দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ ঔষধি উদ্ভিদের ডাটাবেজ তৈরি করল বাংলাদেশি গবেষকরা
বাংলাদেশের গবেষকরা দীর্ঘ দুই বছরের নিরলস প্রচেষ্টায় নির্মাণ করেছেন দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম ঔষধি উদ্ভিদ ফাইটোকেমিক্যাল ডাটাবেজ। দেশের প্রথম বায়োইনফরম্যাটিক্স প্রতিষ্ঠান ডন অব বায়োইনফরম্যাটিক্স লিমিটেডের (ডিওবি) উদ্যোগে তৈরি এই ডাটাবেজটির নামকরণ করা হয়েছে- বাংলাদেশ মেডিসিনাল প্ল্যান্টস অ্যান্ড ফাইটোকেমিক্যালস ডাটাবেজ (বিএমপিপিডি)।
৭০০-এরও অধিক ঔষধি উদ্ভিদ প্রজাতি এবং প্রায় ৬৩ হাজার ভিন্ন ভিন্ন রাসায়নিক যৌগ (ফাইটোকেমিক্যাল) নিয়ে গঠিত এই তথ্যভাণ্ডার দক্ষিণ এশিয়ায় এ ধরনের যেকোনো উদ্যোগের মধ্যে সবচেয়ে বিস্তৃত বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট গবেষকেরা। বাংলাদেশের বিজ্ঞান গবেষণায় এটিকে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
গবেষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ায় এর আগে কোনো ডাটাবেজে এত বেশিসংখ্যক উদ্ভিদের রাসায়নিক যৌগ একসঙ্গে রাখা হয়নি। বিএমপিপিডিতে থাকা অনেক যৌগ শরীরে সক্রিয়ভাবে কার্যকর বায়োঅ্যাকটিভ পদার্থ, যেগুলো ভবিষ্যতে নতুন ওষুধ আবিষ্কারে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশ্বের অনেক জীবনরক্ষাকারী ওষুধই উদ্ভিদ থেকে পাওয়া যৌগের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে। আধুনিক বায়োইনফরম্যাটিক্স টুল ব্যবহার করে বিএমপিপিডির যৌগগুলোর গুণাগুণ, ওষুধ হিসেবে ব্যবহারযোগ্যতা এবং চিকিৎসায় সম্ভাবনা দ্রুত ও কম খরচে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে, যা পুরোনো গবেষণা পদ্ধতির তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর।
এতদিন দক্ষিণ এশিয়ায় এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ডাটাবেজ হিসেবে স্বীকৃত ছিল ভারতের আইএমপিপিএটি ২.০, যেখানে প্রায় ১৭ হাজার ৯৬৭টি ফাইটোকেমিক্যাল যৌগ রয়েছে। বিএমপিপিডি সেই সংখ্যাকে প্রায় সাড়ে তিন গুণ ছাড়িয়ে ৬৩ হাজার ইউনিক যৌগ নিয়ে আঞ্চলিক গবেষণায় নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে। বর্তমানে দেশের ৪৫টিরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের জন্য এটি একটি মূল্যবান ওপেন রিসোর্স হিসেবে কাজ করছে।
ডাটাবেজটি ইতোমধ্যে কম্পিউটারভিত্তিক ওষুধ আবিষ্কার, উদ্ভিদের রাসায়নিক যৌগ পরীক্ষা (ফাইটোকেমিক্যাল স্ক্রিনিং) এবং লোকজ চিকিৎসার বৈজ্ঞানিক গবেষণায় (এথনোফার্মাকোলজি) সক্রিয়ভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। দেশের ৪৫টিরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের জন্য এটি একটি মূল্যবান ওপেন রিসোর্স হিসেবে কাজ করছে।
ডিওবির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এসকে ফয়সাল আহমেদ বলেন, প্রকৃতি শুরু থেকেই যে ভাষায় কথা বলে এসেছে, তারই আধুনিক বৈজ্ঞানিক রূপ হলো বায়োইনফরম্যাটিক্স। বিএমপিপিডির প্রতিটি যৌগের মাঝে লুকিয়ে আছে একেকটি সম্ভাব্য জীবনরক্ষাকারী ওষুধ। দক্ষিণ এশিয়ার ঔষধি ঐতিহ্যকে বায়োইনফরম্যাটিক্সের শক্তিতে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার সময় এসেছে এবং সেই যাত্রা বাংলাদেশ থেকেই শুরু হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ডন অব বায়োইনফরম্যাটিক্স লিমিটেড বাংলাদেশের প্রথম বায়োইনফরম্যাটিক্স প্রতিষ্ঠান। ঢাকা ও চট্টগ্রামে কার্যক্রম পরিচালনাকারী এই প্রতিষ্ঠানটি চারটি বিশেষায়িত বিভাগ— ডিবিএস, আইবিএআই, ডন আই ল্যাব এবং বিএসডিএসর মাধ্যমে দেশের ১২ শতাধিক শিক্ষার্থী ও শিক্ষক এবং ৪৫টিরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে কাজ করে চলছে। শতাব্দীপ্রাচীন ঔষধি জ্ঞানকে বায়োইনফরম্যাটিক্সের মাধ্যমে আধুনিক বিজ্ঞানের ভাষায় রূপান্তর করাই এই প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য।