হতাহতদের জন্য প্রার্থনা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই
নেপালের তিব্বত সীমান্তসংলগ্ন হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও ধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫৭৯ জনে দাঁড়িয়েছে। দেশটির জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের (এনডিআরআরএমএ) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যের বরাতে বিবিসি জানিয়েছে, আজ শুক্রবার (২৮ আগস্ট) সন্ধ্যা পর্যন্ত নিখোঁজ বা যোগাযোগবিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিলেন অন্তত ১৯২৪ জন। তাদের মধ্যে ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক। এর আগে গত বুধবার (২৬ আগস্ট) সকালে নেপাল-চীন সীমান্তের কাছাকাছি রাসুয়া জেলার তিমুরে ও স্যাফ্রুবেশি এলাকায় ভোতেকোশি নদীতে আকস্মিক ও শক্তিশালী বন্যা দেখা দেয়।
এ ঘটনায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজে লেখাপড়া করতে আসা নেপালি শিক্ষার্থীরা। তারা বলছেন, মর্মান্তিক এ ঘটনায় অনেক আত্মীয়-স্বজন হারিয়েছে। এ শোক প্রকাশ করার মতো না। দেহটা বাংলাদেশের থাকলেও মনটা পড়ে আছে আত্মীয়-স্বজন ও পরিবারের লোকজনের কাছে। এই মুহূর্তে হতাহতদের জন্য প্রার্থনা করা ছাড়া বাংলাদেশি মানুষের কাছে আর কোনো উপায় নেই বলে তারা জানিয়েছেন।
ওয়ার্ল্ড ওয়াইড নেপালিজ স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন-বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের এমবিবিএস শেষ বর্ষের ছাত্র মুন্না ইয়াদব দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, নেপালের ঘটনা অনেক মর্মান্তিক। আমার বাড়ি ঘটনাস্থল থেকে ৩০০ কি.মি. দূরে হওয়ার কারণে আমার পরিবার বেঁচে যায়। কিন্তু আমার কয়েকজন আত্মীয় ও বন্ধুর মা-বাবা মারা গেছেন। তারা অনেক কষ্টে আছেন। অন্তত ৬০০ মানুষ মিসিং আছে।
তিনি বলেন, দেশে চলমান অনেকগুলো প্রকল্প ছিল। কয়েকটি পাওয়ার প্লান্ট ধ্বংস হওয়ার পাশাপাশি সেখানে অবস্থানরত মানুষগুলো নিখোঁজ আছে। আমাদের দেশের মানুষগুলো ছাড়াও পর্যটকরা বেশি নিহত হয়েছেন। বর্তমানে আমাদের দেশের সরকার উদ্ধারের কাজ করে যাচ্ছেন। বিভিন্ন দেশের সরকার আমাদের দেশকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। আমরা চাই খুব তাড়াতাড়ি নেপাল এ সংকট কাটিয়ে উঠবে।
বাংলাদেশে অবস্থানরত নেপালি এই ছাত্রনেতা আরও বলেন, বিভিন্ন দেশ সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে, আর্থিক সহায়তাও দিয়েছে। বাংলাদেশের সংসদে প্রার্থন করা হয়েছে হতাহতদের জন্য, আমি নিউজে দেখেছি। বাংলাদেশ সরকার বা জনগণের কাছে আর কোনো আবেদন নেই, শুধু প্রার্থনা করা ছাড়া—যাতে দ্রুত রিকভারি হয়।
ঢাকা ডেন্টাল কলেজের বিডিএস ব্যাচের নেপালি শিক্ষার্থী বিশ্বাস প্যাডেল বলেন, নেপালে আমার বাসা ঘটনাস্থল থেকে একটু দূরে। কিন্তু যে নদীগুলো, যেখানে বন্যা হয়েছে, সে নদীগুলো আমার এলাকা হয়েই যায়। আমাদের একটু ক্ষয়ক্ষতি কম হয়েছে। অনেকেরই পরিবার সেফ আছে।
তিনি আরও বলেন, যতটুকু আমি জানি, সবাই সেফ আছে। যদি প্রার্থনা করতে পারেন, প্রার্থনা করবেন। আর বাংলাদেশ গভর্নমেন্টকে কিছু বলার তো নাই। যদি আপনারা আর্থিক দিক থেকে একটু হেল্প করতে চান, তাহলে করতে পারবেন।
হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্স অনুষদের ২০তম ব্যাচের নেপালি শিক্ষার্থী নিশান্ত নিউরে বলেন, আমার বাড়ি বন্যাকবলিত এলাকা থেকে দূরে, তাই আমার পরিবার নিরাপদে আছে। তবে বন্যাকবলিত এলাকায় পরিস্থিতি খুবই খারাপ ছিল। এখন পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসছে। তবে নদীর বিভিন্ন স্থান থেকে এখনও মরদেহ উদ্ধার করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ৫৩৩ জনে দাঁড়িয়েছে। যারা এখনও নিখোঁজ কিংবা টানেলের ভেতরে আটকা পড়ে আছেন, তাদের উদ্ধারে দিন-রাত উদ্ধার অভিযান চলছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অনুষদের নেপালী শিক্ষার্থী জারুরি পাচাই বলেন, আজ অত্যন্ত ভারাক্রান্ত মন নিয়ে দাঁড়িয়েছি। আমার জন্মভূমি নেপালে সম্প্রতি ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসেছে। আমরা অগণিত মানুষকে হারিয়েছি। বহু পরিবার এখন আশ্রয়হীন, অসহায় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। নিহতদের ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তবে যারা বেঁচে আছেন, তাদের এখন বেঁচে থাকার মৌলিক লড়াই করতে হচ্ছে। এ অবস্থায় শুধু সহানুভূতি প্রকাশ যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন বাস্তব সহায়তা। সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে এগিয়ে এসে অনুদান বা সহায়তা তহবিল গঠনে অংশ নিলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে তা ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক নেপালি শিক্ষার্থী অ্যাঞ্জেল গুরুং বলেন, নেপালের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে তারা অবগত এবং এ ঘটনায় গভীরভাবে মর্মাহত। বাংলাদেশে অবস্থান করায় সরাসরি ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব না হলেও বিভিন্নভাবে তাদের সঙ্গে সংযুক্ত থাকার এবং সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছেন তারা। এ সময় নেপালের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অ্যান্ড এনিমেল সায়েন্সেস বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের নেপালি শিক্ষার্থী সুমিত বলেন, আমাদের পাঁচশোর অধিক মানুষ মারা গেছে। হাজারেরও বেশি মানুষের এখনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। লাশগুলো দেখে খুবই খারাপ লাগছে। কারো শরীর থেকে উপর পাওয়া যাচ্ছে, কারো শুধু মাথা পাওয়া যাচ্ছে, এটার জন্য খুবই খারাপ লাগতেছে।
‘‘আমাদের সরকার আমাদেরকে সাহায্য করতেছে বাইরের বিভিন্ন দেশ থেকে আমাদেরকে ডোনেশন করতেছে। বাংলাদেশ সরকার যদি ডোনেশন করতো তাহলে ভালো লাগত। সরকার যদি আমাদেরকে বিপদে সাহায্য করতো তাহলে আমরাও কোনো বিপদে পড়লে সাহায্য করতাম।’’
এই প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন ঢাবি, বাকৃবি, রাবি ও হাবিপ্রবি প্রতিনিধি