০৬ আগস্ট ২০২৬, ২০:২৯

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐক্যের সংস্কৃতি নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না

অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্‌দীন  © টিডিসি ফটো

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) দ্বিতীয় ক্যাম্পাস প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপের কাজ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে দেওয়াসহ নানা ইস্যুতে সম্প্রতি ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ আজ বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) একসঙ্গে একাধিক সংগঠন ক্যাম্পাসে কর্মসূচি ঘোষণার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে সব ধরনের সভা-সমাবেশ ও মিছিল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ছাত্রসংগঠনগুলোর করণীয়, শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিতসহ ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিয়ে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় খোলামেলা কথা বলেছেন জবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্‌দীন।

ক্যাম্পাসের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি কীভাবে দেখছেন?
অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্‌দীন: অনেক ধন্যবাদ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে। শিক্ষাঙ্গনের জন্য এ ধরনের ঘটনা ভালো চোখে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং নিন্দনীয়। আমি মনে করি, যেসব ক্যাম্পাসে ছাত্রসংগঠনগুলো সংঘর্ষে জড়াচ্ছে, তাদের অতীত ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে—গত ১৫-১৬ বছর ধরে উভয় পক্ষই বিভিন্নভাবে নিপীড়নের শিকার ছিল। ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশের মাত্র দুই বছর পূর্ণ হয়েছে। এর মধ্যেই যদি তারা আবার নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে আমি মনে করি এর পেছনে গভীর কোনো ইন্ধন বা ষড়যন্ত্র রয়েছে। 

এ ধরনের পরিস্থিতি এখনই বন্ধ করা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে সরকার ও বিরোধী দলের দায়িত্বশীল নেতাদেরও বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা উচিত। সংঘাতপূর্ণ পরিবেশ চলতে থাকলে তা দেশের শিক্ষা ও সামগ্রিক অগ্রগতির জন্য ক্ষতিকর হবে। তাই দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে এ ধরনের পরিস্থিতির অবসান ঘটানো প্রয়োজন।

ক্যাম্পাসে হামলায় আহতরা হাসপাতালে ভর্তি হলে সেখানেও হামলা করা হয়। পাশাপাশি সোহরাওয়ার্দী কলেজের সামনে জকসুর আরেক নেতার ওপর হামলা হয়। এসব ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কী ধরণের ব্যবস্থা নিচ্ছে?
অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্‌দীন: আমাদের ক্যাম্পাসে যে ঘটনা ঘটেছে, সেটিও অনভিপ্রেত, অনাকাঙ্ক্ষিত এবং নিন্দনীয়। ঘটনার দিন বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাই উদযাপন উপলক্ষে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কর্মসূচি চলছিল। অনুষ্ঠানে ইউজিসি চেয়ারম্যানসহ দুইজন উপাচার্য, শহীদ ইকরামুল হক সাজিদের মা উপস্থিত ছিলেন। এমন একটি আয়োজনে এ ধরনের পরিস্থিতি কোনোভাবেই কাম্য ছিল না। 

ইতোমধ্যে ৪ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা কাজ শুরু করেছে। প্রতিটি সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ঘটনার সূচনা, পরবর্তী বিস্তার এবং কার কী ভূমিকা ছিল—সবকিছু তদন্ত করা হবে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রয়োজনীয় পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

পরেরদিনের ঘটনাটি আমাদের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ও সৌন্দর্য হলো এর ঐক্যের সংস্কৃতি। দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে হয়তো এই সংস্কৃতি ছিল না, কিন্তু জগন্নাথে ছিল। আমি বিশ্বাস করি, একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার কারণে এই দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি নষ্ট হতে পারে না। আমি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে ধৈর্য ও সংযমের পরিচয় দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছি। কারণ ধৈর্য ও সংযমই আমাদের এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ দেখাতে পারে। 

ক্যাম্পাসে এই সংঘর্ষ কেন হলো? 
অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্‌দীন: ক্যাম্পাসের অডিটরিয়ামে জুলাই উদযাপন কর্মসূচি চলছিল। কয়েকজন শিক্ষার্থী প্ল্যাকার্ড নিয়ে অডিটোরিয়ামে প্রবেশ করতে চান। প্রক্টোরিয়াল বডি ও বিএনসিসির দায়িত্বরতরা তাদের নির্বৃত্ত করার চেষ্টা করেন। এতে কিছুটা উত্তেজনা তৈরি হয়। তখন আমি নিজেই অডিটোরিয়াম থেকে বের হয়ে সংশ্লিষ্ট ছাত্রনেতাদের সঙ্গে কথা বলি। তাদের বুকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলাম, আমাদের অতিথিদের সম্মান রক্ষা করা সবার দায়িত্ব। কোনো নির্দিষ্ট দাবি থাকলে তা স্মারকলিপি আকারে দেওয়া যেতে পারে। প্রয়োজন হলে অনুষ্ঠান শেষে ইউজিসি চেয়ারম্যানের সঙ্গে বসার সময়ও আমি ব্যবস্থা করে দিতে পারি।

আমার ধারণা ছিল, বিষয়টির সেখানেই সমাপ্তি ঘটবে। কিন্তু পরে দেখি, উত্তেজনা আরও বাড়তে থাকে। ভিডিও ফুটেজে আমি দেখেছি, অডিটোরিয়ামের দরজায় জোরে লাথি মারা হয়েছে এবং ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করা হয়েছে। এরপর বিষয়টি ছাত্রদলের সঙ্গে সংঘর্ষে রূপ নেয় এবং পুরো ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়ে। অনুষ্ঠান শেষে আমি সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করি। একই সঙ্গে পুলিশ প্রশাসনও কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করি, যাতে দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়।

আহতরা হাসপাতালে ভর্তি হলে, সেখানেও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। হাসপাতালের ভেতরেও উভয় পক্ষ নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে এবং একপর্যায়ে বাইরের লোকজন সেখানে গিয়ে হামলা চালায়। হাসপাতালের ভেতরে যেকোনো ধরনের সহিংসতা বা নাশকতা অবশ্যই নিন্দনীয়। এমন ঘটনার কোনো সমর্থন হতে পারে না। 

এদিন বিকেল ৪টার দিকে তাদের দেখতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলাম। পুলিশ প্রশাসন জানায়, সেখানে যাওয়ার মতো নিরাপদ পরিবেশ নেই। ফলে আমি তাৎক্ষণিকভাবে যেতে পারিনি। তবে সন্ধ্যার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রতিনিধি দল সেখানে যায়। রাতের দিকে আমি মিটফোর্ড হাসপাতালে গিয়ে আহত এক শিক্ষার্থীকে দেখি এবং সঙ্গে সঙ্গে তার সিটি স্ক্যানের ব্যবস্থাও করি। সেদিনই আমি ঘোষণা দিয়েছিলাম, এ ঘটনায় আহত দুই পক্ষের শিক্ষার্থীদের চিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যয়, তদারকি ও প্রয়োজনীয় সহায়তার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নেবে।

ক্যাম্পাসের চলমান সংকট দূর করতে কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছেন?
অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্‌দীন: আজ সকাল থেকেই ছাত্রসংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা শান্তিপূর্ণভাবে এসে স্মারকলিপি দিয়েছেন। ছাত্রদল, ছাত্রশিবির ও ছাত্রশক্তি—সব পক্ষই তাদের বক্তব্য জানিয়েছে এবং আমি তাদের বক্তব্য শুনেছি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে আমি ইতোমধ্যে ঢাকার সংশ্লিষ্ট দুইজন সংসদ সদস্যকে আমন্ত্রণ জানিয়েছি। পাশাপাশি জামায়াতের এমপি বা দায়িত্বশীল নেতাদেরও আহ্বান জানানো হবে। আলোচনা করা হবে। যাতে সবাই মিলে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যায়। সবশেষ ‘ছাত্রদল-শিবির উভয়ই মজলুম ছিল, তাদের সংঘাতপূর্ণ পরিবেশ এখনই থামানো দরকার।

শিক্ষার্থী ও জকসুর অভিযোগ— দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের টেন্ডার ও অস্থায়ী আবাসনকে কেন্দ্র করেই সংঘর্ষ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে, এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী? 
অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্‌দীন: দ্বিতীয় ক্যাম্পাস নিয়ে যে বিষয়টি সামনে এসেছে, আমি মনে করি এটিকে অযথা একটি ইস্যু বানানো হয়েছে। এখানে মূলত দুটি দাবি সামনে এসেছে। প্রথম দাবি ছিল, প্রকল্পের কাজ সেনাবাহিনীর হাতে হস্তান্তর করতে হবে। বাস্তবতা হলো— আমাদের প্রকল্পের প্রথম ধাপের কাজ ইতোমধ্যেই সেনাবাহিনী বাস্তবায়ন করছে। তাদের দায়িত্বের মেয়াদ আগামী ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত রয়েছে। অর্থাৎ এখনো সাড়ে চার থেকে পাঁচ মাস সময় বাকি। তাহলে এই মুহূর্তে আবার সেনাবাহিনীর হাতে কাজ হস্তান্তরের দাবি কেন আসবে?

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— এ ধরনের সিদ্ধান্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বা ইউজিসির চেয়ারম্যান এককভাবে নিতে পারেন না। এটি একটি মেগা প্রকল্প। এ বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউজিসি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং সেনাবাহিনী— সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বয়ে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়। এখনো সে ধরনের কোনো নতুন প্রস্তাবই চূড়ান্ত হয়নি। তাই এই মুহূর্তে এমন দাবি উত্থাপনের যৌক্তিকতা আমি দেখি না। 

দ্বিতীয় যে বিষয়টি এসেছে, সেটি হলো অস্থায়ী আবাসন। এটিও নতুন কোনো বিষয় নয়; দীর্ঘদিনের একটি দাবি। আমরা নিজেরাও যমুনার সামনে শিক্ষার্থীদের অস্থায়ী আবাসনের দাবিতে আন্দোলন করেছি। কিন্তু সেই আন্দোলনের পরও তখন বিশ্ববিদ্যালয় কোনো অর্থ বরাদ্দ আনতে পারেনি। আমি দায়িত্ব গ্রহণের পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে বহুবার গিয়েছি, সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেছি এবং শিক্ষার্থীদের আবাসন সুবিধার জন্য বরাদ্দ আনার চেষ্টা করেছি। আল্লাহর রহমতে আমরা সে বরাদ্দ আনতে সক্ষম হয়েছি। আমার ব্যক্তিগত কৃতিত্বের জন্য বলছি না, বরং বলতে চাই— বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থেই আমি সংশ্লিষ্ট সব জায়গায় গিয়ে চেষ্টা করেছি এবং সেই অর্থ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নিয়ে এসেছি।

প্রথমদিকে পরিকল্পনা ছিল, সেখানে টিনশেড নির্মাণ করে অধিকসংখ্যক শিক্ষার্থীকে দ্রুত আবাসন সুবিধা দেওয়া হবে। কিন্তু সেই প্রস্তাব ইউজিসিতে যাওয়ার পর তারা যৌক্তিকভাবেই সেটি ফেরত পাঠায়। তাদের বক্তব্য ছিল, যদি টিনশেডের অস্থায়ী আবাসন করা হয়, আর দুই-তিন বছরের মধ্যে স্থায়ী আবাসন নির্মাণ হয়ে যায়, তাহলে সরকারের প্রায় ২০ কোটি টাকার বিনিয়োগ কার্যত অপচয় হবে। তাই তারা পরামর্শ দেয়, অস্থায়ী না করে এমন একটি স্থায়ী ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা করতে হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার্থীদের কাজে আসবে।

সে অনুযায়ী আগের উপাচার্যের সময়েই ভবনের নকশা, ডিজাইনসহ প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়। পুরো প্রক্রিয়ায় ইউজিসি, পরিকল্পনা কমিশন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং ওয়ার্কস অ্যান্ড প্ল্যানিং কমিটির প্রতিনিধিরা যুক্ত ছিলেন।

আমি বরাদ্দের অর্থ এনে বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবে জমা করেছি। গত ২১ জুন অর্থ আসার পরই সেটি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু করি। এরপর নিয়ম অনুযায়ী টেন্ডার আহ্বান করা হয়। টেন্ডারের জন্য প্রায় এক মাস সময় দেওয়া হয়েছিল। সেই পুরো সময়ের মধ্যে কিন্তু এ ধরনের কোনো দাবি বা আপত্তি উত্থাপিত হয়নি।

টেন্ডার খোলার পর দেখা গেল, ১২টি প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করেছে। টেন্ডারের একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া আছে। মূল্যায়নের মাধ্যমে যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হবে। এতে টেন্ডারবাজির প্রশ্ন আসে কোথায়? আমরা কি জানতাম, কে কাজ পাবে? এক্স, ওয়াই কিংবা জেড—কাউকে না কাউকে তো নিয়ম মেনেই কাজটি করতে হবে। যদি টেন্ডারের মাধ্যমে কোনো প্রতিষ্ঠান কাজ পাওয়াকেই টেন্ডারবাজি বলা হয়, তাহলে উন্নয়নকাজ এগোবে কীভাবে?

যদি শিক্ষার্থীদের বক্তব্য হতো, ‘স্যার, ১০ তলা ভবন নির্মাণে সময় বেশি লাগবে। আমরা দ্রুত আবাসনের ব্যবস্থা চাই’—তাহলে সেটি আলোচনার বিষয় হতে পারত। তারা আমার সঙ্গে বসলে, আমি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করতাম। প্রয়োজন হলে নকশা পরিবর্তনের উদ্যোগও নেওয়া যেত। কিন্তু আলোচনার সেই সুযোগ না দিয়ে চাপ সৃষ্টি করা কিংবা মব সংস্কৃতির দিকে যাওয়া কোনোভাবেই সমাধান হতে পারে না।

আমি দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই সব ছাত্রসংগঠনকে নিয়ে একাধিকবার বসেছি। যেকোনো বিষয়ে আলোচনার চেষ্টা করেছি। আমি সব পক্ষকে সঙ্গে নিয়েই বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার মানসিকতা নিয়ে কাজ করছি। তাই এই দাবিগুলো যদি আলোচনার টেবিলে আসত, আমি অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতাম। কিন্তু সেই সুযোগ না দিয়ে একতরফাভাবে বলা হচ্ছে—এটি টেন্ডারবাজি, ছাত্রদল টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করছে, আর উপাচার্য তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করছেন। আমি মনে করি, এ ধরনের অভিযোগ সেই পুরোনো ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতিরই বহিঃপ্রকাশ।

বাস্তবে একজন উপাচার্য কি ইচ্ছা করলেই কোনো ছাত্রসংগঠনকে কাজ দিয়ে দিতে পারেন? ইজিপি পদ্ধতিতে কি সবাই অংশ নিতে পারে? এরও তো নির্দিষ্ট যোগ্যতা ও শর্ত রয়েছে। একজন সচেতন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরও সেই প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা থাকা উচিত। ইজিপির মাধ্যমে এ ধরনের বড় প্রকল্পে অংশ নিতে হলে নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করতে হয়। যারা সেই শর্ত পূরণ করেছে, তারাই টেন্ডারে অংশ নিয়েছে। টেন্ডার খোলার পর প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষে আমি একটি মূল্যায়ন কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সেই কমিটিই নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করে সিদ্ধান্ত নেবে—কোন প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে দ্রুত ও দক্ষতার সঙ্গে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে সক্ষম।

কিন্তু সেই মূল্যায়নের সুযোগ না দিয়েই যদি একতরফাভাবে অভিযোগ তোলা হয়, কেউ নিজেকে নায়ক বানাতে চায়, কেউ ভালো মানুষ প্রমাণ করতে চায়, আবার কাউকে অকারণে খারাপ প্রমাণ করার চেষ্টা করে—তাহলে তা কোনোভাবেই সুস্থ সংস্কৃতির অংশ হতে পারে না। আমি মনে করি, এই প্রতিযোগিতামূলক দোষারোপের সংস্কৃতি থেকেও আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে আপনার বার্তা কী?
অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্‌দীন: আমার আহ্বান একটাই। আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী, দেশনায়ক তারেক রহমান যে আহ্বান জানিয়েছেন— এই ছোট্ট দেশ আমাদের সবার। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। তবে কেউ যদি কোনো ফৌজদারি অপরাধ করে, তাহলে সেই অপরাধের দায়-দায়িত্ব অবশ্যই তাকে বহন করতে হবে। 

সেই ভাবনা থেকেই আমি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি স্লোগান ধারণ করেছি— টিম জগন্নাথ। আমি বিশ্বাস করি, সবাইকে সঙ্গে নিয়েই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের কল্যাণ এবং একটি ইতিবাচক পরিবেশ গড়ে তুলতে সব পক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন। আমি সেই সহযোগিতাই প্রত্যাশা করি। এ ধরনের সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি যেকোনো গঠনমূলক কাজের ক্ষেত্রে বড় বাধা সৃষ্টি করে। এতে বিশ্ববিদ্যালয় বা সংশ্লিষ্ট কেউই সম্মানিত হয় না; বরং আমরা সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হই। তাই সংঘাতের এই পরিবেশ থেকে সবাইকে বেরিয়ে আসতে হবে।

বিশেষ করে আমরা যারা নিজেদের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সহায়ক শক্তি হিসেবে দাবি করি, সেই পরিচয়ের প্রমাণ আমাদের কথায় নয়, কাজে দিতে হবে। দেশকে এগিয়ে নিতে যেমন সরকারের গঠনমূলক ভূমিকা প্রয়োজন, তেমনি বিরোধী দলেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা রয়েছে। প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সেই দায়িত্ব পালন করতে হবে। 

আমি সবার প্রতি ধৈর্য, সহনশীলতা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেওয়ার আহ্বান জানাই। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যেন সাধারণ শিক্ষার্থীদের সহাবস্থান, সম্প্রীতি এবং শান্তিপূর্ণ শিক্ষার পরিবেশ বজায় থাকে—আমি সেই প্রত্যাশাই করি। এতে ছাত্রসংগনগুলোই বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে দীর্ঘ সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ
অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্‌দীন: আপনাদেরও অসংখ্য ধন্যবাদ। দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস ‘শিক্ষাঙ্গন ও ক্যাম্পাস নিয়ে কাজ করে, তারা আমাদের নিয়ে আরও বেশি কাজ করবে এটাই প্রত্যাশা।