২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯:৫৯

পরামর্শ নিতে গিয়ে জজের সঙ্গে প্রেম, তারপর বিয়ে, জজ হলেন চৈতি নিজেও

উদাস গোস্বামী ও চৈতি বিশ্বাস  © টিডিসি সম্পাদিত

একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে একই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ, আপনাদের এই পথচলার গল্পটা কীভাবে শুরু?
উদাস গোস্বামী: ক্যাম্পাসে পড়ার সময় পরিচয় ছিল না। কারণ আমি ওর ৪ ব্যাচ সিনিয়র। আমি জজ হয়ে যাওয়ার পর অনেকেই পরামর্শের জন্য নক করে। আমার স্ত্রীও তাদের একজন ছিল। এভাবেই পরিচয়। ভার্সিটির একটা প্রোগ্রামে প্রথম দেখা। প্রথমবার দেখা হওয়ার পর আমি এতটাই মুগ্ধ হয়ে যাই আর ভালো লেগে যায় যে, তখনই ঠিক করে ফেলি যে বিয়ে যদি করতেই হয় তো তাকেই করব। তখন আমার থেকে একটু দূরে ছিল বন্ধুবর জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নাইম। ওকে বলি বন্ধু বিয়ে করব আর এই মেয়েকেই বিয়ে করব। এটাই প্রথম দেখা। এরপর পারিবারিক আলোচনায় বিয়ে।

কে কাকে বেশি অনুপ্রেরণা দিয়েছেন?
উদাস গোস্বামী: আমি চেষ্টা  করেছি তাকে অনুপ্রাণিত করতে। আমি সবসময় বলতাম কোনো কাজ করতে হবে না বাড়ির। সে যেন শুধু পড়ে। সে যেন পড়াশোনা করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, সে রকম পরিবেশ তাকে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। শুরু থেকেই আমার বিশ্বাস ছিল সে পারবে। আমার কাছে সবসময় মনে হয়েছে একটা মেধাবী স্টুডেন্টের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক রান্না করানো বা ঘরের কাজ করানো মেধার অপচয়। আমি সবসময় চেয়েছি আমার বউ তার যোগ্যতা অনুযায়ী অবস্থানে পৌঁছে যাক।

একজনের সাফল্যের পর অন্যজনের সাফল্য দুটিকে মিলিয়ে সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত কোনটি?
উদাস গোস্বামী: সব থেকে স্মরণীয় মুহূর্ত হল রেজাল্ট শোনার পর পরিবারের, আত্মীয়-স্বজনের ও আমার এলাকার মানুষদের উচ্ছ্বাস। পেশাগত কারণে আমি পঞ্চগড়ে অবস্থান করি। আমার গ্রামের বাড়ি রংপুরে। এই খবর পাওয়ার পর গ্রামের মানুষজন নিজেরাই মিষ্টি কিনে এলাকায় সবাইকে মিষ্টিমুখ করিয়েছে।

উদাস গোস্বামী ও  চৈতি বিশ্বাস

স্ত্রী চৈতি বিজেএসে উত্তীর্ণ হওয়ার খবর শুনে আপনার প্রথম প্রতিক্রিয়া কী ছিল?
উদাস গোস্বামী: প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল কিছুক্ষণের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। এরপর যখন সম্বিত ফিরে পাই, তখন দেখি চোখের কোনায় জল। একটা মিটিংয়ে ছিলাম মাননীয় জেলা জজ স্যারের সাথে। পরে স্যারের কানে কানে সংবাদটা জানাই। স্যার শুনে অনেক খুশি হয়েছেন শোনার পর। নিজে মিষ্টি মুখ করানোর জন্য আমাদের ইনভাইট করেছেন।

আপনি নিজে আগে একই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। চৈতির প্রস্তুতির সময় নিজের অভিজ্ঞতা কীভাবে তার সঙ্গে ভাগ করেছেন?
উদাস গোস্বামী: কিভাবে সমস্ত বিষয় গুছিয়ে পড়া যায় শিখাতাম, লিখার প্যাটার্ন নিয়ে প্রচুর আলোচনা করতাম। কোন প্রকার প্রশ্ন তার মনে আসলে বা প্রবলেম দেখা দিলে সেগুলো নোট করে রাখত। পরে সেগুলো আমি সমাধান করে দিতাম। আমি নিজে না পারলে আমার কলিগদের দিয়ে সমাধান করিয়ে নিতাম।

সে যেন পড়াশোনা করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, সে রকম পরিবেশ তাকে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। শুরু থেকেই আমার বিশ্বাস ছিল সে পারবে। আমার কাছে সবসময় মনে হয়েছে একটা মেধাবী স্টুডেন্টের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক রান্না করানো বা ঘরের কাজ করানো মেধার অপচয়। আমি সবসময় চেয়েছি আমার বউ তার যোগ্যতা অনুযায়ী অবস্থানে পৌঁছে যাক।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, ‘ঘুম থেকে উঠেই একজন জজ দেখার সৌভাগ্য হবে’— এই কথাটির পেছনের অনুভূতিটা কী?
উদাস গোস্বামী: আমি যেহেতু গ্রামে বড় হয়েছি সেহেতু সত্যায়িত করার জন্য আশেপাশে কাউকে খুঁজে পেতাম না। একবার কাগজপত্র সত্যায়িত করার জন্য গিয়েছিলাম রংপুর কোর্টে। সেখানে একজন জজ স্যারের কাছে আমি কাগজপত্র সত্যায়িত করে নেই। বিচারকরা সামাজিকভাবে কতটা সম্মানিত সেদিন বুঝতে পারি। একজন বিচারককে সামনে থেকে দেখেছি কথা বলেছি এই অনুভূতিটা অসাধারণ ছিল।একজন জজের সাথে কথা বলেছি সে গল্পও মানুষকে শোনাতাম। নিজে কখনো বিচারক হব বা আমার স্ত্রী কখনো বিচারক হবে এটা তো তখন কল্পনাই করিনি। সেই অনুভূতি থেকেই ঘুম থেকে উঠে জজ দেখার কথা মাথায় আসে।

আপনি নিজে আগে একই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। চৈতির প্রস্তুতির সময় নিজের অভিজ্ঞতা কীভাবে তার সঙ্গে ভাগ করেছেন?
উদাস গোস্বামী: চৈতীর প্রস্তুতির সব থেকে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তার ধৈর্য ও একাগ্রতা। একটা মানুষ কতটা ধারাবাহিক হতে পারে আমার স্ত্রী কে না দেখলে বুঝতে পারতাম না। আমি নিজে খুব বেশি ধারাবাহিক ছিলাম না বা রুটিন মেইনটেইন করতাম না কিন্তু আমার স্ত্রী অনেক বেশি রুটিন মাফিক পড়াশোনা করতো। প্রতিটি বিষয়ে গোছালো ছিল।

স্বামী-স্ত্রী দুজনের একই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার বিষয়টি আপনাদের পরিবার কীভাবে নিয়েছে?
উদাস গোস্বামী: আমার বাবা অনেক বেশি বৌমা ভক্ত ছিলেন। দিনের অনেকটা সময়ই সাথে নিয়ে গল্প করতেন। বাবা মাসখানেক আগে পরলোকগমন করেন। মারা যাওয়ার আগের দিনেও বাবা গল্প করছিলেন আমার বউমা এবার জজ হবেই। বাবার কথা মনে করে আমরা সবাই ইমোশনাল হয়ে গেছি।

বিয়ে পরবর্তী ফটোশ্যুটে উদাস-চৈতি দম্পতি

চৈতির সাফল্যে আপনার নিজের বিজেএসের দিনগুলোর কথা কি মনে পড়ছে?
উদাস গোস্বামী: আমার নিজের বিজেএস প্রস্তুতির দিনগুলোর কথা মনে পড়লে বলতে হয় আমি যেদিন বিজিএস ভাইভা দেই তখন আমি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ছিলাম। ভাইবার দিন প্লাটিলেট কাউন্ট ছিল ২৬০০০। একেবারে বর্ডার লাইন। এই অবস্থাতেই মেডিকেল থেকে ভাইবা অ্যাটেন্ড করে আবার মেডিকেলে যাই। সুস্থ না হতেই রেজাল্ট পেয়ে যাই। রেজাল্ট নিয়ে এজন্য খুব বেশি টেনশন হয়নি। জীবন যেখানে বাঁচেনা সেখানে জজ হলাম কিনা হলাম তাতে কিবা যায় আসে!

আপনাদের দুজনের পড়াশোনার ধরন কেমন ছিল? এ ক্ষেত্রে আপনাদের মধ্যে কী ধরনের পার্থক্য ছিল?
উদাস গোস্বামী: আমার স্ত্রী ও আমি দুইজন দুই মেরুর স্টুডেন্ট। আমি পরীক্ষার আগের রাতে পড়া স্টুডেন্ট আর চৈতি সবসময়ই ধারাবাহিকভাবে পড়া স্টুডেন্ট। পড়াশোনার ধরণে দুজনের কোন মিল নাই। ডিপার্টমেন্টের রেজাল্ট এর ক্ষেত্রেও আমার সিরিয়াল একদম শেষে দিকে আর আমার বউ প্রথম দিকে। আমি সারারাত পড়তাম আর সারাদিন ঘুমাতাম অপরদিকে আমার বউ রুটিন মাফিক ভদ্র ছাত্রীর মতো পড়তো।

একই পেশায় থাকায় ভবিষ্যতে দুজনের মধ্যে পেশাগত আলোচনা বা অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ কীভাবে দেখছেন?
উদাস গোস্বামী: পেশাগত জীবনে কিছু ইফেক্ট ফেলবে যেমন আইনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ থাকবে যেটা আমাদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে সহায়ক হবে। কিন্তু একটা বড় সমস্যা হবে সেটা হল বাড়ির মধ্যেও কোর্টের বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে যেটা সংসার জীবনে  প্রভাব ফেলতে পারে। অবশ্য এক্ষেত্রে একে অপরের মধ্যে বোঝাপড়া আরও ভালোও হতে পারে।

চৈতির এই সাফল্যের পেছনে তার সবচেয়ে বড় শক্তি কী বলে মনে করেন?
উদাস গোস্বামী: চৈতীর এই সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় শক্তি তার মনোবল এবং হার না মানার দৃঢ় মানসিকতা।

নতুন বিজেএস প্রার্থীদের উদ্দেশে আপনার পরামর্শ কী?
উদাস গোস্বামী: নতুন বিজেএস প্রার্থীদের উদ্দেশ্যে আমার পরামর্শ হলো লেগে থাকতে হবে। লক্ষ্য স্থির রেখে লেগে থাকতে হবে এবং সেই অনুযায়ী পরিশ্রম করতে হবে। সফলতা আসবেই।