১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৬:২৭

কথা বলতে না পারা শিশুদের কন্ঠ হবে ‘ভয়েস অ্যাসিস্ট’

কথা বলতে না পারা শিশুদের কন্ঠ হবে ‘ভয়েস অ্যাসিস্ট’  © টিডিসি ছবি

একটি শিশু পানি চাইছে, ক্ষুধা পেয়েছে, ব্যথা করছে কিংবা টয়লেটে যেতে চাইলেও তা সে বলতে পারছে না। নিজের প্রয়োজন বোঝাতে কখনো ইশারা, কখনো কান্না, কখনো অস্বস্তিকর আচরণই তার একমাত্র ভরসা। শিক্ষক কিংবা অভিভাবককে অনুমান করে বুঝতে হয়, আসলে সে কী বলতে চাইছে।

এই যোগাযোগের বাধা কাটাতেই এবার বাংলায় কথা বলার প্রযুক্তি নিয়ে এসেছে মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এমআইএসটি)। ‘ভয়েস অ্যাসিস্ট’ নামের এই ডিভাইসে একটি শিশু ছবি বা প্রতীকে ট্যাপ করলে সেটি বাংলায় তার হয়ে কথা বলবে।

রাজধানীর নভোথিয়েটারে আয়োজিত ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬-এ প্রদর্শিত হচ্ছে এই ‘ভয়েস অ্যাসিস্ট’। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের যোগাযোগ ও শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রযুক্তিনির্ভর একটি কমপ্যাক্ট সমাধান হিসেবে এটি তৈরি করা হয়েছে। শিশুর দৈনন্দিন প্রয়োজন জানানোর পাশাপাশি এতে শিক্ষামূলক বিভিন্ন কনটেন্ট ও শেখার সুবিধাও রাখা হয়েছে।

এই ডিভাইসটির প্রধান গবেষক মো. তবিবুল ইসলাম। তিনি মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (এমআইএসটি) বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। ডিভাইসটির ডেভেলপার ও ডিজাইনার অম্লান সরকার। তিনি ফ্লাটার ডেভেলপার ও ইউআই/ইউএক্স ডিজাইনার এবং খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) গবেষণা সহকারী।

উদ্ভাবনের শুরু যেভাবে
২০১৯ সালে মো. তবিবুল ইসলামের নানু স্ট্রোক করেন। স্ট্রোকের এক মাস পর তিনি প্যারালাইজড হয়ে যান। এরপর তিনি আর স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারতেন না। মুখ দিয়ে শব্দের মতো আওয়াজ বের হতো, কিন্তু পরিবারের কেউ সেই শব্দের অর্থ বুঝতে পারতেন না।

প্রিয় একজন মানুষ কিছু বলতে চাইছেন এটা বোঝা গেলেও তিনি আসলে কী বলতে চাইছেন, তা বুঝতে না পারার সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তবিবুল ইসলামের মনে প্রশ্ন আসে, কথা বলতে না পারা একজন মানুষকে কীভাবে নিজের প্রয়োজন জানানোর সুযোগ দেওয়া যায়।

ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬-এ নিজেদের স্টলে ডিভাইসটির প্রধান গবেষক মো. তবিবুল ইসলাম

সেখান থেকেই শুরু হয় তার যাত্রা। পরে এমআইএসটিতে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেওয়ার পর এবং বিভিন্ন স্কুলে কাজ করতে গিয়ে তিনি দেখতে পান, বাংলাদেশে অসংখ্য অটিস্টিক শিশু রয়েছে যারা কথা বলতে সমস্যায় ভুগছে। শুধু যারা একেবারেই কথা বলতে পারে না, তাদের নয়বরং যারা কিছুটা কথা বলতে পারে, যাদের কথা আটকে যায় কিংবা খুব ধীরে বলে তাদেরও যোগাযোগ ও শিক্ষায় বড় ধরনের সমস্যা রয়েছে।

তবিবুল ইসলাম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, এসব শিশু এখনো অনেক ক্ষেত্রে অ্যানালগ ডিভাইস, কমিউনিকেশন বোর্ড কিংবা বই ব্যবহার করে। অথচ সারা বিশ্বে যোগাযোগ ও শিক্ষায় প্রযুক্তিগত পরিবর্তন হচ্ছে। তাদেরও প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করতে না পারলে তারা আরও পিছিয়ে পড়বে এই ভাবনা থেকেই ‘ভয়েস অ্যাসিস্ট’ তৈরির কাজ শুরু করি।

কথা বলতে না পারা শিশুদের জন্য প্রচলিত যোগাযোগের মাধ্যম মূলত পেপারভিত্তিক বা কমিউনিকেশন বোর্ডনির্ভর। কোনো শিশু বাইরে গেলে তার সঙ্গে বড় একটি বই নিয়ে যেতে হয়। সেই বইয়ের বিভিন্ন ছবি দেখিয়ে তাকে জানাতে হয় সে খেতে চায়, পানি চায় কিংবা ওয়াশরুমে যেতে চায়।

কেউ কেউ আবার চাবির রিংয়ের মতো একটি জিনিস ব্যবহার করে, যার মধ্যে অনেকগুলো ছবি থাকে। প্রয়োজন অনুযায়ী সেই ছবি দেখিয়ে শিশুটি নিজের কথা বোঝানোর চেষ্টা করে।

এই বাস্তবতা থেকেই তবিবুল ইসলামের ভাবনায় এলো যদি যোগাযোগ ও শিক্ষার প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো একটি কমপ্যাক্ট ডিভাইসের মধ্যে একসঙ্গে রাখা যায়, তাহলে শিশুদের জন্য সেটি অনেক বেশি সহজ হবে।

তিনি বলেন, প্রথমে সফটওয়্যার তৈরি করি। পরে স্কুলগুলো থেকে বলা হয় সফটওয়্যারটি মোবাইলে ইন্টিগ্রেট করে দিলে শিশুরা অন্য অ্যাপে চলে যেতে পারে যা তাদের জন্য সমস্যার কারণ হতে পারে। এরপর একটি আলাদা ডিভাইস তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। বর্তমানে ট্যাবের মতো যে ডিভাইসটি রয়েছে, সেটিতে সফটওয়্যারটি সরাসরি ইন্টিগ্রেট করা হয়েছে।

‘ভয়েস অ্যাসিস্ট’ ডিভাইস

এক ট্যাপেই জানাতে পারবে সব প্রয়োজন
‘ভয়েস অ্যাসিস্ট’ ডিভাইসে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর দৈনন্দিন জীবনে যোগাযোগের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন বিষয় রাখা হয়েছে। শিশু খাবার খেতে চায়, গোসল করতে চায়, পানি খেতে চায়, টাকা প্রয়োজন কিংবা ফ্যান চালু করতে চায় এ ধরনের প্রয়োজনের জন্য আইকন রয়েছে।

শিশু নির্দিষ্ট আইকনে ট্যাপ করলে অডিও আউটপুট আসে। ফলে শিশুটি কথা বলতে না পারলেও আশপাশের মানুষ বুঝতে পারেন, তার এখন কী প্রয়োজন।

শুধু আগে থেকে তৈরি অপশনই নয়,ব্যবহারকারীর প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন আইকনও যুক্ত করা যায়। পরিবারের সদস্যরা চাইলে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী ছবি তুলে তা ডিভাইসে যুক্ত করতে পারবেন।

তিনি বলেন, এমনভাবে ডিভাইসটি ডিজাইন করেছি যাতে নিজেদের কণ্ঠ রেকর্ড করেও নির্দিষ্ট অপশনের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে শিশুরা। রেকর্ড করা কণ্ঠ সেভ করলে তা ডিভাইসের নির্দিষ্ট লেআউটে নতুন অপশন হিসেবেও যুক্ত হয়ে যায়।
 
শিশুদের স্কুলে সাধারণত ছোট ছোট টেমপ্লেটের মাধ্যমে শেখানো হয় যেমন ‘আমি চাই’। সফটওয়্যার ব্যবহারের পর শিক্ষকেরা এই নির্মাতাদের জানান, তারা যদি নিজেদের মতো ছোট ছোট বাক্য তৈরি করে শিশুদের শেখাতে পারেন, তাহলে শেখানোর প্রক্রিয়াটি আরও কার্যকর হবে।

সেই চাহিদা অনুযায়ী ‘ভয়েস অ্যাসিস্ট’ ডিভাইসে ছোট বাক্য তৈরির সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে। শিক্ষকরা তাদের লেসন প্লান অনুযায়ী বাক্য তৈরি করে শিশুদের শেখাতে পারবেন। প্রয়োজন শেষ হলে সেগুলো মুছেও দেওয়া যাবে। ফলে ডিভাইসটি শুধু শিশুর মৌলিক প্রয়োজন পূরণে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে নয়, ধীরে ধীরে বাক্য গঠন ও যোগাযোগ শেখানোর মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহার করা হবে।

তিনি আরও বলেন, যোগাযোগের পাশাপাশি শিক্ষার জন্যও বিভিন্ন কনটেন্ট যুক্ত করা হয়েছে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুরা অ্যানিমেশন পছন্দ করে। স্কুলগুলোর কাছ থেকে এমন মতামত পাওয়ার পর শিক্ষামূলক কনটেন্টে অ্যানিমেশন যুক্ত করেছি। এতে স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ ও ইংরেজি শেখার কনটেন্ট রয়েছে। লেখার অনুশীলনের সুবিধাও রাখা হয়েছে। গণিত শেখানোর একটি অংশও যুক্ত করার কাজ চলছে।

ফলে যে ডিভাইসের মাধ্যমে একটি শিশু ‘আমি পানি চাই’ বলতে পারছে, একই ডিভাইস ব্যবহার করে সে অক্ষর, ইংরেজি কিংবা অন্যান্য শিক্ষামূলক বিষয় শেখার সুযোগও পাচ্ছে।

ডিভাইসটি ব্যবহারের শুরুতে শিক্ষক শিশুকে শেখান। কয়েকবার দেখিয়ে দেওয়ার পর শিশুরা নিজেরাই এটি ব্যবহার করতে পারে বলে জানান এই গবেষক।

পাইলটিংয়ের সময় একাধিকবার বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। তার অভিজ্ঞতায়, ডিভাইসটির প্রতি শিশুদের আগ্রহ ও উৎসাহ ছিল উল্লেখযোগ্য। তারা নিজেরাই এটি ব্যবহার করতে আগ্রহ দেখিয়েছে।

বর্তমানে দুটি স্কুলে ‘ভয়েস অ্যাসিস্ট’ ব্যবহার করা হচ্ছে। ঢাকার প্রয়াসে পাইলটিংয়ের পর পাঁচটি ডিভাইস বিক্রি করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে পাঁচটি শ্রেণিকক্ষে এগুলো ব্যবহার হচ্ছে।

সেখান থেকে পাওয়া মতামতের ভিত্তিতে সফটওয়্যারেও ধারাবাহিকভাবে উন্নয়ন করা হচ্ছে। শিক্ষকেরা তাঁদের লেসন প্ল্যান অনুযায়ী শিশুদের পড়ানোর সুবিধা চেয়েছেন। ছোট শিশুদের শেখার আগ্রহ বাড়াতে অ্যানিমেশন যুক্ত করার পরামর্শও দিয়েছেন তাঁরা।

এসব মতামতের ভিত্তিতে সফটওয়্যারে ইতোমধ্যে দুই দফা উন্নয়ন করা হয়েছে। আরও প্রায় ১০টি স্কুলে স্বল্প সময়ের মধ্যে ডিভাইস সরবরাহের বিষয়ে আলোচনা চলছে বলে জানান গবেষক।

শেখার অগ্রগতি দেড় গুণ দাবি করে এই গবেষক বলেন, দুটি স্কুলে গবেষণামূলকভাবে ডিভাইসটি ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের শেখার অগ্রগতির বিষয়ে ইতিবাচক ফল পেয়েছি। কারণ প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় যে লার্নিং গ্রোথ  দেখা যায়, তার তুলনায় প্রায় দেড় গুণ লার্নিং গ্রোথ পাওয়া গেছে আমাদের ডিভাইস ব্যবহার করে।

ইন্টারনেট সংযোগ ছাড়াই মিলবে সুবিধা
ডিভাইসটি ব্যবহারে ইন্টারনেট সংযোগের প্রয়োজন হয় না। সফটওয়্যার সরাসরি ডিভাইসে ইন্টিগ্রেট করা থাকে। শুধু চার্জ দিয়েই এটি ব্যবহার করা যায়।

বর্তমানে একটি ডিভাইস তৈরিতে প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে বলে জানান গবেষক। তবে বিভিন্ন হার্ডওয়্যার, বিশেষ করে প্রসেসরের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ আগের তুলনায় প্রায় দেড় গুণ বেড়েছে।

বাজারে বড় পরিসরে আনা হলে ডিভাইসটির সম্ভাব্য দাম ২২ থেকে ২৫ হাজার টাকার মধ্যে হতে পারে বলে জানান তিনি।

ডিভাইসটির সফটওয়্যার অংশে কাজ করেছে গবেষক দল। বড় পরিসরে উৎপাদনের প্রয়োজন হলে হার্ডওয়্যার তৈরিতে ওয়ালটনের সঙ্গে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

গবেষকের ভাষ্য অনুযায়ী, এমআইএসটির সঙ্গে ওয়ালটনের সমঝোতা রয়েছে। বিভিন্ন স্কুল থেকে বড় পরিসরে চাহিদা এলে প্রয়োজন অনুযায়ী হার্ডওয়্যার তৈরি করে দেওয়ার বিষয়ে ওয়ালটনের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।

প্রায় আড়াই বছর ধরে ডিভাইসটি নিয়ে কাজ করছেন তবিবুল ইসলাম। এখন তিনি এতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুবিধা যুক্ত করার পরিকল্পনা করছেন। তবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের নিয়ে কাজ হওয়ায় ধাপে ধাপে এগোতে চান তিনি। তার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য শুধু শিশুদের যোগাযোগ ও শিক্ষায় সহায়তা করা নয় বরং তাদের ভবিষ্যতে মূলধারার কর্মক্ষেত্রে কাজ করার উপযোগী করে তোলা।

তবিবুল ইসলাম বলেন, কোনো শিশু যদি ভবিষ্যতে সুপারশপে কাজ করতে পারে, তাহলে সেই কর্মক্ষেত্রের সফটওয়্যার ব্যবস্থাকেও শিশুটির উপযোগী করে এই ডিভাইসের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে।

এজন্য অর্থ শনাক্ত করা কিংবা প্রয়োজনীয় তথ্য বুঝতে পারার মতো প্রযুক্তি যুক্ত করবো যাতে একজন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুও ধীরে ধীরে মূলধারার কর্মক্ষেত্রে কাজ করার সুযোগ পেতে পারে।

এই লক্ষ্যেই ডিভাইসটির সফটওয়্যার ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে এই গবেষকের।

বিস্তৃত ব্যবহারের প্রত্যাশা
ইতোমধ্যে দুটি স্কুলে ডিভাইসটির ব্যবহার শুরু হয়েছে এবং আরও ১০টি স্কুলের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা চলছে গবেষকের। তবে সারা দেশের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের কাছে প্রযুক্তিটি পৌঁছে দিতে সরকারি সহযোগিতাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন তিনি।

এই গবেষক বলেন, সরকারের বিভিন্ন শিশু প্রতিভা বিকাশ কেন্দ্রসহ বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে এ ধরনের ডিভাইস ব্যবহার করা গেলে এর সুফল আরও বিস্তৃতভাবে পাওয়া সম্ভব।