৩০ মার্চ ২০২৬, ২১:২৭

জবির ন্যূনতম সম্পদও যদি কারও দখলে থাকে, ফিরিয়ে আনব

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নবম উপাচার্য অধ্যাপক   © টিডিসি

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নবম উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন বিশ্ববিদ্যালটির ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্‌দীন। রাজধানীর পুরান ঢাকায় অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়টি নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, গবেষণার মানোন্নয়ন, শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা, ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতির সহাবস্থান এবং বিগত প্রশাসনের নানা বিতর্কিত ঘটনার প্রেক্ষাপটে বর্তমান বাস্তবতা ও সম্ভাবনা নিয়ে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় খোলামেলা কথা বলেছেন তিনি। জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রকৃত উন্নয়নে অগ্রাধিকার, চ্যালেঞ্জ ও করণীয়, শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের প্রত্যাশার কথা। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন রায়হান উদ্দিন ও সুবর্ণ আসসাইফ-

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নবম উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করায় দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের পক্ষ থেকে আপনাকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা। বিশ্ববিদ্যালয়টি নিয়ে আপনার স্বপ্ন কী?
অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্‌দীন: অনেক ধন্যবাদ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি ২০০৮ সালে যোগদান করেছি। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ২০০৫ সালে বেগম খালেদা জিয়ার মাধ্যমে সংসদে আইন পাশ করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আমার স্বপ্ন অত্যন্ত আকাশচুম্বী। আমি চাই, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার হাতে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়টি শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে একটি বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হোক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যেমন ঢাকার বুকে অবস্থিত, তেমনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ও ঢাকার বুকে অবস্থিত। আমি চাই, বাংলাদেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় অন্যতম হয়ে উঠুক। এখানকার শিক্ষার্থীরা শিক্ষা ও গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে, জাতি গঠনে ভূমিকা রাখবে— এটাই আমার প্রত্যাশা।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রফিক শাহাদাত বরণ করেছেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রয়েছে। ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানেও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে ব্যারিকেড দেওয়া হয়েছিল, তখন জগন্নাথের শিক্ষার্থীদের মিছিল সেটি ভেঙে দেয়। না হলে হয়ত আন্দোলন সফল হতো না। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শহিদ ইকরামুল হক সাজিদ শাহাদাত বরণ করেছে। জাতীয় পর্যায়ে প্রতিটি ক্ষেত্রেই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে।

ছাত্ররাজনীতির ইতিহাস বিশ্লেষণ করলেও দেখা যায়— অনেক ক্ষেত্রে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভূমিকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়েও বেশি। কিন্তু মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তারা সেই স্বীকৃতি পায় না। আমার স্বপ্ন— জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জাতীয় পর্যায়ে তাদের প্রাপ্য স্বীকৃতি পাবে। একইসঙ্গে, শিক্ষা, গবেষণা, শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধা এবং বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এগিয়ে যাবে— এটাই আমার লক্ষ্য। হয়ত এটি সময়সাপেক্ষ, তবে আমি বিশ্বাস করি একদিন এই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে। এই লক্ষ্য নিয়েই আমি ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই কাজ শুরু করেছি। সফলতা আল্লাহ রাব্বুল আল আমীন দেবেন— আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাব এবং সবাইকে সঙ্গে নিয়েই এগিয়ে যাব।

দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের সার্বিক অগ্রগতি ও হল উদ্ধারে কী ধরণের চ্যালেঞ্জ দেখছেন?
অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্‌দীন: আসলে আমাদের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা অনেকটা হতভাগা। ২০০৫ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমরা দেখেছি যে, সমসাময়িক সময়ে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরও অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ওই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের শিক্ষার্থীদের জন্য অনেকগুলো হলের ব্যবস্থা করেছে। একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় জগন্নাথ, যেখানে আমার শিক্ষার্থীদের জন্য একটি হলও নির্মাণ হয়নি। তার পরিপ্রেক্ষিতে যমুনা আন্দোলন হয়েছে— কিছুদিন পূর্বে আপনারা দেখেছেন।

কেরানীগঞ্জে আমাদের যে ক্যাম্পাস, আমরা যেটাকে দ্বিতীয় ক্যাম্পাস বলি। এটি ছিল আসলে বিগত ১৫-১৬ বছরের যে ফ্যাসিবাদ আমাদের উপরে ছিল, এটা ফ্যাসিবাদী এক মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ। তার কারণ, বিশ্ববিদ্যালয়টি যেহেতু বেগম খালেদা জিয়া প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, হয়তোবা ওই সময়কার সরকার মনে করেছিল এটাকে নির্বাসনে পাঠানো উচিত। যার কারণে, কেরানীগঞ্জের ওই জায়গাটাতে আমাদের কিছু জায়গা অধিগ্রহণ করে দেওয়া হয়েছে এবং একটি ক্যাম্পাসের ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নের জন্য নির্দেশনা এসেছে। কিন্তু কাজের কাজ আসলে সেখানে কিছুই হয়নি। এটা আপনারাও জানেন, সারাদেশের মানুষ জানে। এখনো সেখানে অবকাঠামোগত তেমন উন্নয়ন হয়নি, মাটি ভরাটের কাজই এখনো শেষ হয়নি। এই দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের প্রাথমিক অগ্রাধিকার হলো দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের সফল বাস্তবায়ন।

আমরা চাই, এই বর্তমান ক্যাম্পাস আমাদের প্রথম ক্যাম্পাস হিসেবে থাকবে, এটা আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ। এটার উন্নয়নও আমাদের ত্বরান্বিত করতে হবে। ফার্স্ট ফেজের কাজ সেনাবাহিনীর হাতে দেওয়া হয়েছে, মেয়াদ আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত— এটা আমাদের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং শিক্ষক সমিতির সবার চাওয়ার প্রেক্ষিতে হয়েছে।

আজকে আমি সব ছাত্র সংগঠন ও সাংবাদিকদের নিয়ে মতবিনিময় করেছি। হিসাব বিভাগ থেকে জেনেছি— প্রায় ৬৪ কোটি টাকার মতো সেনাবাহিনীকে দেওয়া হয়েছে। কাজ কতদূর হয়েছে, আমরা ফিল্ডে গিয়ে দেখব। নির্মাণাধীন দুটি হলের কাজ ৩০ ডিসেম্বরের মধ্যেই শেষ হওয়ার কথা। যদিও চতুর্থবারের মতো মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছে। আমরা একমুহূর্তও সময় নষ্ট করব না। সেনাবাহিনীর সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বসব। দ্রুত বাস্তবায়নের দিকে এগোবো।

জগন্নাথ কলেজের অনেকগুলো হল ছিল, যেখানে ছাত্ররা থাকত। সেগুলো সময়ের সাথে সাথে বেদখল হয়ে গেছে। ২০১৪ সালে একটি হল উদ্ধারের আন্দোলন হয়েছিল, আমি সেখানে নেতৃত্ব দিয়েছিলাম। তখন দেখা গেছে, সরকারদলীয় লোকজনের দখলে অনেক হল ছিল। এর মধ্যে বাণী হল এবং হাবিবুর রহমান হল উদ্ধার হয়েছে এবং সেখানে নতুন করে নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে।

আমি শিক্ষক সমিতির সভাপতি থাকাকালে তৎকালীন সংসদ সদস্য প্রার্থীর সাথে বসে কমিটমেন্ট নেওয়ার চেষ্টা করি। তিনি কমিটমেন্ট দিয়েছেন। সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর ইফতার মাহফিলে তাকে আবারও বিষয়টি স্মরণ করিয়েছি। ভাইস চ্যান্সেলর হওয়ার পর প্রথম দিনই তাকে আবার মনে করিয়ে দিয়েছি। গতরাতেও তার সাথে কথা হয়েছে। তিনি বলেছেন, দুই একদিনের মধ্যে তিনি হলগুলো পরিদর্শনে যাবেন।

আমরা প্রয়োজনে এডিসি, রেভিনিউ এবং ডিসির সাথেও বসব। আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাব বেদখলকৃত হল উদ্ধার করার জন্য। আমি বিশ্বাস করি, যদি আমরা আংশিকভাবেও সফল হই, আমার শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবে এবং তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই হবে। এই ক্ষেত্রে আমি শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং মিডিয়ার সবার সহযোগিতা প্রত্যাশা করি। কারণ এটা সবার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার বিষয়।  

আমি ভাইস চ্যান্সেলর হওয়ার পরে আমার স্টাফদের ডেকেছি এবং সব হলের কাগজপত্র আমার কাছে নিয়ে আসার জন্য বলেছি। আমি আগে বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বুঝতে চাই— কোনটা কী অবস্থায় আছে, আমাদের কাছে কী কাগজপত্র আছে। এরপর আমি দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় যাব।

আমি বিশ্বাস করি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের যদি ন্যূনতম কোনো সম্পদ কারও দখলে থাকে, সেটি আমরা ফিরিয়ে আনব। আমি এখানে নতুন ভাইস চ্যান্সেলর হলেও গত ১৮ বছর ধরে আমি আমার শিক্ষার্থীদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বিভিন্ন আন্দোলন করেছি, তাদের দাবি আদায়ে কাজ করেছি, তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই করার চেষ্টা করেছি। আমাদের সম্পদ কারও দখলে থাকবে, এটা হতে পারে না।

আমি মনে করি, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান যেমন দখলদারিত্বকে সমর্থন করবেন না, সরকারও করবে না। আমরা এটাকে হতে দেব না, ইনশাল্লাহ।

দ্রুত দ্বিতীয় সমাবর্তন বাস্তবায়নের দাবি শিক্ষার্থীদের, এছাড়া কেন্দ্রীয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েসন গঠন নিয়ে শিক্ষাথীদের প্রত্যাশাও অনেকদিনের। 
অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্‌দীন: প্রথম সমাবর্তন নিয়ে যে প্রতিক্রিয়া আছে, সেটা ওভারকাম করে খুব দ্রুতই ইনশাল্লাহ আমরা দ্বিতীয় সমাবর্তনের দিকে আগাব। আজ আমরা আমাদের মতবিনিময়ে সমাবর্তন নিয়ে আলোচনা করেছি। ইনশাল্লাহ, আগামী অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলেই আমরা দ্বিতীয় সমাবর্তন সফল করার জন্য আনুষঙ্গিক যে কমিটিগুলো গঠন করার দরকার, সেদিকে আগাব। সরকারের উচ্চ মহলে আমি যোগাযোগ করব। আশা করি, খুব দ্রুত সময়ের মধ্যেই এটা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।  

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় অ্যালামনাই খুব দ্রুত গঠন করা প্রয়োজন। কারণ জগন্নাথের শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশের সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। আমাদের জন্য এটা গর্বের বিষয়— যেখানেই যাই, জগন্নাথের কোনো না কোনো শিক্ষার্থী সেখানে পাওয়া যায় এবং জাতীয়ভাবে তারা প্রতিষ্ঠিত। এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমাদের অনেক সাবেক ছাত্রনেতা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, মিয়া নুরুদ্দিন অপু জাতীয় সংসদের হুইপ নির্বাচিত হয়েছেন, এ ছাড়া হামিদুর রহমান হামিদ, আনিসুর রহমান তালুকদার খোকন সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। এগুলো আমাদের জন্য একটি বড় পরিচয়। আমরা যদি অ্যালামনাই নেটওয়ার্ককে কাজে লাগাতে পারি, তাহলে এটি হবে আমাদের জন্য একটি বড় সাফল্য।  

অ্যালামনাই গঠন একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। আমি যখন শিক্ষার্থী সংশ্লিষ্ট কমিটির কনভেনার (আহ্বায়ক) ছিলাম তখনও এই বিষয়ে কাজ করেছি এবং অনেকদূর অগ্রসর হয়েছিলাম। আমাদের একটি কেন্দ্রীয় গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করতে হবে। 

বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা খাতে বাজেট বৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থীদের গবেষণায় সম্পৃক্ততা বাড়াতে কী ধরণের পদক্ষেপ নিচ্ছেন আপনি?
অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্‌দীন: এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রত্যেকেরই এ নিয়ে চিন্তা থাকা উচিত। বিশ্ববিদ্যালয় হলো শিক্ষা এবং গবেষণার স্থান। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের জাতীয় বাজেটে, বিশেষ করে ইউজিসি থেকে গবেষণার জন্য যে বরাদ্দ দেওয়া হয়, তা অত্যন্ত অপ্রতুল। তারপরও আমরা গবেষণায় শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দেওয়ার চেষ্টা করি এবং প্রণোদনা দেওয়ার চেষ্টা করি।

আমি নতুন ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছি, সামনে বাজেট আসছে, আমি গবেষণা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির চেষ্টা করব। এ ছাড়া শিক্ষামন্ত্রী এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টদেরও আমি উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করব। গবেষণায় বাজেট বৃদ্ধি ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়। আর গবেষণায় উন্নতি না হলে বিশ্ববিদ্যালয়কে সত্যিকার অর্থে ‘সেন্টার অফ এক্সিলেন্স’ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব নয়।

আমি আশাবাদী, আমাদের শিক্ষাবান্ধব সরকার, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গবেষণা খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। কারণ তিনি বিদেশে থেকে দেখেছেন কীভাবে উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা পরিচালিত হয়।

শিক্ষক নিয়োগে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রাধন্য দেওয়ার দাবির প্রসঙ্গে আপনার মতামত কী?
অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্‌দীন: শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে আমার মতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি থাকা উচিত। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মাধ্যমে ৩০-৩৫টি প্রজন্ম গড়ে ওঠে। সুতরাং তার যদি যোগ্যতা না থাকে, তাহলে সেই প্রজন্মগুলোর ক্ষতি হবে।

আমরা ছোটোবেলায় ভালো রেজাল্ট করলে স্বপ্ন দেখতাম— বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হব। কিন্তু বিগত ১৫-১৬ বছরে এই জায়গাটা সবচেয়ে বেশি ধ্বংস করা হয়েছে। যাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতাই নেই, এমন অনেককে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আমরা দেখেছি— ক্লাসে ৫৮ জনের মধ্যে ৫৮তম হওয়া, সেকেন্ড ক্লাস পাওয়া শিক্ষার্থীকেও শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এটা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সবচেয়ে বড় ক্ষতি।

বিগত সময়ে শিক্ষক নিয়োগে লিখিত এবং মৌখিক পরীক্ষা হয়েছে। আমি আমার সময়ে এই ক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করব। আমি অন্য কোনো কিছু বিবেচনায় আনব না, যার প্রকৃত যোগ্যতা আছে— তাকেই বিবেচনা করা হবে। লিখিত পরীক্ষা এবং মৌখিক পরীক্ষা তো থাকবেই, পাশাপাশি ডেমো ক্লাসও চালু করব। কারণ অনেক সময় দেখা যায়—ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট বা সেকেন্ড হলেও তার কথা বলায় জড়তা আছে, প্রেজেন্টেশন ভালো না— তাহলে সে ক্লাসে ভালো করতে পারবে না।

আমি চেষ্টা করব— যারা প্রভাব বিস্তার করতে পারে, তাদের সবাইকে বোঝাতে, এই জায়গায় যেন কোনো রাজনীতীকরণ না হয়। কারণ এটি একটি আমানত। এই আমানত রক্ষা করতে না পারলে জাতি এগোবে না, বিশ্ববিদ্যালয়ও এগোবে না। আগে দেখা গেছে— অনেক উপাচার্য তাদের নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের নিয়োগ দিয়েছেন।

৫ আগস্টের পর যে-সব নিয়োগ হয়েছে— ডাটা দেখলে বোঝা যাবে, আমি তখন শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে জগন্নাথের শিক্ষার্থীদের প্রাধান্য দেওয়ার চেষ্টা করেছি। এখন আমি ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্বে আছি। আমি বিশ্বাস করি, জগন্নাথকে জগন্নাথের শিক্ষার্থীরাই ধারণ করবে। তবে যেহেতু এটি শিক্ষকতার পেশা, যোগ্যতাই হবে প্রধান বিষয়।

জগন্নাথের শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, তবে সেটি অবশ্যই যোগ্যতার ভিত্তিতে। আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি— অযোগ্য কোনো ব্যক্তি আমার হাত দিয়ে নিয়োগ পাবে না।

প্রতিষ্ঠার পর থেকেই নানান সংকটে জর্জরিত জবি। পরিবহন ও ক্লাসরুম সংকট নিরসন, লাইব্রেরী ও নারী শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিশেষ কোনো পরিকল্পনা আছে কী?
অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্‌দীন: আমাদের এই বিশ্ববিদ্যালয়ে সমস্যার শেষ নেই। আবাসিক সুবিধা না থাকায় শিক্ষার্থীদের বাসের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু বাজেট স্বল্পতার কারণে পর্যাপ্ত পরিবহন সুবিধা নেই। আপনি যে অন্যান্য সুবিধার কথা বলেছেন— সেগুলোও সীমিত। আমরা একদিনে এসব সমস্যার সমাধান করতে পারব না।

আমি যোগদান করার পর থেকেই মতবিনিময় শুরু করেছি। চেয়ারম্যান, ডিন, বিভাগীয় প্রধান, ছাত্র সংগঠন, সাংবাদিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সাথে বসেছি। আগামীকাল শিক্ষকদের সাথে বসব। আমি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। সব সমস্যার একসাথে সমাধান সম্ভব নয়— আমরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সমস্যাগুলো নির্ধারণ করব এবং সমাধানের চেষ্টা করব।

আগামীতেও জকসু  নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন কী? ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর কার্যক্রম নিয়ে আপনার অবস্থান কী?
অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্‌দীন: আমি শিক্ষার্থী সংশ্লিষ্ট কমিটির কনভেনার হিসেবে এক মাস ১৩ দিনের মধ্যে জকসুর নীতিমালা প্রণয়ন করেছি। ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশোধন কমিটিতেও আমি ছিলাম। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে জকসু বাস্তবায়িত হয়েছে, এটি একটি বড় অর্জন। এটি গণতান্ত্রিক ধারা, এটি অব্যাহত থাকবে। সভাপতি হিসেবে আমি গঠনমূলক কাজ করার চেষ্টা করব।

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে আমরা উৎসাহ দেব এবং পৃষ্ঠপোষকতা করব। তবে তাদের একটি কাঠামোর মধ্যে থাকতে হবে। অনেক সংগঠন আছে, যাদের কোনো গঠনতন্ত্র নেই, কার্যক্রম নেই— এসব গ্রহণযোগ্য নয়। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি— প্রত্যেক সংগঠনকে তাদের গঠনতন্ত্র ও গত পাঁচ বছরের কার্যক্রম জমা দিতে হবে। যারা ভালো কাজ করবে— তাদের সহযোগিতা করা হবে। নামসর্বস্ব সংগঠন বন্ধ করা হবে।

বিগত প্রশাসনের সময় আপনি নিজেও হেনস্তা শিকার হয়েছিলেন। বিভিন্ন সময়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ও হেনস্তায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কী?
অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্‌দীন: এটি সত্য ঘটনা, আমি হেনস্তার শিকার হয়েছিলাম এবং এটি একটি সাজানো ঘটনা ছিল। আমি নিয়ম মেনে আবেদন করেছিলাম, কিন্তু সেটি গোপন রাখা হয়েছিল এবং আমাকে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। এতে আমার সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছে। আমি আইনি লড়াই করেছি— হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত। সাত বছর সংগ্রামের পর আমি ন্যায়বিচার পেয়েছি। আমার বাসা ভাঙচুর হয়েছে, মামলা দেওয়া হয়েছে— সবকিছুকে আমি পরীক্ষার অংশ হিসেবে নিয়েছি। আমি ব্যক্তিগতভাবে সবাইকে ক্ষমা করে দিয়েছি।

আমি কোনো ব্যক্তিগত সুবিধা দাবি করিনি— গ্রেড, বকেয়া কিছুই চাইনি। আমার কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি, আমরা এখন স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারছি। তবে কেউ যদি অন্যায়ের শিকার হয়ে অভিযোগ করে এবং তা প্রমাণিত হয়— তার বিচার অবশ্যই হবে। আমরা সবাইকে নিয়ে এগোতে চাই। মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু অত্যাচার গ্রহণযোগ্য নয়। অপরাধীদের প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না— এতে তারা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপনার বার্তা কী?
অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্‌দীন: বিশ্ববিদ্যালয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীরা আছে বলেই আমরা শিক্ষক। শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। এখানে কোনো দলমত নেই, শিক্ষার্থী মানেই শিক্ষার্থী।

ধন্যবাদ আপনাকে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে দীর্ঘ সময় দেওয়ার জন্য
অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্‌দীন: আপনাদেরও অসংখ্য ধন্যবাদ। দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস ‘শিক্ষাঙ্গন ও ক্যাম্পাস নিয়ে কাজ করে, তারা আমাদের নিয়ে আরও বেশি কাজ করবে এটাই প্রত্যাশা।