‘সালামি হিসেবে আট আনা পেলেই আমরা অনেক খুশি হয়ে যেতাম’
ঈদ মুসলমানদের শ্রেষ্ঠ উৎসব। সময়ের পরিক্রমায় ঈদ উদযাপনের ভিন্নতা দেখা যায়। প্রবীণ ব্যক্তিদের কাছে ঈদের স্মৃতিচারণ ও উপলক্ষ্য উৎসবের অংশ। এ কারণে সেরা এই দিনের স্মৃতিতে আছে ব্যক্তিভেদে বৈচিত্র্যতা। শত বছরের বেশি পুরোনো ঐতিহ্যবাহী ঢাকা কলেজ অধ্যক্ষ অধ্যাপক এ কে এম ইলিয়াস ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। গুণী এই ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসের ঢাকা কলেজ প্রতিনিধি ওয়ালিদ হোসেন—
ঈদ অর্থ আনন্দ, সবার মাঝে খুশি ভাগ করে নেওয়া। রমজান থেকে আত্মশুদ্ধি ও আত্মসংযমের শিক্ষার পর আসা এই ঈদের মূল উদ্দেশ্য আসলে কতটা হাসিল হয়?
অধ্যাপক এ কে এম ইলিয়াস: রমজান থাকে এক মাস। তবে এটা আমাদের আত্মশুদ্ধি চর্চার যে পথ দেখায়, সেটা যদি আমরা সারা বছর মেনে চলি; তাহলে সমাজ থেকে অনাচারগুলো দূর হয়ে যাবে। তাই আমাদের বেঁচে থাকার জন্য ধর্মীয় অনুশাসনগুলো সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। কারণ একা বেঁচে থাকা নয়, সমাজের সবাইকে নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে। সমাজ থেকে অনাচার দূর করা খুবই প্রয়োজন। সেজন্য আমরা যদি সকলেই ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে চলি; তাহলে আমাদের সমাজ ও দেশ অবশ্যই সুন্দর হবে।
ছোটবেলায় ঈদ সালামি পেতেন; এখন নিশ্চয়ই দিতে হয়। কোনটি বেশি আনন্দের?
অধ্যাপক এ কে এম ইলিয়াস: ঈদে সালমি দেওয়া ও নেয়া দুইটার মধ্যেই আনন্দ রয়েছে। আমরা বলি যে পাওয়ার মধ্যে আনন্দ, আসলে সালামি দেওয়ার মধ্যেও আনন্দ রয়েছে। আর সালামি দেওয়া ও নেওয়ার মধ্যে দুই রকমের আনন্দ রয়েছে। আর আবেগের যে বিষয়টা তা হলো বাচ্চারা অনেক সময় গিফট না পেলে আবেগে নানান ঘটনা ঘটিয়ে ফেলে। এগুলো অনেক সময় বিপদের কারণ হয়। আমাদের সন্তুষ্টির জায়গাটা ঔ রকম হওয়া উচিত। সামর্থ্য অনুযায়ী যখন অভিভাবক দেয় সেটার মধ্যে একটা সন্তুষ্টি থাকে। আর প্রত্যাশা যদি আকাশচুম্বী হয়; আর প্রাপ্তিটা যখন কম হয় তখন তাদের সে কষ্টটা অনেক বেড়ে যায়। সেজন্য সন্তুষ্টি মানুষের জন্য খুব বড় ব্যাপার যেটি জীবনের জন্য খুবই প্রয়োজন।
আপনার শৈশবের ঈদ নিয়ে জানতে চাই। কেমন ছিল ওই সময়গুলো? পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো এমন কোনো বিশেষ স্মৃতি কিনা; যেটা বেশি মনে পড়ে।
অধ্যাপক এ কে এম ইলিয়াস: ছোটোবেলায় ঈদের উপচে পড়া আনন্দ দেখতাম। মা-বাবার কাছ থেকে কোন উপহার পাওয়া; অর্থাৎ জামাকাপড় পাওয়ার প্রতি আলাদা একটা আকর্ষণ ছিল; যা আনন্দের মাত্রা অনেকগুণ বাড়িয়ে দিত। ঈদের মুহূর্তগুলো এমন ছিল যে, ঈদের দিন সকালবেলা উঠে সূর্য ওঠার আগে ফজরের নামাজ পড়ে ওইসময় যারা বন্ধু-বান্ধব বা প্রতিবেশি ছিল; তাদের সাথে পুকুরে গিয়ে গোসল করার মধ্যে আলাদা একটা আনন্দ ছিল। একসাথে ঈদের জামায়াতে যাওয়া। আমাদের সময় জামায়াত হতো বড় মাঠে, এখন তো মাঠের অভাবের কারণে বেশিরভাগ জায়গায় মসজিদে পড়া হয়।
আগের ঈদ ছিল পাওয়ার বিষয়; এখনকার দিনের ঈদ হলো দেওয়ার। কারণ তখন আমরা ছোট ছিলাম, তখন ঈদের দিনে ফান্টা খাওয়া জরুরী ছিল, তখন ফান্টার দাম ছিল দশ পয়সা, এখন তো বাজারে বিভিন্ন ধরনের ড্রিংকস আসছে। সালামিতে আমরা আট আনা পেলেই অনেক খুশি হতাম। এখন তো বাচ্চাদের পঞ্চাশ-একশ টাকা দিলেও নিতে চায় না।
আগের ঈদ আর বর্তমানের ঈদ, পার্থক্য কী খুঁজে পান?
অধ্যাপক এ কে এম ইলিয়াস: আগের ঈদ ছিল পাওয়ার বিষয়; এখনকার দিনের ঈদ হলো দেওয়ার। কারণ তখন আমরা ছোট ছিলাম, তখন ঈদের দিনে ফান্টা খাওয়া জরুরী ছিল, তখন ফান্টার দাম ছিল দশ পয়সা, এখন তো বাজারে বিভিন্ন ধরনের ড্রিংকস আসছে। সালামিতে আমরা আট আনা পেলেই অনেক খুশি হতাম। এখন তো বাচ্চাদের পঞ্চাশ-একশ টাকা দিলেও নিতে চায় না, এ রকম অবস্থা। কারণ এখন মূল্যমানের কারণে টাকার মান অনেক বেড়ে গেছে। সেজন্য বাচ্চাদের চাওয়াটাও বেশি থাকে। আরেকটা বিষয় ছিল ঈদের দিন প্রতিবেশি-আত্মীয় স্বজনদের বাড়িতে বেড়ানো খাওয়ার মধ্যে একটা মজা ছিল। এখন মানুষ অনেকটাই যান্ত্রিক হয়ে গেছে। কষ্ট করে কারও বাড়িতে যাওয়া আমরা এখন ভুলে গেছি। দল ধরে পাঁচ-সাত জন, এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি যাওয়ার একটা ব্যাপক প্রচলন ছিল। এটা ইদানীং কম, তবে কিছু জায়গা আছে যেমন- বিভিন্ন সরকারি কোয়ার্টারের মধ্যে কিছুটা বন্ডিং তৈরি হচ্ছে।
ঈদের কোন মুহূর্ত বা আয়োজন আপনার জন্য সবচেয়ে আনন্দের? এর সঙ্গে জানতে চাই, সাধারণত ঈদের দিন কী ধরনের আয়োজনে অংশ নেন।
অধ্যাপক এ কে এম ইলিয়াস: ঈদের দিন সবচেয়ে বেশি আনন্দের মুহূর্ত হলো গায়ে আতর লাগিয়ে নামাজে যাওয়া, তারপর নামাজ শেষে সবার সাথে কোলাকুলি করা। এখন নাগরিক জীবনে আমাদের কর্মব্যস্ততার কারণে অনেক পরিবর্তন এসেছে। আমাদের ছোটোবেলার স্মৃতিগুলো মনে করলে মনে হয় সেটা অনেক বেশি আনন্দের ছিল। তারপরও আমরা সেগুলোকে মাথায় রেখেই চলি, কিন্তু সবকিছু ফিরে পাওয়া কঠিন। আর ঢাকা শহরে জনসংখ্যা এতো পরিমাণ বেড়েছে, সেই পরিমাণ মাঠ নেই। আবার আবহাওয়াও একটা ফ্যাক্টর কারণ হলো বর্ষা যখন থাকে তখন মাঠে নামাজ পড়া যেত না। সেক্ষেত্রে মসজিদই নামাজ পড়তে হতো। মাঠে ঈদের জামায়াতে নামাজ আদায় করার আনন্দটাই আলাদা।
রমজান থাকে এক মাস। তবে এটা আমাদের আত্মশুদ্ধি চর্চার যে পথ দেখায়, সেটা যদি আমরা সারা বছর মেনে চলি; তাহলে সমাজ থেকে অনাচারগুলো দূর হয়ে যাবে। তাই আমাদের বেঁচে থাকার জন্য ধর্মীয় অনুশাসনগুলো সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
ঈদ। এই শব্দটা প্রথমে কোন দৃশ্যটা সর্বপ্রথম চোখে ভেসে ওঠে?
অধ্যাপক এ কে এম ইলিয়াস: ঈদ মানেই তো আনন্দ। আর এই আনন্দের পাশাপাশি সবার সাথে পারস্পরিক সম্পর্ক বৃদ্ধি করা। আনন্দ ভাগাভাগি করার জন্য সবার সাথে আত্মীক সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। এজন্য প্রয়োজন সবার সাথে যোগাযোগ ও সামাজিক রীতিনীতি মেনে চলা।
ঈদ মানে আপনার কাছে কি কেবল আনন্দ, নাকি আত্মমুল্যবোধ ও মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গঠনের সময়ও?
অধ্যাপক এ কে এম ইলিয়াস: আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সকলের জন্যই যেটা দরকার তা হলো ধর্মীয় ও সমাজিক রীতিনীতিগুলো মেনে চলা। ধর্মীয় অনুষ্ঠানের বাহিরে কিছু অনুষ্ঠান রয়েছে; যেমন- স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, শহীদ দিবস; এগুলো আমাদের জাতীয় জীবনের একটা অংশ। সেগুলোও যদি আমরা মন থেকে পালন করি, তার মধ্যেও আনন্দ থাকে। তাই সবার মধ্যে সামাজিক বন্ধন বৃদ্ধির জন্য ঈদের পাশাপাশি এই জাতীয় দিবসগুলো পালন করা, তাহলে সবার মধ্যেই একটা সুসম্পর্ক গড়ে উঠবে।