০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২২:৪৯

এআই দিয়ে ভবনের কাঠামোগত শক্তি নির্ণয়ে ৯৯ শতাংশ নির্ভুলতা, যুক্তরাষ্ট্রে পুরস্কৃত বাংলাদেশি গবেষক

এআই দিয়ে ভবনের কাঠামোগত শক্তি নির্ণয়ে ৯৯ শতাংশ নির্ভুলতা, যুক্তরাষ্ট্রে পুরস্কৃত বাংলাদেশি গবেষক  © সংগৃহীত

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে জটিল রিইনফোর্সড কংক্রিট কাঠামোর শক্তি, অভ্যন্তরীণ বলের প্রবাহ ও কাঠামোগত আচরণ প্রায় ৯৯ শতাংশ নির্ভুলভাবে পূর্বানুমান করার এক যুগান্তকারী গবেষণার প্রদর্শনীতে বিশেষ স্বীকৃতি পেয়েছেন বাংলাদেশি প্রকৌশলী ও পিএইচডি গবেষক মো. ফেরদৌস ওয়াহিদ।

একটি বিশাল ভবনে বা ব্রিজে সাধারণ বিম ও কলাম ছাড়াও অনেক জটিল অংশ থাকে (যেমন—ডিপ বিম, পাইল ক্যাপ ইত্যাদি), যেখানে ভেতরের বলের প্রবাহ বা স্ট্রেস বোঝা খুবই কঠিন। ফেরদৌস ওয়াহিদ এমন কিছু এআই মডেল তৈরি করেছেন, যা এই জটিল অংশগুলোর লোড বহনক্ষমতা প্রায় ৯৯ শতাংশ এবং ভেতরের রেসপন্স ফিল্ড প্রায় ৯৮ শতাংশ নির্ভুলভাবে আগে থেকেই বলে দিতে পারে। 

এর স্বীকৃতিস্বরূপ যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান দ্য ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির (ওএসইউ) ডিপার্টমেন্ট অব সিভিল, এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওডেসিক ইঞ্জিনিয়ারিং (সিইজিই) আয়োজিত গ্র্যাজুয়েট রিসার্চ এক্সপো-২০২৬-এ ফেরদৌস ওয়াহিদকে তার গবেষণা প্রদশর্ণীর জন্য ‘মোস্ট কমপেলিং প্রজেক্ট অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করা হয়।

গত ৩০ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের নোলটন হলে আয়োজিত গবেষণা প্রদর্শনীতে তাঁর পিএইচডি গবেষণা ‘AI-Driven Structural Performance Prediction for Reinforced Concrete Members with Discontinuities’ এই স্বীকৃতি লাভ করে। নিজস্ব গবেষণাক্ষেত্রে তাৎপর্য, মৌলিকত্ব এবং ভবিষ্যৎ কার্যকারিতার বিচারে এটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিবেচিত হয়। এবারের প্রদর্শনীতে ৩০টি গবেষণা পোস্টারের মধ্য থেকে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও গবেষকদের প্রত্যক্ষ ভোটে ‘পিপলস চয়েজ এওয়ার্ড’ বিভাগে এই পুরস্কার অর্জন করেন তিনি।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ছোঁয়া কাঠামোগত প্রকৌশলে

ফেরদৌস ওয়াহিদের পিএইচডি গবেষণার মূল বিষয় ছিল আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) ব্যবহার করে জটিল রিইনফোর্সড কংক্রিট কাঠামোর শক্তি, অভ্যন্তরীণ বলের প্রবাহ, স্ট্রেস ডিস্ট্রিবিউশন এবং কাঠামোগত আচরণ নিখুঁতভাবে পূর্বানুমান করা। সাধারণ বিম বা কলামের তুলনায় ডিপ বিম, করবেল, পাইল ক্যাপ কিংবা বিম-কলাম জয়েন্টের মতো ‘ডি-রিজিয়নস’ বা জটিল অংশগুলোর ভেতরের বলের প্রবাহ অত্যন্ত জটিল হয়। তাঁর গবেষণায় বিকশিত এআই মডেলগুলো ডিপ বিমের লোড বহনক্ষমতা পূর্বানুমানে প্রায় ৯৯ শতাংশ এবং কংক্রিটের অভ্যন্তরীণ রেসপন্স ফিল্ডের চিত্রভিত্তিক পূর্বানুমানে প্রায় ৯৮ শতাংশ পিক্সেল-লেভেলের নির্ভুলতা অর্জন করেছে।

আন্তর্জাতিক সফটওয়্যার উন্নয়নে অবদান

এই গবেষণার অংশ হিসেবে তিনি আন্তর্জাতিক ইঞ্জিনিয়ারিং সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান IDEA StatiCa-এর সঙ্গে ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষণা সহযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। সফটওয়্যারটির কম্প্যাটিবল স্ট্রেস ফিল্ড মেথড-এর ভেরিফিকেশন, টেকনিক্যাল অসংগতি দূরীকরণ এবং আমেরিকান কনক্রিট ইনস্টিটিউট-এর ACI 318 ডিজাইন কোডের সামঞ্জস্য উন্নয়নে কাজ করেছেন তিনি।

বিশ্বব্যাপী ১১৭টিরও বেশি দেশে লাখো প্রকৌশলী কর্তৃক ব্যবহৃত এই সফটওয়্যারে অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ IDEA StatiCa তাদের জনপ্রিয় সংকলনে ওএসইউ-এর এই গবেষণাটিকে সবার প্রথমে স্থান দিয়েছে।

একের পর এক অর্জন ও ফেলোশিপ

এটি ফেরদৌস ওয়াহিদের প্রথম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নয়। এর আগে ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন অব ওহাইও তাঁকে মর্যাদাপূর্ণ ‘গ্র্যাজুয়েট এডুকেশন এওয়ার্ড’ প্রদান করে। এছাড়া ওএসইউ-এর সিভিল, এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওডেসিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে তাঁকে পরপর দুই বছর (২০২৫-২০২৬ এবং ২০২৬-২০২৭ শিক্ষাবর্ষে) একমাত্র শিক্ষার্থী হিসেবে প্রেসিডেন্সিয়াল ফেলোশিপের জন্য মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। পিএইচডি পর্যায়ের সব কোর্সে তাঁর ঝুলিতে রয়েছে সর্বোচ্চ ৪.০০ জিপিএ। তাঁর তৈরি ম্যাথক্যাড ও পাইথন-ভিত্তিক প্রোগ্রামিং ও বিশ্লেষণ কোড বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কোর্সে শিক্ষণ-সহায়ক উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

বাংলাদেশের তরুণদের জন্য স্বপ্ন দেখছে ‘Strumetrix’

উন্নত বিশ্বের আধুনিক প্রযুক্তি ও গবেষণার সুফল যেন বাংলাদেশের তরুণ প্রকৌশলী ও ক্ষুদ্র কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠানগুলোও সহজে পেতে পারে, সেই লক্ষ্য নিয়ে সম্প্রতি তিনি Strumetrix নামের একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছেন।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে মো. ফেরদৌস ওয়াহিদ বলেন, ‘আমার উদ্দেশ্য বিদ্যমান উন্নত প্রকৌশল সফটওয়্যারগুলোর বিকল্প হিসেবে শুধু আরেকটি সফটওয়্যার তৈরি করা নয়; বরং গবেষণার মাধ্যমে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের এমন কিছু কার্যকর প্রযুক্তি তৈরি করা, যা প্রকৌশলীদের কাজকে আরও সহজ, দ্রুত ও সাশ্রয়ী করে তুলবে। বিশেষ করে বাংলাদেশের তরুণ প্রকৌশলী, শিক্ষার্থী এবং ছোট কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠানগুলো যেন উন্নত প্রযুক্তির সুবিধা পেতে পারে, সেটি আমার অন্যতম লক্ষ্য।’

Strumetrix-এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে এআই-অ্যাসিস্টেড স্ট্রাকচারাল অ্যানালিসিস, ডিজাইন অটোমেশন এবং ভূমিকম্প-প্রতিরোধী নকশা উন্নয়নে আরও বৃহৎ পরিসরে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে এই কৃতি গবেষকের। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অর্জিত এই জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা একদিন দেশের কল্যাণে পুরোপুরি কাজে লাগাতে চান তিনি।