা করে দেখিনি। বরং একাডেমিক পড়াশোনাকেই বিজেএস প্রস্তুতির ভিত্তি হিসেবে নিয়েছি। আইন বিভাগের একাডেমিক পড়াশোনায় বিজেএসের প্রয়োজনীয় অনেক আইন ও বিষয় কাভার হয়ে যায়, ফলে আলাদাভাবে অনেক কিছু শুরু থেকে পড়তে হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস, পরীক্ষা ও অন্যান্য একাডেমিক কাজের পাশাপাশি নিয়মিত পড়ার চেষ্টা করেছি। অল্প অল্প করে ধারাবাহিকভাবে পড়ার অভ্যাসটি অনেক কাজে দিয়েছে।
দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস: বিজেএস প্রস্তুতিতে প্রতিদিন কত সময় পড়াশোনা করেছেন?
রুহানি: প্রতিদিন নির্দিষ্ট সংখ্যক ঘণ্টা পড়তেই হবে, এমন কোনো নির্দিষ্ট রুটিন অনুসরণ করিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস ও একাডেমিক কাজের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সময় বের করেছি। আমার কাছে নির্দিষ্ট সময়ের চেয়ে ধারাবাহিকতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। নিয়মিত পড়াশোনা করার চেষ্টা করেছি এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী সময়ের ব্যবহার করেছি।
দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস: আপনার প্রিলিমিনারি প্রস্তুতি কেমন ছিল?
রুহানি: প্রিলিমিনারির ক্ষেত্রে প্রথমে পুরো সিলেবাস সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা তৈরি করেছি এবং বিগত বছরের প্রশ্ন বিশ্লেষণ করেছি। আমার প্রস্তুতি মূলত আইনকেন্দ্রিক ছিল। নিজের দুর্বল জায়গাগুলো চিহ্নিত করে সেখানে বেশি সময় দিয়েছি। শুধু বেশি পড়ার পরিবর্তে কোন বিষয় কতটা পড়তে হবে এবং পরীক্ষায় কীভাবে প্রয়োগ করতে হবে, সেটিকে গুরুত্ব দিয়েছি।
দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস: আপনার রিটেন প্রস্তুতি কেমন ছিল?
রুহানি: রিটেনের প্রস্তুতি তুলনামূলকভাবে গভীর ছিল। আইন বিষয়ে শুধু ধারা মুখস্থ না করে সংশ্লিষ্ট আইন, গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা, কেইস ল এবং প্রয়োগের বিষয়গুলো বোঝার চেষ্টা করেছি। কীভাবে উত্তর শুরু করব, কোথায় হেডিং ব্যবহার করব, কোথায় স্টাটিউটরি প্রভিশন বা কেইস ল দেব এবং কীভাবে উপসংহারে যাব, এসব বিষয়ে সচেতন ছিলাম। আমার কাছে রিটেনে জ্ঞানের পাশাপাশি প্রেজেন্টেশন, টাইম ম্যানেজমেন্ট এবং প্রশ্নের চাহিদা অনুযায়ী প্রাসঙ্গিক উত্তর দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। কত পৃষ্ঠা লিখলাম তার চেয়ে উত্তর কতটা সঙ্গতিপূর্ণ ও মানসম্মত হলো, সেটিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছি।
দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস: ভাইভার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল? আপনি কীভাবে ভাইবার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন?
রুহানি: ১৮তম জুডিশিয়াল সার্ভিস পরীক্ষাই ছিল আমার প্রথম বিজেএস। প্রথমবারেই সিভিল জজ হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছি। বোর্ডের সামনে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করেছি এবং প্রশ্নগুলোর উত্তর যতটা সম্ভব পরিষ্কার ও সংক্ষিপ্তভাবে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। ভাইবার জন্য একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড, আইন, সংবিধান, সমসাময়িক বিষয় এবং নিজের সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি কীভাবে উত্তর দিচ্ছি, কতটা সংযতভাবে কথা বলছি এবং কোনো প্রশ্নের উত্তর না জানলে সেটি কীভাবে স্বীকার করছি, সেদিকেও সচেতন থাকা উচিত।
দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস: যারা বিচারক হতে চান, সেই শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে আপনির্ কী পরামশ দিবেন?
রুহানি: প্রথমত, নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে এবং ধৈর্য ধরে এগিয়ে যেতে হবে। বিজেএসের প্রস্তুতি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। অনেক বই পড়ার চেয়ে একটি বিষয় ভালোভাবে বোঝা, নিয়মিত রিভিশন করা এবং প্রশ্ন অনুশীলন করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সিলেবাস বুঝে পড়া ও ধারাবাহিকতা ধরে রাখা। একাডেমিক পড়াশোনাকে অবহেলা না করে সেটিকেই বিজেএস প্রস্তুতির ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা উচিত। একই সঙ্গে আইন ও সাধারণ উভয় অংশকেই শুরু থেকেই সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। প্রস্তুতির শুরু থেকেই সাধারণ অংশকে আইন বিষয়ের মতোই গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস: বিচারক হিসেবে দেশের জন্য আপনি কী অবদান রাখতে চান?
রুহানি: বিচারক হিসেবে আমার প্রথম দায়িত্ব হবে সংবিধান ও আইনের প্রতি অনুগত থেকে নিরপেক্ষ ও ন্যায়সংগতভাবে দায়িত্ব পালন করা। আমি চাই, আদালতে আসা প্রত্যেক মানুষ অন্তত এই অনুভূতি নিয়ে বের হন যে, তাঁর কথা একজন বিচারক মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন এবং আইন অনুযায়ী ন্যায়বিচার দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। সততা, নিরপেক্ষতা, ধৈর্য, জ্ঞান, মানবিকতা ও জবাবদিহিতা ধারণ করে দায়িত্ব পালন করতে চাই। আমার কাছে বিচারকের পদটি আমানত ও বড় দায়িত্ব। আল্লাহ যেন আমাকে সেই দায়িত্ব সততা ও ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে পালন করার তাওফিক দেন।