১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২:৪৩

শিক্ষার্থীদের প্রত্যেকটি সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছি

সাদিক কায়েম  © টিডিসি সম্পাদিত

গত বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) ২০২৫ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের এক বছর পূর্ণ হয়েছে। তবে আগামী সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) ডাকসুর বর্তমান নেতৃত্বের দায়িত্ব নেওয়ার বছরপূর্তি পূর্ণ হবে। সহ-সভাপতি (ভিসি) হিসেবে দায়িত্ব পালনের এক বছরে নানা বিষয় ও পরবর্তী ডাকসু নির্বাচন নিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের সঙ্গে কথা বলেছেন সাদিক কায়েম। সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশ তুলে ধরছেন মিসবাহুর রশিদ মাসুম—

২০১৯ এবং ২০২৫ সালের ডাকসুর নেতৃত্ব নিয়ে তুলনা করলে কোনটাকে এগিয়ে রাখবেন?
সাদিক কায়েম: যখন দেখি ২০১৯ সালে ডাকসু কী করেছে, আমরা ওই ধরনের কোনো আর্কাইভ পাই না। তারা কখনো এক টেবিলে বসতে পারেনি। হল সংসদ এবং কেন্দ্রীয় সংসদ এক টেবিলে বসতে পারেনি এবং জবাবদিহি করতে পারেনি। মারামারি, গ্রুপিং—এসব ছিল। আগের যারা ডাকসুতে নির্বাচিত ছিলেন, যেমন মাহমুদুর রহমান মান্না, তাদের সঙ্গেও আমরা মিটিং করেছি। তারা বলেছেন, তাদের সময়েও মধুর ক্যান্টিনে কে কোন টেবিল দখল করবে, গ্রুপিং নিয়ে বিরোধ হতো, মারামারি হতো। আল্টিমেটলি বিভিন্ন গ্রুপিংয়ের কারণে শিক্ষার্থীদের কল্যাণমূলক কাজ সেভাবে করা সম্ভব হতো না।

আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো হল সংসদ ও কেন্দ্রীয় সংসদকে একটি টিম হিসেবে কাজ করেছি। আপনারা জানেন, আমরা নিয়মিত শিক্ষার্থীদের কাছে জবাবদিহি করেছি। প্রথম চার মাসের কার্যবিবরণী পেশ করেছি, প্রতিনিধি সম্মেলন করেছি। সেখানে প্রত্যেকটি হল তারা কী কাজ করেছে, কী কাজ করতে পারেনি এবং কোন কোন জায়গায় তারা সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে—এসব উপস্থাপন করেছে। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ও ডাকসুর সভাপতি উপস্থিত ছিলেন। আমরা দ্বিতীয় চার মাসের কার্যবিবরণীও পেশ করেছি এবং আগামী ১৪ তারিখে দায়িত্ব হস্তান্তরের দিন একটি প্রতিনিধি সম্মেলন করব। সেখানে আমরা পুরো বছরের কার্যবিবরণী পেশ করব। আমরা সবসময় শিক্ষার্থীদের কাছে জবাবদিহি করেছি। শিক্ষার্থীরা আমাদের নির্বাচিত করেছে, তারা আমাদের ওপর ম্যান্ডেট দিয়েছে। আমরা মনে করি, এই ম্যান্ডেট একটি আমানত। আমরা চেষ্টা করেছি প্রত্যেকটি ম্যান্ডেটের যথাযথ হক আদায় করতে।

আগের ডাকসুতে আমরা দেখতে পাই, সে সময় ক্যাম্পাসে মারাত্মক গেস্টরুম কালচার ছিল। শিক্ষার্থীদের জোরপূর্বক নিয়ে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মধুর ক্যান্টিন ও ডাকসু অফিসের নিচে বসিয়ে রাখা হতো। শিক্ষার্থীরা ডাকসু অফিসে আসতে পারত না। আমরা সেখানে তেমন কোনো কল্যাণমূলক কাজ দেখিনি; শুধুমাত্র মারামারি ও গ্রুপিং ছিল। সাংবাদিকরা চাইলে বিষয়টি যাচাই করে দেখতে পারেন। স্বাধীনতার আগে পাকিস্তান আমলে ১৬ বার ডাকসু হয়েছে, ব্রিটিশ পিরিয়ডে মোট ১৪ বার ডাকসু হয়েছে এবং স্বাধীনতার পর গত ৫৫ বছরে ৯ বার ডাকসু হয়েছে। অর্থাৎ ৩৯ বারের মধ্যে গত ৩৮ বারের কার্যক্রম কী ছিল, কাগজপত্র খুলে আপনারা দেখবেন। দেখবেন, মারামারি, সংঘাত ও রাহাজানিই ছিল। প্রত্যেক দিনই যেন মারামারি ও সন্ত্রাসের ঘটনা ছিল। আবার আগের নির্বাচিত নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কথা বললে তারা বলেছেন, ডাকসুর কাজ বলতে কিছু সংবাদপত্র বের করা, ম্যাগাজিন প্রকাশ করা ও সেমিনার আয়োজন করাই মূলত ছিল। এর বাইরে শিক্ষার্থীদের ইনফ্রাস্ট্রাকচারাল ও ডেভেলপমেন্টমূলক কাজ তেমন ছিল না।

২০২৫ সালের ডাকসুতে কী কী পরিবর্তন হয়েছে?
সাদিক কায়েম: আমরা যখন দায়িত্ব নিয়েছিলাম, তখন একটি ভঙ্গুর ব্যবস্থা পেয়েছিলাম। ১০৫ বছরের শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা এবং জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী শিক্ষার্থীদের যে আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশা ছিল, আমরা প্রত্যেকটি সমস্যা আমাদের জায়গা থেকে সমাধানের চেষ্টা করেছি। ডাকসু ভবনের দিকে তাকালেই বিষয়টি দেখা যাবে। এখানে কার্যনির্বাহীদের রুম ছিল না, আমাদের সেক্রেটারিয়েটের রুম ছিল না। আমরা প্রত্যেকটি রুম তৈরি করেছি। কেন্দ্রীয় মসজিদসহ বিভিন্ন জায়গায় কাজ করেছি। আবাসন সংকট দূর করার জন্য প্রকল্প এসেছে। সেন্ট্রাল লাইব্রেরিকে আধুনিক সেন্টারে রূপান্তর, মসজিদকে আধুনিক কমপ্লেক্সে রূপান্তরসহ বড় বড় কাজের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সামনে যারা নির্বাচিত হবে, তাদের আহামরি বড় কোনো কাজ হয়তো থাকবে না; তাদের নিয়মিত রুটিন কাজগুলো করলেই হবে। আমরা একটি স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করে দিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু আমরা যখন দায়িত্ব নিয়েছিলাম, তখন ভাঙাচোরা কাঠামোর মধ্য দিয়ে আমাদের উঠতে হয়েছে এবং সেখানে আমাদের অনেক চ্যালেঞ্জ ছিল।

তারা (প্রশাসন) চেয়েছিল ফান্ড না দিয়ে আমাদের ব্যর্থ করতে, অসহযোগিতা করতে। কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ, শিক্ষার্থীদের সমর্থন এবং বিভিন্ন সহযোগিতার মাধ্যমে আমরা শিক্ষার্থীদের অধিকার নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছি। নারী শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নিরাপদ ক্যাম্পাস তৈরির চেষ্টা করেছি। 

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার থাকাকালে আমরা অনেক বড় বড় প্রকল্প নিয়ে এসেছিলাম। ক্যাম্পাসের জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য কাজ করেছি। পেট কার্নিভাল করেছি, যেখানে পোষা প্রাণীদের জন্য ভ্যাকসিনেশন, মেডিসিন ও খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ক্যাম্পাস পরিষ্কার রাখার জন্য সিটি কর্পোরেশনের মাধ্যমে পুরো ক্যাম্পাসকে ক্লিন অ্যান্ড গ্রিন করার উদ্যোগ নিয়েছিলাম।

প্রত্যেক হলের শিক্ষার্থীরা জানে, রুমের মধ্যে ছারপোকার কারণে রাতে ঘুমানো কঠিন হয়ে যেত। আমরা হেলথ ক্যাম্প করেছি। ডার্মাটোলজি বা চর্মরোগ বিভাগে অসংখ্য শিক্ষার্থীকে যেতে হতো। এর একটি বড় কারণ ছিল অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ। এটার জন্য সিটি কর্পোরেশন ও রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব রয়েছে। আমরা যখন দায়িত্ব নিয়েছিলাম, তখন পরিস্থিতি আরও খারাপ ছিল। আমরা ৩৫ লাখ টাকা খরচ করে প্রত্যেকটি হল ছাড়পোকা মুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছি।

ক্যাম্পাসের জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য আমরা প্রায় ১ হাজার ডাস্টবিনের ব্যবস্থা করেছিলাম। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্থানীয় সরকার বিষয়ক উপদেষ্টার কাছ থেকে অনুমোদন নিয়ে সিটি কর্পোরেশনের মাধ্যমে এই ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান বিএনপি সরকার আসার পরে সেটি বাতিল করে দেয়। ক্যাম্পাসের জলাশয়গুলোর মধ্যে মুজিব হলের পুকুর, শহীদুল্লাহ হলের পুকুর ও জগন্নাথ হলের পুকুরসহ বড় পুকুরগুলোর পাড় বাঁধাই, পরিষ্কার ও লাইটিংয়ের জন্য আমরা অনুমোদন নিয়ে এসেছিলাম। সেটিও পরবর্তীতে বাতিল করা হয়।

ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা এবং নারী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রত্যেক হলে স্পন্সর নিয়ে এসেছিলাম। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন পর বিভিন্ন জায়গায় আলো জ্বলছিল। সেটিও পরবর্তীতে বর্তমান বিএনপি সরকার আসার পর বাতিল করে দেওয়া হয়। পাবলিক টয়লেট নির্মাণ, যা শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল, সেটি নিয়েও কাজ করেছিলাম। 

ক্যাম্পাসের রিকশাগুলোকে নিবন্ধিত রিকশার আওতায় নিয়ে আসা এবং বিভিন্ন জায়গায় আনসার-পুলিশ দেওয়ার জন্যও অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান নির্বাচিত সরকার আসার পর সেগুলোও বাতিল করে দেয়। এভাবে অসংখ্য প্রকল্প বাতিল করা হয়েছে।

সবচেয়ে বড় প্রকল্পগুলোর একটি ছিল টিসিবির সঙ্গে করা এমওইউ। টিসিবির পণ্যের আওতায় এসে শিক্ষার্থীদের খাবারের দাম অর্ধেকের কাছাকাছি কমিয়ে আনার পরিকল্পনা ছিল। আপনারা জানেন, টিসিবিতে চাল, ডালসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কম দামে পাওয়া যায়। এ বিষয়ে এমওইউ হয়েছিল এবং অনুমোদনও হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার আসার পর সেটিও বাতিল করে দেয়। অর্থাৎ তারা নিজেরাও করবে না, আমরা যখন নিয়ে আসি, সেটাও করতে দেবে না।

এত অসহযোগিতার পরও আমরা শিক্ষার্থীদের মৌলিক সংকটগুলো সমাধানের চেষ্টা করেছি। হয় আমরা প্রশাসনের কাছে বারবার গিয়েছি এবং তাদের বলেছি, অথবা অ্যালামনাইদের মাধ্যমে রিসোর্স ও অর্থ সংগ্রহ করে কাজ বাস্তবায়ন করেছি। ডাকসুতে দায়িত্ব নেওয়ার সময় আমরা একটি ভঙ্গুর অবকাঠামো পেয়েছিলাম। দীর্ঘদিন ডাকসু অকার্যকর থাকায় অফিসটি প্রায় ভূতুড়ে পরিবেশে পরিণত হয়েছিল। কোনো বসার পরিবেশ ছিল না। ২০১৯ সালের ডাকসুর সময় শিক্ষার্থীরা তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে সহজে আসতে পারত না। আমরা নির্বাচিত হওয়ার পর ডাকসু ভবনকে একটি আধুনিক সেন্টারে রূপান্তর করার চেষ্টা করেছি। এই সেন্টারের মাধ্যমে শুধু শিক্ষার্থী নয়, দেশি-বিদেশি প্রতিনিধি, বিভিন্ন দেশের অ্যাম্বাসেডর এবং দেশি-বিদেশি ইনফ্লুয়েন্সিয়াল ব্যক্তিদের আমন্ত্রণ জানিয়ে তাদের আমাদের ক্যাম্পাস ও দেশ সম্পর্কে জানানোর সুযোগ তৈরি করতে চেয়েছি।

একই সঙ্গে এই ভবনকে একটি স্কিল ডেভেলপমেন্ট সেন্টারে রূপান্তর করেছি। প্রতিদিন কোনো না কোনো কোর্স রাখার চেষ্টা করেছি। ফ্রি স্পোকেন ইংলিশ করিয়েছি, চীনা ভাষা ও বিভিন্ন আধুনিক ভাষা শেখানোর ব্যবস্থা করেছি এবং গবেষণার ওপর কোর্স করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শুধু একাডেমিক সমস্যা নয়, পারিবারিক ও ব্যক্তিগত সমস্যা নিয়েও আমাদের কাছে এসেছে। কারও মোবাইল হারিয়ে গেলে, পরিবারের জায়গা-জমি সংক্রান্ত সমস্যা বা পারিবারিক বিভিন্ন বিষয়েও তারা আমাদের কাছে এসেছে। আমরা প্রত্যেকটি সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছি।

আমাদের সবচেয়ে বড় সংকটের একটি ছিল ফান্ড। আমরা দেখতে পেয়েছি, আগের ডাকসুগুলোতে শিক্ষার্থীরা ভর্তি হওয়ার সময় যে টাকা দিত, সেখান থেকে বাজেট বরাদ্দ করা হতো। ২০১৯ সালের ডাকসুতে প্রায় দুই কোটি টাকার মতো বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। প্রায় তিন মাস পর আমরা মাত্র ২৫ লাখ টাকা পেয়েছি। সর্বশেষ দায়িত্ব শেষ হওয়ার প্রায় এক মাস আগে আরও ১০ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ফান্ড না দিয়ে আমাদের ব্যর্থ করে দেওয়া। কিন্তু আমরা অ্যালামনাইদের সম্পৃক্ত করে এবং বিভিন্ন রিসোর্সের সঙ্গে যোগাযোগ করে শিক্ষার্থীদের কাছে দেওয়া প্রতিটি কমিটমেন্ট বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল সান্ধ্যকালীন বাস সার্ভিস এবং শনিবারে বাস সার্ভিস চালু করা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৫ বছরের ইতিহাসে যা আগে হয়নি, আমরা সেটি চালু করেছি। নারী শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে মুক্তি ও উন্নয়নের কথা বলা হলেও তাদের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা ছিল না। আমরা তাদের জন্য ৬৫ লাখ টাকা খরচ করে জিমনেশিয়াম তৈরি করেছি। প্রত্যেক নারী হলের শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল মাতৃত্বকালীন ছুটি। এই কঠিন সময় পার করতে তাদের সমস্যা হতো। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ওপর চাপ প্রয়োগ করে মাতৃত্বকালীন ছুটির ব্যবস্থা চালু করেছি।

আমাদের উপাসনালয়গুলোর ক্ষেত্রেও আমরা কাজ করেছি। দুর্গাপূজা ও বিভিন্ন পূজার সময় ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সহযোগিতা করে নারী হল ও জগন্নাথ হলের জন্য ফান্ড নিয়ে এসেছি। কেন্দ্রীয় মসজিদে প্রায় ৬৫ বছর কোনো সংস্কার হয়নি। আমরা প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা ব্যয়ে মসজিদের সংস্কার করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে আমরা ফান্ড চেয়েছিলাম, তারা বলেছিল ফান্ড নেই। পরে আমরা নিজেদের উদ্যোগে অ্যালামনাইদের সম্পৃক্ত করেছি। তৎকালীন ভিসি নিয়াজ আহমেদ স্যারও সহযোগিতা করেছেন, আমরা তার প্রতি কৃতজ্ঞ। মসজিদে এসি স্থাপনের পর বিদ্যুৎ সংযোগ পেতে সাড়ে সাত মাস সময় লেগেছে। সর্বশেষ ওবায়েদ স্যারও আমাদের সহায়তা করেছেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য বিভাগ কো-অপারেট না করায় মুসল্লিদের দীর্ঘ সময় কষ্ট পেতে হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টার, যেটিকে নাপা সেন্টার বলা হতো, সেটির আমূল পরিবর্তন হয়েছে। সেখানে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকার কাজ হয়েছে। আমরা শুধু মেডিকেল সেন্টারেই কাজ করিনি, প্রত্যেক হলে শিক্ষার্থীরা যেন বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা পায়, সে জন্য মেডিকেল ক্যাম্প আয়োজন করেছি। সেখানে ফ্রি টেস্ট, চিকিৎসা ও ওষুধের ব্যবস্থা করেছি। সর্বশেষ দুই দিনব্যাপী হেলথ ফেস্ট করেছি। টিএসসিতে সাধারণত বিভিন্ন মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়, কিন্তু এ ধরনের হেলথ ফেস্ট আগে হয়নি। সেখানে বাংলাদেশের বড় বড় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা এসেছেন। শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছে। বিভিন্ন বিভাগের প্রধান ও চিকিৎসকরা বিনামূল্যে চিকিৎসা দিয়েছেন, ফ্রি টেস্ট করা হয়েছে এবং রিপোর্ট ডাকসুর পক্ষ থেকে বিনামূল্যে দেওয়া হয়েছে। যারা চিকিৎসকদের দেখিয়েছে, তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী পরবর্তী চিকিৎসাও বিনামূল্যে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এভাবে আমরা একটি স্থায়ী কাজ করার চেষ্টা করেছি।

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমরা এমওইউ করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল। বৃষ্টি হলে সেখানে কোমর পর্যন্ত পানি জমে যেত। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে বারবার বলেছি, কিন্তু তারা কাজ করেনি। আমরা দুই কোটি টাকার ফান্ড নিয়ে এসেছি, যা আমাদের হাতে দেওয়া হয়েছিল। আর্থিক স্বচ্ছতার জায়গায় আমরা স্বচ্ছতা নিশ্চিত করেছি। সেই ফান্ড আমরা বিশ্ববিদ্যালয়কে দিয়েছি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার সেটি গ্রহণ করেছেন। এখন প্রায় সাড়ে সাত মাস হয়ে গেছে, কিন্তু কাজগুলো এখনো বিলম্বিত হচ্ছে। সর্বশেষ আমাদের বলা হয়েছে, টেন্ডার হচ্ছে। আমরা আশা করছি দ্রুত কাজ দৃশ্যমান হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতি নিয়েও আমরা প্রচুর কাজ করেছি। আমি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি, আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর এই ক্যাম্পাসে গণরুম ও গেস্টরুম সংস্কৃতি চিরতরে বন্ধ করার চেষ্টা করেছি। ভবিষ্যতে যেন এটি আর ফিরে না আসে, সে জন্য নীতিমালা প্রণয়নের প্রস্তাব দিয়েছি। মাস্টার্সে কেউ একবারের বেশি রি-অ্যাড নিলে এবং অনার্সে কেউ দুইবার রি-অ্যাড নিলে তার ছাত্রত্ব বাতিল করার মতো নীতিমালা প্রণয়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ক্যাম্পাসে আর যেন ‘আদুভাই’ তৈরি না হয় এবং হল দখল না হয়, সে জন্যও স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছি।

আবাসন সংকটকে কৃত্রিমভাবে তৈরি করে ১০৫ বছর ধরে শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করা হয়েছে—আমরা সেই সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে চাই। শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতনের যে পরিবেশ ছিল, তা যেন আর ফিরে না আসে, সে জন্য আমরা কাজ করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় সাড়ে ৪৫০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প এসেছে। সেটি দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য আমরা কথা বলেছি। নিয়াজ স্যার যখন ভিসি ছিলেন, তার সময় এসব প্রকল্পের উদ্বোধন হয়েছে। চীন সরকার নারী শিক্ষার্থীদের জন্য ১ হাজার ৫০০ আসনের একটি হল নির্মাণের কাজ করছে। ইতোমধ্যে জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং আশা করছি আগামী এক বছরের মধ্যে কাজ শেষ হবে।

ইশতেহারে না থাকলেও আমরা প্রত্যেক হলে কম্পিউটার ল্যাব স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৫ বছর পার হয়ে গেলেও নারী শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা কম্পিউটার ল্যাব না থাকা আমাদের কাছে বিস্ময়কর। আমরা আইসিটি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অনুমোদন দিয়েছিল এবং তাদের সঙ্গে এমওইউ হয়েছিল। তারা প্রত্যেক হলে ক্যাডেট সেন্টার করে দেওয়ার কথা বলেছিল। কিন্তু বর্তমান নির্বাচিত সরকার, বিএনপি সরকার আসার পর সেই প্রকল্প বাতিল করে দেয়। পরে আমরা বিভিন্ন অ্যালামনাইকে সম্পৃক্ত করে নিজেদের উদ্যোগে কম্পিউটার ল্যাব স্থাপনের কাজ করছি। পাশাপাশি প্রত্যেক হলের রিডিং রুম ও কমন রুম আধুনিকায়ন করেছি এবং শিক্ষার্থীরা যেন সুন্দরভাবে পড়াশোনা করতে পারে, সে জন্য সেখানে এসি স্থাপনের কাজ করছি।

শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবি মোতাহার হোসেন ক্যান্টিন। সেটি ইতোমধ্যে স্পেস অ্যালোকেশন কমিটিতে বরাদ্দ হয়েছে এবং খুব দ্রুত দৃশ্যমান হবে। টিএসসির উন্নয়নের জন্য আমরা ইউজিসিতে গিয়েছি। প্রায় দুই কোটি টাকার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং আশা করছি দ্রুত অনুমোদন হবে ও কাজ শুরু হবে। বিজ্ঞান এলাকায় ক্যান্টিন স্থাপনের উদ্যোগও অনুমোদিত হয়েছে। ২০ তলা বা ২২ তলা ভবনের নিচে ক্যান্টিনটি হবে।

আমরা সবচেয়ে বড় যে কাজটি করেছি, তা হলো গবেষণায় শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করা। এ নিয়ে প্রচুর কোর্স ও ওয়ার্কশপ করেছি। স্কিল ডেভেলপমেন্ট নিয়ে বিভিন্ন সামিট করেছি। জব ফেয়ার করেছি। চীন সরকারের আমন্ত্রণে চীনে গিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। পিপল-টু-পিপল ও গভর্নমেন্ট-টু-গভর্নমেন্ট যোগাযোগ তৈরির কাজ করেছি। সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদের উদ্যোগে প্রায় দুই ডজনেরও বেশি ম্যাগাজিন প্রকাশ করেছি। জুলাই বিপ্লব নিয়ে সবচেয়ে বেশি কাজ আমরাই করেছি। আন্তর্জাতিক সম্মেলন করেছি এবং সেখানে আসা পেপার ও অ্যাবস্ট্রাক্টগুলো বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য কাজ করছি। এগুলো জার্নালে প্রকাশ করা হবে।

শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য আমরা ‘অদম্য বৃত্তি’র ব্যবস্থা করেছি এবং তাদের জন্য একটি ইনক্লুসিভ ক্যাম্পাস তৈরির চেষ্টা করেছি। নতুন যে ভবনগুলো হবে, সেখানে তাদের জন্য ব্রেইল এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করার বিষয়েও কথা বলেছি। সর্বশেষ শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে আমরা প্রস্তাবনা দিয়েছি। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বারবার কথা বলেছি, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু না করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। প্রশাসন যখন এটি করছে না, তখন ডাকসু থেকে এবং ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য উম্মে সালমা রাফিয়ার উদ্যোগে শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতির একটি সাইট লঞ্চ করা হয়েছে। সেখানে ৭ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ইতোমধ্যে শিক্ষক মূল্যায়ন করছেন। আগামী তিন মাস পর আমরা এসব মূল্যায়ন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে জমা দেব এবং শিক্ষকদের কাছে ফিডব্যাক পাঠাব।

আমরা চেষ্টা করেছি একটি একাডেমিক ক্যাম্পাস, নারীদের জন্য নিরাপদ ক্যাম্পাস এবং বিভিন্ন ইনফ্রাস্ট্রাকচারাল সুবিধাসম্পন্ন ক্যাম্পাস বিনির্মাণ করতে। আমরা দেখাতে চেয়েছি, নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে আমরা ক্ষমতার প্রদর্শন করতে চাই না; বরং শিক্ষার্থীদের সেবা নিশ্চিত করতে চাই। আমরা আধিপত্য বিস্তার করতে চাই না; বরং সবার প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে চাই। আমরা কাউকে ভয়, আতঙ্ক বা হুমকি দিতে চাই না; বরং সব শিক্ষার্থীর স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে চাই। আমাদের কাজের মাধ্যমে সেটি ইতোমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। শিক্ষার্থীরাই বলে, আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে যতগুলো ডাকসু হয়েছে, তাদের মধ্যে এত শিক্ষার্থীবান্ধব ও ছাত্রকল্যাণমূলক কাজ তারা আগে কখনো দেখেনি।

প্রশাসন ছাড়া ডাকসুর ফান্ড আর কোথায় থেকে নেওয়া হয়েছে, কত হতে পারে?
সাদিক কায়েম: বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমরা প্রথমে ২৫ লাখ টাকা এবং পরবর্তীতে সর্বসম্মতিক্রমে আরও ১০ লাখ টাকা পেয়েছি। এই ৩৫ লাখ টাকার মধ্যে ডাকসুর ভিপি হিসেবে আমি সাদিক কায়েম কোনো টাকা নিইনি। ডাকসুর কোনো আর্থিক সুবিধা আমি গ্রহণ করিনি। এমনকি এখানে চা-পানের জন্য যে টাকা-পয়সা দেওয়া হয়, সেখান থেকেও আমি কোনো টাকা নিইনি। আমার অ্যাকাউন্ট দেখলে একটি বড় শূন্য দেখতে পাবেন। ডাকসুর জিএস ও এজিএস—আমরা তিনজনও কোনো আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করিনি। আরও কয়েকজন সম্পাদকও কোনো সুবিধা নেননি। বাকি যে আয়-ব্যয় হয়েছে, তার হিসাব আমাদের অডিট কমিটি ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ও ডাকসুর সভাপতির কাছে দিয়েছে। আমাদের ট্রেজারের নেতৃত্বে অডিট করা হয়েছে এবং সেই অডিট রিপোর্ট আমরা শিক্ষার্থী ও জাতির সামনে প্রকাশ করব।

এর বাইরে আমরা প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ কোটি টাকার ফান্ড বা রিসোর্স ম্যানেজ করেছি। তবে এখনো পুরো হিসাব ক্লোজ হয়নি। এ বিষয়ে কমিটি করা হয়েছে এবং তারা কাজ করছে। আমরা অ্যালামনাই, দেশ-বিদেশের বিভিন্ন রিসোর্স পারসন এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে এসব রিসোর্স সংগ্রহ করেছি। কেন্দ্রীয় মসজিদের জন্য একজন ব্যক্তি অর্থ দিয়েছেন, তিনি তার নাম প্রকাশ করতে চাননি। তিনি আমাদের কাছে জানতে চেয়েছিলেন মসজিদের সংস্কারে কী কী প্রয়োজন। আমরা কমিটি করে প্রয়োজনীয় বিষয় নির্ধারণ করে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকার ইন্সট্রুমেন্টের তালিকা দিয়েছি এবং পরবর্তীতে তিনি তা দিয়েছেন। কেন্দ্রীয় মাঠের জন্য প্রায় দুই কোটি টাকার মেজারমেন্ট করে দিয়েছি, পরে তারা দুই কোটি টাকার চেক দিয়েছে। সেই টাকা আমরা নিজেদের কাছে না রেখে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করেছি। নারী শিক্ষার্থীদের জিমনেশিয়ামের ক্ষেত্রেও আমরা টাকা নিজেদের হাতে নিইনি। কী কী প্রয়োজন, সেটি নির্ধারণ করে দিয়েছি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান তা স্পন্সর করেছে। আবার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোনো ফান্ড পাওয়া গেলে তার পূর্ণাঙ্গ আয়-ব্যয় ও রসিদ আমরা সংরক্ষণ করেছি।

নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ক্যাম্পাস বিনির্মাণে কী কী করেছে ডাকসু?
সাদিক কায়েম: নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ক্যাম্পাস তৈরির ক্ষেত্রেও আমরা কাজ করেছি। প্রত্যেক হলের সিকিউরিটি গেট নিয়ে আমরা অনেকবার কথা বলেছি। স্পন্সরশিপ নিয়ে এসে এমন ব্যবস্থা করার চেষ্টা করেছি, যাতে এক হলের শিক্ষার্থী অন্য হলে যেতে পারে এবং অনাবাসিক শিক্ষার্থীরাও প্রবেশ করতে পারে। তবে আমাদের প্রস্তাবনা ছিল একটি স্থায়ী সমাধান। আমরা এর জন্য ফান্ডও নিয়ে এসেছি। কিন্তু প্রশাসনের কাছে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা না থাকায় সেটি বাস্তবায়িত হয়নি। তারপরও মাতৃত্বকালীন ছুটি, বিভিন্ন ফ্যাকাল্টির কমন রুমের আমূল পরিবর্তন, নারী শিক্ষার্থীদের জিমনেশিয়াম, কেন্দ্রীয় মসজিদে নারীদের জন্য জায়গার সংস্কার, বিভিন্ন জায়গায় হাইজিন কিট, মেডিকেল সেন্টার ও হলভিত্তিক চিকিৎসাসেবা এবং রিডিং রুমে এসি স্থাপনের কাজ করেছি। মৈত্রী হল ও বঙ্গমাতা হলের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সুফিয়া কামাল হল পর্যন্ত বাস সার্ভিসও নিয়ে আসছি।

নারীদের নিয়ে বিভিন্ন সার্ভে করা হয়েছে। সেই সার্ভেতে অধিকাংশ নারী শিক্ষার্থী মনে করেন, আমাদের নেতৃত্বে ক্যাম্পাসে নারীরা সবচেয়ে নিরাপদ অবস্থায় আছে। তারা মনে করেন, আমাদের নেতৃত্বে যে পরিমাণ শিক্ষার্থীবান্ধব ও শিক্ষার্থী কল্যাণমূলক কাজ হয়েছে, বিগত সময়ে তারা তা আর কখনো দেখেননি। তারা সামগ্রিকভাবে মনে করেন, ক্যাম্পাসের পরিবেশ, পড়াশোনার পরিবেশ এবং গবেষণার পরিবেশ উন্নত হয়েছে এবং আমাদের নেতৃত্বে তারা ভালো অবস্থায় আছেন।

পরবর্তী ডাকসু নির্বাচন সঠিক সময়ে হওয়া নিয়ে কোনো শঙ্কা দেখছেন?
সাদিক কায়েম: আমরা প্রথম থেকেই বলেছি, ডাকসু নির্বাচন নিয়মিত করতে হবে। ডাকসু নির্বাচনকে একাডেমিক ক্যালেন্ডারে অন্তর্ভুক্ত করেছি। প্রথম মিটিংয়েই এটিকে রেজুলেশনভুক্ত করে সিন্ডিকেটে পাঠানো হয়েছে এবং এটি একাডেমিক ক্যালেন্ডারে উঠেছে। ভিসি স্যারও বলেছেন, তিনি নির্বাচন দিতে চান। আমরা এখানে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখতে চাই না, চেয়ার নিয়ে বসে থাকতে চাই না। আমরা বলেছি, ১৪ তারিখে আমাদের দায়িত্ব শেষ হবে, ১৫ তারিখে তফসিল হবে এবং নির্বাচন হবে। একটি উৎসবমুখর পরিবেশ ফিরে আসবে এবং শিক্ষার্থীদের নির্বাচিত প্রার্থীরাই ক্যাম্পাসে নেতৃত্ব দেবে। সেই নির্বাচন আয়োজনের জন্য আমরা প্রস্তুত আছি এবং এই সৎসাহস আমাদের আছে।

তবে আমরা আশঙ্কা করছি, বর্তমান বিএনপি প্রশাসন ও বিএনপি সরকার তাদের অতীত ইতিহাস অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের ভয়েসকে ভয় পেতে পারে। ৯০-এর পর ক্যাম্পাসে ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সে সময় যারা ভিপি হয়েছিল, তারা দীর্ঘ সময় সেই পদ ব্যবহার করেছে। আমরা এভাবে ক্ষমতা দখল করে থাকতে চাই না। আমরা চাই নির্বাচন হোক। নির্বাচনের জন্য আমরা ইতোমধ্যে প্রশাসনের কাছে গিয়েছি। পঞ্চম কার্যনির্বাহী সভায় প্রথম এজেন্ডাই ছিল নির্বাচন এবং দ্রুত তফসিল ঘোষণার দাবি। আগামী ১৪ তারিখে আমাদের ষষ্ঠ ও শেষ কার্যনির্বাহী সভা রয়েছে, সেখানেও প্রথম এজেন্ডা হবে ডাকসু নির্বাচন এবং দ্রুত তফসিল ঘোষণা।

আমরা প্রত্যেক হলে ও প্রত্যেক জায়গায় শিক্ষার্থীদের কাছে যাব। শিক্ষার্থীদের কাছে শুভেচ্ছা বার্তা দেব। সেখানে আমরা বলেছি, ক্যাম্পাসে ইতিবাচক পরিবর্তনের ধারা অব্যাহত রাখার জন্য নিয়মিত ডাকসু চাই। আমরা চাই ক্যাম্পাসে যে গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তা অব্যাহত থাকুক। যারা এখানে রাজনীতি করবে, তারা যেন সবসময় শিক্ষার্থীদের কল্যাণের জন্য রাজনীতি করে। এজন্য ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়মিত হওয়া জরুরি।

সঠিক সময়ে ডাকসু নির্বাচন না হলে করণীয় কী থাকবে?
সাদিক কায়েম: আমরা নীতিনির্ধারণী জায়গায় নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত হয় সিন্ডিকেটে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট টিমের মাধ্যমে। তারা সিদ্ধান্ত নেয়। আমরা মূলত একটি প্রেশার গ্রুপ হিসেবে কাজ করি। বিগত সময়ে যেভাবে নির্বাচনের পক্ষে আমরা ভয়েস রেইজ করেছি, ভবিষ্যতেও নির্বাচনের জন্য কথা বলব। এরপরও যদি বিএনপি সরকার জনগণ ও শিক্ষার্থীদের ম্যান্ডেটকে ভয় পায়, তাহলে জুলাই বিপ্লবে শিক্ষার্থীরা যেভাবে ফ্যাসিবাদকে জবাব দিয়েছে, তার চেয়েও ভয়াবহ পরিণতি তাদের জন্য অপেক্ষা করতে পারে।

পরবর্তী ডাকসু নির্বাচন না হলে গণরুম-গেস্টরুম ফিরবে বলে মনে করেন?
সাদিক কায়েম: ক্যাম্পাসে যেন আর কখনো গণরুম-গেস্টরুম সংস্কৃতি ফিরে না আসে, সে জন্য আমরা নীতিমালার প্রস্তাব দিয়েছি। মাস্টার্সে একবারের বেশি রি-অ্যাড এবং অনার্সে দুইবার রি-অ্যাড করলে ছাত্রত্ব বাতিলের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আবাসন সংকট দূর করার জন্য হল নির্মাণের কাজ চলছে। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বহুবার বলেছি, যারা অতীতে গণরুম-গেস্টরুমের ভুক্তভোগী ছিলেন, তাদের স্মৃতি নিয়ে ক্যাম্পাসে একটি মনুমেন্ট থাকা দরকার। কিন্তু তারা এক বছর ধরে এ বিষয়ে ব্যর্থ হয়েছে। আমরা এখন ‘আর্তনাদ ৭১’ নামে একটি মনুমেন্ট করছি।

জুলাই বিপ্লব নিয়ে আমরা ‘নির্ভীক জুলাই’ করেছি। জুলাই নিয়ে ক্যাম্পাসে বর্তমান বিএনপি প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো কাজ এখনো আমরা দেখতে পাইনি। আমরা আমাদের জায়গা থেকে জুলাই বিপ্লব নিয়ে কাজ করেছি। গণরুম-গেস্টরুমের ভয়াবহ স্মৃতি নিয়ে একটি ম্যাগাজিনও প্রকাশ করেছি। সেটি ইংরেজিতে অনুবাদ করব, এ নিয়ে ডকুমেন্টারি তৈরি করব এবং ভবিষ্যতে ফিল্ম তৈরিরও পরিকল্পনা রয়েছে।

এই সংস্কৃতি যেন কখনো ফিরে না আসে, সে জন্য আমরা সবসময় ভয়েস রেইজ করব। শিক্ষার্থীদের আমরা বলেছি, এই দাসত্বের জীবন পরিহার করতে হলে সোচ্চার থাকতে হবে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সবসময় কথা বলতে হবে। এই ক্যাম্পাসে আর কখনো গণরুম-গেস্টরুম সংস্কৃতি ফিরে আসা উচিত নয়। শিক্ষার্থীর কাজ পড়াশোনা করা, চিন্তা করা, গবেষণা করা ও প্রশ্ন করা। কারও দাসত্ব করার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বা বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ভর্তি হতে হয় না। বাংলাদেশের কোনো ক্যাম্পাসে যেন আর কখনো গণরুম-গেস্টরুম সংস্কৃতি ফিরে না আসে, সে জন্য আমরা যতদিন বেঁচে আছি কাজ করব।

পরবর্তী ডাকসু নির্বাচন নিয়ে সরকারের প্রতি কী অনুরোধ রাখবেন?
সাদিক কায়েম: প্রত্যাশা থাকবে, বর্তমান যিনি প্রধানমন্ত্রী, তারেক রহমান, তিনি সবসময় গণতন্ত্রের কথা বলেন এবং তার মা, যাকে আপসহীন নেত্রী ও ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’ বলা হয়, তিনিও গণতন্ত্রের জন্য সারাজীবন লড়াই করেছেন। তারা যদি আবার গণতন্ত্রকে না চান এবং শিক্ষার্থীদের ভয়েসকে ভয় পান, তাহলে সেটা খুবই অপ্রত্যাশিত হবে। আমরা এখনো প্রত্যাশা রাখতে চাই, বর্তমান সরকার যে গণতন্ত্রের কথা বলে, তা আমরা তাদের কাজের মধ্যে দেখতে পাব। ক্যাম্পাসে জুলাই বিপ্লবের শহীদদের রক্তের মাধ্যমে যে ছাত্র সংসদগুলো পেয়েছি, সেই ধারা অব্যাহত থাকবে এবং নির্বাচন হবে। নির্বাচনে যারাই জিতুক, আমরা তাদের সাদরে গ্রহণ করব। এই উৎসব ও আমেজ ধরে রাখা দরকার।

আজকের ছাত্র নেতৃত্বই আগামী বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেবে। ক্যাম্পাসে যদি ছাত্র সংসদ বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে অযোগ্য ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা ভবিষ্যতে রাজনীতিবিদ, আমলা ও মন্ত্রী হওয়ার সুযোগ পাবে এবং দেশের সম্পদ লুটপাট করবে। তাদের মাধ্যমে দেশের কল্যাণ হবে না। বাংলাদেশের বড় বড় অর্জনগুলোর পেছনে ছাত্র সংসদ নির্বাচন ও ছাত্র রাজনীতির ভূমিকা রয়েছে। আমরা যে নতুন ধারার ছাত্র রাজনীতি তৈরি করার চেষ্টা করেছি এবং ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে যে ধারা শুরু হয়েছে, সেটি অব্যাহত রাখার জন্য এবং দেশের কল্যাণের জন্য ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়মিত হওয়া প্রয়োজন। বর্তমান সরকারকে নিয়ে আমাদের আশঙ্কা থাকলেও আমরা প্রত্যাশা রাখতে চাই, তারা ছাত্র সংসদ নির্বাচন দেবে এবং ক্যাম্পাসে একটি উৎসবমুখর পরিবেশ ফিরে আসবে। শহীদদের রক্তের মাধ্যমে যে গণতান্ত্রিক ক্যাম্পাস আমরা পেয়েছি, সেই পরিবেশ অব্যাহত থাকবে।