আমরা চাই সেশনজটমুক্ত ও গবেষণামুখী স্মার্ট বিশ্ববিদ্যালয়
জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের পর বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান অধ্যাপক ড. মো. মামুন অর রশিদ। গত ১৪ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের সপ্তম উপাচার্য হিসেবে তাঁকে নিয়োগ দেয় সরকার। শিক্ষকদের পদোন্নতির দাবিতে আন্দোলন ও প্রশাসনিক অচলাবস্থার মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের হাল ধরেন পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওশানোগ্রাফি অনুষদের ডিনের দায়িত্ব পালন করা এই অধ্যাপক। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বেশ কিছু শিক্ষার্থীবান্ধব পদক্ষেপ নিয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে আস্থার জায়গা তৈরি করেছেন। তাঁকে ঘিরে সবার প্রত্যাশা, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের নানা সংকট উত্তরণে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন।
বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে তাঁর স্বপ্ন, ভিশন, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং সংকট উত্তরণে করণীয় নিয়ে উপাচার্য হওয়ার পর প্রথমবারের মতো দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস’কে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন তিনি। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস-এর নিউজরুম এডিটর সোহেল রানা।
প্রথমেই জানতে চাই, জুলাই স্মৃতি স্তম্ভ প্রকল্পের বর্তমান অগ্রগতি কোন পর্যায়ে আছে?
অধ্যাপক ড. মো. মামুন অর রশিদ: জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চেতনা, তরুণ প্রজন্ম এবং এ দেশের জনগণের আত্মত্যাগের এক ঐতিহাসিক মাইলফলক। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্মাণাধীন জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ সেই ইতিহাসকে প্রজন্মান্তরে ধারণ করার জন্য এটি নির্মাণ অপেক্ষাধীন। আমরা চাই এটি স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতীক হয়ে উঠুক।
জুলাই আন্দোলনে হামলার বিচার নিশ্চিতকরণে কি কি ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছেন?
অধ্যাপক ড. মো. মামুন অর রশিদ: বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সবসময় ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলো পর্যালোচনার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ, তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করা হয়েছে। দোষীদের জবাবদিহির আওতায় আনার বিষয়ে আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ করেছি।
উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের অভিজ্ঞতা কেমন? কীভাবে দেখছেন?
অধ্যাপক ড. মো. মামুন অর রশিদ: এটি আমার জন্য যেমন গর্বের, তেমনি বড় দায়িত্বের বিষয়। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং অ্যালামনাইদের প্রত্যাশা পূরণ করে একটি আধুনিক, গবেষণাভিত্তিক ও মানবিক বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার সুযোগ হিসেবে আমি এই দায়িত্বকে দেখছি।
মেধাবৃত্তি ও ডিনস মেরিট অ্যাওয়ার্ড চালুর ভাবনা নিশ্চয়ই রয়েছে। বর্তমানে কী পরিকল্পনা করছেন?
অধ্যাপক ড. মো. মামুন অর রশিদ: আমরা বিশ্বাস করি, মেধাবী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে হবে। সেই চিন্তা থেকেই মেধাবৃত্তি ও ডিনস মেরিট অ্যাওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। ভবিষ্যতে গবেষণা অনুদান, দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি, ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং এবং আন্তর্জাতিক এক্সচেঞ্জের সুযোগ বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে।
বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আপনার প্রধান ভিশন কী? এটা বাস্তবায়ন কীভাবে করবেন?
অধ্যাপক ড. মো. মামুন অর রশিদ: আমার মূল ভিশন ছিল একটি শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক, গবেষণামুখী ও প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা। একাডেমিক কার্যক্রমের গতি বৃদ্ধি, শিক্ষার্থীদের কল্যাণমূলক উদ্যোগ এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে আমরা সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির পথে এগিয়ে যাব।
বিশ্ববিদ্যালয়ে একাডেমিক পরিবেশ নিশ্চিত কীভাবে করবেন? নিয়মিত একাডেমিক ক্যালেন্ডার চালুর ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কিনা?
অধ্যাপক ড. মো. মামুন অর রশিদ: আমরা নিয়মিত ক্লাস-পরীক্ষা ও সময়মতো ফলাফল প্রকাশের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি। বর্তমানে সেশনজট হ্রাস এবং নির্ধারিত একাডেমিক ক্যালেন্ডার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়কে সম্পূর্ণ সেশনজটমুক্ত করার লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার মানোন্নয়নে কী ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করবেন?
অধ্যাপক ড. মো. মামুন অর রশিদ: গবেষণা অনুদান বৃদ্ধি, গবেষণা প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, উচ্চমানের জার্নালে প্রকাশনা উৎসাহ এবং গবেষণাকেন্দ্রিক পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে আমরা গবেষণার মান উন্নয়নে কাজ করছি।
বিশ্ববিদ্যালয়কে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে র্যাংকিং উন্নয়নে আপনার কী ধরনের পরিকল্পনা রয়েছে?
অধ্যাপক ড. মো. মামুন অর রশিদ: জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাংকিং উন্নয়ন ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ইতোমধ্যে একটি উচ্চতর কমিটি গঠন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কমিটি একাধিক সভা ও কর্মশালা পরিচালনা করে আন্তর্জাতিক র্যাংকিং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও গবেষণার তথ্য প্রেরণ করেছে। খুব শীঘ্রই আমরা বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে আমাদের নির্দিষ্ট অবস্থান দেখতে পারব।
নির্দিষ্ট করে যদি বলি, ২০৩০ সালের মধ্যে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়কে কোন পর্যায়ে নিয়ে যেতে চান?
অধ্যাপক ড. মো. মামুন অর রশিদ: আমি ২০৩০ সালের মধ্যে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি স্মার্ট, গবেষণানির্ভর, উদ্ভাবনী, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে দেখতে চাই। এর জন্য এখন থেকেই মানসম্পন্ন শিক্ষা, গবেষণা, অবকাঠামো, দক্ষ মানবসম্পদ ও সুশাসনের ভিত্তি আরও শক্তিশালী করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কাজ করে যাচ্ছে। এ ছাড়া সকল অংশীজনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আগামী পাঁচ বছরে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয় পর্যায়ে শীর্ষস্থানীয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে এবং আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়েও উল্লেখযোগ্য অবস্থানে পৌঁছাতে সক্ষম হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
বর্তমান সরকারের কাছে কোনো প্রত্যাশা বা সহযোগিতা চান কিনা?
অধ্যাপক ড. মো. মামুন অর রশিদ: নতুন একাডেমিক ভবন, আবাসিক হল, গবেষণাগার, আধুনিক লাইব্রেরি, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী সহায়তা কর্মসূচির জন্য সরকারি বিনিয়োগ ও উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানিক সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।
সবশেষে, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও অ্যালামনাইদের উদ্দেশ্যে কি বলবেন?
অধ্যাপক ড. মো. মামুন অর রশিদ: সকলের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের সবার প্রতিষ্ঠান। এর উন্নয়ন ও মর্যাদা বৃদ্ধির দায়িত্বও আমাদের সবার। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা, জ্ঞানচর্চা ও ইতিবাচক অংশগ্রহণের মাধ্যমে আমরা একটি আধুনিক, মানবিক ও বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলতে পারবো। আমি সকলের আন্তরিক সহযোগিতা ও দোয়া কামনা করছি।