কুয়েটের গবেষণায় বর্জ্য থেকে মিলছে জ্বালানি তেল
চারপাশে প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য। বাসাবাড়ি থেকে শুরু করে শিল্পকারখানা—সবখানেই প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে নানা ধরনের বর্জ্য, যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ। এবার সেই বর্জ্যকে কাজে লাগিয়ে জ্বালানি তেল উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছেন খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) একদল গবেষক।
কুয়েটের গবেষকরা বর্জ্যের সঙ্গে ধানের তুষ ও কাঠের গুঁড়া মিশিয়ে জ্বালানি তেল উৎপাদন করেছেন। গবেষকদের দাবি, উৎপাদিত বায়ো-ক্রুডে ৫০ শতাংশের বেশি ডিজেল পাওয়া গেছে। বর্জ্য থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদনের এ গবেষণায় ইতোমধ্যে ২০টির বেশি গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনের এ গবেষণা প্রায় ১০ বছর আগে শুরু করেন কুয়েটের একদল গবেষক। প্রায় এক বছর আগে সরকারের পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি রিসার্চ কাউন্সিলের সহায়তায় গবেষণাটিতে প্রাথমিক সফলতা আসে। কুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. খালেকুজ্জামানের অধীনে গবেষণাটি পরিচালিত হচ্ছে।
গবেষণায় হাইড্রোথার্মাল লিকুইফ্যাকশন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। এ প্রযুক্তিতে বর্জ্য শুকানোর প্রয়োজন হয় না। উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপে বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে উৎপাদন করা হয় বায়ো-ক্রুড। গবেষকদের দাবি, উৎপাদিত বায়ো-ক্রুডে ৫০ শতাংশের বেশি ডিজেল রয়েছে। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে দেশের আমদানিনির্ভর ডিজেলের প্রায় ৩০ শতাংশ চাহিদা পূরণ করা সম্ভব বলে দাবি করেছেন তারা।
গবেষকদের তথ্যমতে, বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের জন্য তিন টন সক্ষমতার একটি প্ল্যান্ট স্থাপনে প্রায় ৮০ থেকে ১২০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। বিনিয়োগের পর এক বছরের মধ্যে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়া সম্ভব বলেও জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে কুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. খালেকুজ্জামান বলেন, আমাদের এরকম একটি প্রকল্প ইতোমধ্যে সফল হয়েছে। আমাদের ক্রুড অয়েলে ৫০ শতাংশের বেশি ডিজেল সমৃদ্ধ। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে আমদানির প্রায় ৩০ শতাংশ চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। আমাদের এই প্রযুক্তি ইতোমধ্যে বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। এই প্রযুক্তির ওপর ২০টির বেশি গবেষণাপত্র কিউ-ওয়ান (Q1) জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
কুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাছুদ বলেন, ‘আমাদের দেশে এ ধরনের কিছু গবেষণা ও উদ্ভাবন রয়েছে। কিন্তু দেখা যায়, এগুলো আমাদের ল্যাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কারণ নিয়মিত উৎপাদনের পর্যায়ে আনতে যে অর্থনৈতিক ও লজিস্টিক সহায়তার প্রয়োজন হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে তা বহন করা সম্ভব হয় না। এখন এটিকে যদি সরকার অর্থনৈতিকভাবে সহায়তা করে, তাহলে দেশের উপকার হবে।’
গবেষকরা মনে করছেন, এ প্রযুক্তির মাধ্যমে শুধু ডিজেল নয়, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনও উৎপাদন করা সম্ভব। ফলে যে বর্জ্য বর্তমানে পরিবেশের জন্য সমস্যা তৈরি করছে, সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে সেটিই ভবিষ্যতের জ্বালানি উৎপাদনের কাঁচামাল হিসেবে কাজে লাগতে পারে।