২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০:১১

পরিবেশ-পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে চাকসু নির্বাচন আয়োজন করব

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল্-ফোরকান  © টিডিসি সম্পাদিত ছবি

৩৫ বছর পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরেছে চাকসু। এক বছরের পথচলায় কী বদলেছে, কতটা পূরণ হয়েছে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা? চাকসুর মেয়াদ শেষের পথে, তবে সামনে কি নিয়মিত নির্বাচনের ধারাবাহিকতা তৈরি হবে? আবাসন ও যাতায়াত সংকটসহ শিক্ষার্থীদের নানা প্রত্যাশা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভাবনা-ই বা কী? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল্-ফোরকান মুখোমুখি হয়েছেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের সঙ্গে।

তিনি কথা বলেছেন চাকসুর ভবিষ্যৎ, নির্বাচন, বাজেট, আবাসন, যাতায়াত এবং প্রশাসন-চাকসুর সম্পর্ক নিয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি আব্দুল্লাহ আল নাঈম।

প্রথমেই চাকসুর নিয়ে কথা বলতে চাই। চাকসুর মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে। সামনের চাকসু নির্বাচন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কী ভাবছে? নির্বাচন নিয়ে তাদের কোনো লিখিত রোডম্যাপ বা পরিকল্পনা কি?

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল্-ফোরকান: দীর্ঘ ৩৫ বছর পর চাকসু নির্বাচন হয়েছে। আমাদের যেমন এ বিষয়ে নতুন অভিজ্ঞতা ছিল, তেমনি ছাত্র-ছাত্রীদেরও নতুনভাবে পথচলার প্রত্যাশা ছিল। যারা নির্বাচিত হয়েছে, তাদের কাজ নিয়েও প্রত্যাশা ছিল। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমিত সম্পদের মধ্যেও যতটুকু সম্ভব চাকসুকে গতিশীল করতে এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিরা যাতে কাজ করে যেতে পারে, সে জন্য আমরা সর্বোচ্চ সহযোগিতা করেছি। 

চাকসুর মেয়াদ শেষ হতে আর ২০ থেকে ২৫ দিনের মতো বাকি। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর চাকসুকে কখনোই আমার বা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ভাবিনি। আমরা সবসময় চাকসুকে সহযোগী হিসেবে দেখেছি। আমার একটাই কথা, চাকসু আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং প্রশাসনের সহযোগী। পরবর্তী চাকসু নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যদি পরিবেশ-পরিস্থিতি সবকিছু ঠিক থাকে, তাহলে আমরা চাকসু নির্বাচন আয়োজনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

পরিকল্পনা থাকলে সেটি কবে নাগাদ শিক্ষার্থীদের সামনে প্রকাশ করা হবে?
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল্-ফোরকান: এখন আমাদের সবার একটি দাবি হচ্ছে চাকসু নির্বাচন আয়োজন করা। আগামী ১৮ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় দিবস পালন এবং চাকসু নির্বাচন আয়োজনের মধ্যে কোনো ধরনের কনফ্লিক্ট নেই। যতটুকু জানি, চাকসুর মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও আরও তিন মাস অফিসিয়াল সময় থাকে। চাকসুর বর্তমান মেয়াদ শেষ হবে ২৩ অক্টোবর। এর মাত্র ২৫ দিন পর, ১৮ নভেম্বর, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হীরকজয়ন্তী অনুষ্ঠিত হবে। সুতরাং মেয়াদ শেষ হওয়া থেকে ৩ মাস পূরণ হতে আরো সময় বাকি।

ইনশাআল্লাহ, পরিবেশ-পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে আমরা চাকসু নির্বাচন আয়োজন করব। সপ্তম কেবিনেট শেষ হওয়ার তিন মাস পরেও যদি চাকসু নির্বাচন হয়। তবু এই নির্বাচন নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। আর সবচেয়ে বড় কথা এ বিষয়ে আমরা আলোচনা সভায় বসব। এরপর আলোচনার ভিত্তিতে অফিসিয়াল সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে এবং শিক্ষার্থীদের তা জানানো হবে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটে চাকসু নির্বাচনের জন্য কোনো বরাদ্দ রাখা হয়েছে কি?
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল্-ফোরকান: চাকসু নির্বাচনের জন্য সুনির্দিষ্টভাবে ইউজিসি থেকে কোনো বরাদ্দ নেই। তবে প্রয়োজন হলে আমরা বিভিন্ন খাত ও উপখাত থেকে এর ব্যয় মেটানোর ব্যবস্থা করব। যেহেতু গত ৩৫ বছর চাকসু নির্বাচন হয়নি, তাই এ ধরনের বাজেট, খাত বা উপখাত তৈরির বিষয়টিও আগে কেউ ভাবেনি। এখন সামনে যে অর্থবছর আসছে, সেখানে আমরা এ বিষয়ে প্রস্তাব দেব। এরপর চাকসু নির্বাচন সফলভাবে আয়োজনের জন্য কীভাবে প্রয়োজনীয় অর্থের ব্যবস্থা করা যায়, সে অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডারে চাকসু নির্বাচনকে স্থায়ীভাবে অন্তর্ভুক্ত করার কোনো পরিকল্পনা প্রশাসনের রয়েছে কি না?
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল্-ফোরকান: অনেক বছর পর চাকসু নির্বাচন হয়েছে। আমরা যারা নতুন প্রশাসনে এসেছি, আমরাও চাকসু ভোট দিয়েছি কি-না মনে পড়ে না। তাই এটি আমাদের জন্যও একটি নতুন বিষয়। তবে চাকসু নির্বাচন রেগুলার বেসিসে হওয়া প্রয়োজন। চাকসুকে শুধু নির্বাচন হিসেবেই দেখা হয়, কিন্তু এর বাইরে অনেক আর্থিক খরচের সংশ্লিষ্টটা এবং প্রশাসনিক বিষয় জড়িত। সবকিছু বিবেচনা করে কীভাবে এবং কখন এটিকে অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডারে অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তা নিয়ে প্রশাসনিক পর্যায়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

নিয়মিত চাকসু নির্বাচন আয়োজন নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে বিশাল প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সেটিকে কীভাবে মূল্যায়ন করছে?
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল্-ফোরকান: হ্যাঁ, আমরা বিষয়টি সেভাবেই দেখছি। দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজের অংশ হিসেবে প্রতিবছর চাকসু নির্বাচন আয়োজনের বিষয়টি শিডিউলভুক্ত করা যায় কি না, অর্থাৎ প্রতিবছর চাকসু নির্বাচন হবে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত প্রশাসনিকভাবে আলোচনা করে নেওয়া হবে। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো পরিবেশ-পরিস্থিতি। অনেক সময় পরিবেশ-পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকলে নিয়মিত বা রুটিন কাজও সঠিকভাবে করা সম্ভব হয় না। তাই আমার মনে হয়, সময় ও পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়াই বেটার হবে। এতে নির্বাচন আয়োজনের সফলতা আরও ভালো হবে।

চাকসুর মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে। তবে শিক্ষার্থীরা বলছে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় দুই সমস্যা যাতায়াত ও আবাসন এখনও সমাধান হয়নি। এ বিষয়ে আপনি কী বলবেন?
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল্-ফোরকান: আবাসন একটি চলমান প্রক্রিয়া। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, গত নয় বছর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সমস্যা সমাধানের জন্য কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি এবং ডিপিপির খাত থেকেও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি টাকাও আসেনি। এদিকে শিক্ষার্থী, বিভাগ, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সংখ্যা বেড়েছে। ফলে সবার জন্যই আবাসন একটি বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছি এবং যত দ্রুত সম্ভব সমাধানের চেষ্টা করছি। তবে আমি চাইলেই আগামী সপ্তাহে বা আগামী ছয় মাসের মধ্যে এর সমাধান করতে পারব, বিষয়টি এমন নয়। 

এ জন্য একটি দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এ বিষয়ে গত ২৭ সেপ্টেম্বর সকালে আমরা ডিপিপি প্রস্তুতকারকদের সঙ্গে বসেছি। যাতে যত দ্রুত সম্ভব জরুরি ভিত্তিতে আরও দু-একটি ডিপিপি ইউজিসির প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা যায় কী-না। তাহলে আমরা একটির পর একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাব।

আরেকটি বিষয় হচ্ছে যাতায়াত। ক্যাম্পাসের ব্যস্ত সময়ে, বিশেষ করে সকাল ও দুপুরের সময়টায়, আরও একটি শাটল ট্রেন চালুর বিষয়ে আলোচনা চলছে। ইতোমধ্যে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। শাটলের বগির সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি স্টেশনের জায়গাও বর্ধিতকরণ করতে হবে। বর্তমানে ১১টির বেশি বগি স্টেশনে ধারণ করা সম্ভব হয় না, ফলে বগি স্টেশনের বাইরে চলে যায়। ইনশাআল্লাহ, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ আমাদের আশ্বস্ত করেছে যে খুব দ্রুত স্টেশন পুনঃসংস্কারের কাজ শুরু করবে। আমরা যদি ১১টির পরিবর্তে ১৬টি বগি যুক্ত করতে পারি, তাহলে এটি আমাদের জন্য একটি বড় ধরনের কাজ হবে।

শিক্ষার্থীদের মধ্যে চাকসুর বর্তমান মেয়াদে বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে পূর্ণ সন্তুষ্টি না থাকলেও একটি ইতিবাচক আলোচনা রয়েছে। চাকসু সভাপতি হিসেবে আপনাকে শিক্ষার্থীবান্ধব বলছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা, এ বিষয়টিকে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন? 
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল্-ফোরকান: আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর চাকসুকে প্রথম যে বার্তাটি দিয়েছি, তা হলো, ‘আমি তোমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী নই, আমি তোমাদের সহযোগী।’ চাকসুও আমার সঙ্গে সহযোগিতাপূর্ণ হাত বাড়িয়েছে। ফলে আমরা চাকসুকে চাকসু হিসেবেই দেখেছি এবং সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচনা করেছি। চাকসু যে কাজগুলো করেছে, সেগুলো বাস্তবায়নে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমিত সম্পদের মধ্যে আমার পক্ষ থেকে এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে যতটুকু সম্ভব, সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হয়েছে।

ভবিষ্যতেও আরও অনেক কাজ রয়েছে, যেগুলো এখনো দৃশ্যমান হয়নি। কিছু প্রতিশ্রুতিবদ্ধ কাজও রয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো দৃশ্যমান হবে এবং এর উপকারভোগী হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরাই।

আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। 
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল্-ফোরকান: আপনাকেও ধন্যবাদ।