২২ মার্চ ২০২৬, ২২:১৩

‘ঈদের নতুন জামা লুকিয়ে রাখতাম’

অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ারুল আজীম আখন্দ  © টিডিসি সম্পাদিত

ঈদুল ফিতর মুসলিম জীবনে আনন্দ, সম্প্রীতি ও আত্মিক প্রশান্তির এক বিশেষ উপলক্ষ। তবে সময়ের প্রবাহে এই উৎসবের রূপ ও অনুভূতিতে আসে নানা পরিবর্তন- শৈশবের সরল উচ্ছ্বাস ধীরে ধীরে জায়গা করে দেয় দায়িত্বময় বাস্তবতাকে। এই বদলে যাওয়া ঈদের অভিজ্ঞতা, শৈশবের স্মৃতি ও বর্তমানের প্রেক্ষাপট নিয়ে কথা বলেছেন মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (মাভাবিপ্রবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ারুল আজীম আখন্দ, যেখানে উঠে এসেছে সময়, অনুভূতি ও দায়িত্বের এক সমন্বিত প্রতিচিত্র। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসের মাভাবিপ্রবি প্রতিনিধি ইসরাত জাহান আশা

আপনার শৈশবের ঈদ আর বর্তমানের ঈদের মধ্যে প্রধান পার্থক্যগুলো কী কী?
অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ারুল আজীম আখন্দ: বর্তমান ঈদের সাথে আমাদের শৈশব জীবনের ঈদের কিছু মৌলিক পার্থক্য আছে। আমাদের পরিবারটি ছিল ঢাকার অত্যন্ত সাধারণ পরিবারের একটি। আমার বাবা ছিলেন একজন স্কুল শিক্ষক। আমরা ছিলাম সাত ভাইবোন। সেই সময় আমাদের অত প্রাচুর্য ছিল না, আমরা খুব কষ্টে বড় হয়েছি। তাই ঈদে আমরা আশায় থাকতাম খুব সাধারণ মানের একটি নতুন জামা, একটা নতুন জুতা পাওয়ার অর্থাৎ বাবা মায়ের কাছ থেকে একটি উপহার পাবো আর সেগুলো পরিধান করে ঈদের নামাজে যাবো সেই আশাতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম। উপহারগুলো পেয়ে আমরা যে পরিমাণ আনন্দিত হতাম তা আসলে ভাষায় অপ্রকাশ্য।  

তবে উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর থেকে দায়িত্বের পরিধি বেড়ে যাওয়ায় ঈদের দিনগুলো অনেকটাই ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে কাটে। দেখা যায় ছুটির দিনেও আমার ক্যাম্পাস নিয়ে চিন্তা থাকে, ঢাকায় থাকলেও আমি প্রক্টর, ডিনবৃন্দ, শিক্ষার্থী কল্যাণ ও পরামর্শদান কেন্দ্র পরিচালক কিংবা দায়িত্বরত অন্য কারো কাছ থেকে ক্যাম্পাসের সার্বিক পরিস্থিতি বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করি। এরকম নানা ধরনের কাজের চাপে আসলে পরিবারকেও এখন আর আগের মত ওতো সময় দিয়ে উঠতে পারি না। কিন্তু তবুও ঈদের আনন্দটা আমি পরিবারকে সাথে উপভোগ করি। হয়তো ঈদ উদযাপনের রূপ বদলেছে কিন্তু আনন্দ কমে নাই। আসলে কি শৈশবে ঈদ আনন্দ বা উদযাপন ছিল অনেকটাই একক কিন্তু বর্তমানের এই আনন্দটা হলো সামষ্টিক। আমি চাই, সকলেই ঈদের এই আনন্দটুকু তাদের পরিবার- প্রিয়জনের সাথে নিরাপদে ও স্বাচ্ছন্দ্য ভাগাভাগি করে নিক।

আপনার জীবনের স্মরণীয় কোনো ঈদের ঘটনা কি আমাদের সাথে শেয়ার করবেন?
অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ারুল আজীম আখন্দ: হ্যাঁ, অবশ্যই। একটি স্মরণীয় ঘটনা এমন- ঈদ তো দেশে পরিবারের সাথে  একরকম কাটে কিন্তু একটা সময় পর যখন আমরা বিদেশে পিএইচডি করতে যাই তখন ঈদটা আবার কাটে ভিন্নরকম। আমি আমার পিএইচডি করতে গিয়েছিলাম নাগয়া ইউনিভার্সিটির স্কুল অব মেডিসিন, জাপান-এ। আমরা জানি, জাপান একটি অমুসলিম দেশ। জাপানিরাও জানেন যে তাদের ওখানে আমাদের মুসলিম কমিউনিটি আছে যারা দীর্ঘ একমাস সাওম পালন করার পর ঈদ উদযাপন করেন, তো সেখানে যাওয়ার পর যখন প্রথম ঈদ এলো তখন মনে হলো কোথায় ঈদ উদযাপন করতে যাব? কোনো বন্ধ নেই আমাদের ল্যাবেরেটরিতে কাজ তো প্রফেসরের সাথে যোগাযোগ করে তাকে বললাম আমাদের ঈদের বিষয়ে, তিনি জানালেন যে -যাও তোমরা ঈদের নামাজ পড়ে আবার চলে এসো। তো আমরা সকালে সাদামাটা ভাবেই ল্যাব থেকে বের হয়ে ঈদের জামাতে অংশ নিতাম এবং নামাজ শেষ করে আবার ল্যাবে ফিরে আসতাম, বেশ ব্যস্ততায় সারাদিন কাটলেও সন্ধ্যায় আমাদের মুসলিম কমিউনিটির একটা পার্টির আয়োজন থাকত। সেখানে সব ফ্যামিলির পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধরনের আইটেম থাকত। সেগুলো সবাই মিলে ভাগ করে খেয়ে আমরা গল্প আড্ডায় সময় পার করতাম।

ঈদের জামা কিনে কাউকে আগেই না দেখানো,নতুন টাকার সালামী, ঈদ কার্ড পুরোনো আর যেসব রীতি রেওয়াজ ছিল সেসব আপনার কেমন লাগত এখন কি আপনার কাছে ওসবের অভাব অনুভূত হয়?
অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ারুল আজীম আখন্দ: খুব অল্প বয়সে আমরাও ঈদের নতুন জামা লুকিয়ে রাখতাম। আর আমাদের সব ভাইদের মধ্যে আমি বড় তাই আগে যখনই আমি জাপান থেকে আসতাম তখনই আমার পুরো পরিবার, সকল আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধবের জন্য উপহার আনতাম, সেগুলো পেয়ে সবাই অনেক খুশি হতেন। এখনতো আমি দেশেই আছি তাই এই বিষয়টিকে ঘিরে অনেক পরিবর্তন এসেছে। এখন দেখা যায় সবাইকে উপহার অথবা টাকা পাঠাচ্ছি। আর ব্যস্ততার জন্য আমি কেনাকাটা থেকে দূরে থাকলেও আমার জন্য আমার স্ত্রী এবং মেয়ে শার্ট বা পাঞ্জাবিসহ যাবতীয় আর যা যা লাগে কেনেন। 

আসলে বর্তমানে আমরা কেনাকাটা করে সবাইকে সেটি দেখাই, সেই আনন্দ সবাই ভাগাভাগি করে নেই। আবার আজকাল তরুণদের মধ্যে অনেকে কেনাকাটা শেষে বা উপহার পাবার পর সেই আনন্দ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতেও প্রকাশ করে থাকেন যেটি আমাদের সময়ে সম্ভব ছিল না। 

ঈদে এমন কোনো খাবার বা কাজ বা অভ্যাস আছে যেটি না করা হলে আপনার কাছে ঈদ ঈদ মনে হয় না?
অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ারুল আজীম আখন্দ: আগে ঈদে আমাদের বাড়িতে দুধ সেমাই করত। কখনো কখনো লাচ্ছা সেমাই বা ক্ষীর-পায়েশ থাকত। তো ঈদের সকালে সেই ছেলেবেলা থেকেই আমরা এই খাবার গুলো খেয়ে বড় হয়েছি। এসবের পাশাপাশি আমার আম্মু পোলাও করত, মাংসের রেজালা করত, রোস্ট কখনো করত কখনো করত না, মুরগির মাংসের কোরমা করত। তারপর যখন সংসার আরেকটু বড় হলো তখন চটপটিও করত। তবে এখন আবার প্রতি ঈদে আমার স্ত্রী দুধ সেমাই, বা লাচ্ছা সেমাই, পোলাও, রোস্ট, গরুর রেজালা, কাবাব; আবার কখনো পরোটা মাংসসহ আরো নানান খাবার তৈরি করেন। কাজেই এখন আমার খাওয়ার থেকেও আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো আমার মেয়ে কি খেলো, আমার স্ত্রী কি খেলো। আবার যখন দেশের বাইরে ছিলাম তখন আমিও কিন্তু রান্না করেছি, রান্নায় আমার স্ত্রীকে সাহায্য করেছি। 

ঈদের এই ছুটির পর বিশ্ববিদ্যালয় খোলার সাথে সাথে নতুন কোনো বিশেষ প্রজেক্ট বা একাডেমিক পরিবর্তনের পরিকল্পনা কি আপনার আছে?
অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ারুল আজীম আখন্দ: আমরা ইউনিভার্সিটি সম্প্রসারণ নিয়ে একটা ভিজিবিলিটি স্টাডি করছি। সেটিতে আরো হল থাকবে, একাডেমিক ভবন থাকবে, বড় বড় ভবনের এলিভেশনসহ আরও নানাকিছু। এটি আসলে অনেক বড় একটি প্রজেক্ট -যেটি নিয়ে আমরা কাজ করছি। এছাড়াও ৫০ কোটি টাকার আরেকটি বাজেট ল্যাবরেটরি সম্প্রসারণ ও ল্যাবের সরঞ্জাম বৃদ্ধি নিয়ে কাজ করা হয়েছে। এগুলো যদি আমরা পেয়ে যাই তবে তা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যে এক যুগান্তকারী আলোড়ন এবং পরিবর্তন বয়ে আনবে বলে মনে করি। এছাড়াও বিভিন্ন র‍্যাংকিং এ কীভাবে মাভাবিপ্রবিকে আরও উপরের দিকে আনা যায় সেটি নিয়েও র‍্যাংকিং বিষয়ক কমিটিকে নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী-কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য আপনার বিশেষ কোনো ঈদ বার্তা? 
অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ারুল আজীম আখন্দ: অবশ্যই, ঈদ বার্তা হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীসহ, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ক্লাব ও  সকল সাংবাদিক প্রতিনিধিদের পাশাপাশি সমগ্র দেশবাসীকে ঈদের আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই। আমি প্রত্যাশা করি, সকলে যেন আনন্দ, শান্তি ও সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে ঈদ উদযাপন করেন এবং পরিবার ও প্রিয়জনদের সঙ্গে এই বিশেষ মুহূর্তগুলো উপভোগ করেন। একইসঙ্গে উদযাপনকে ঘিরে সকলের নিরাপত্তা ও সচেতনতা প্রত্যাশা করি, সকলেই নিরাপদে আবার ঈদ উদযাপন শেষে আমাদের মাঝে সুস্থ-সবল ফিরে আসুক এই কামনা। ঈদ মোবারক।