জবি-ন্যাশনাল মেডিকেলে দফায় দফায় সংঘর্ষ, আহত অন্তত ৭০
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজ সেনাবাহিনীর নিকট হস্তান্তরসহ সমসাময়িক বিষয় নিয়ে প্লাকার্ড প্রদর্শনী অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল, ছাত্রশিবির এবং ছাত্রশক্তির নেতাদের মধ্যে দফায় দফায় হামলার ঘটনা ঘটেছে। এক পর্যায়ে ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল হাসপাতালে ঢুকে আহতদের উপরও হামলার অভিযোগ উঠেছে ছাত্রদল নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে।
জানা যায়, জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬ উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে অতিথি হিসেবে ছিলেন ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ। এই অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দাবিতে ইউজিসি চেয়ারম্যানের সামনে প্লাকার্ড নিয়ে দাড়াতে চান জকসু এবং ইনকিলাব মঞ্চের নেতারা।
প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, এসময় প্লাকার্ড নিয়ে দাঁড়ানো শিক্ষার্থীদের বাধা দেন শাখা ছাত্রদলের নেতারা। এক পর্যায়ে প্লাকার্ড নিয়ে অডিটোরিয়ামের বাইরে অবস্থান নেন তারা। সেখানে তাদের ওপর হামলা চালান ছাত্রদল নেতা-কর্মীরা। এ সময় কয়েকজন শিক্ষকও হেনস্তার শিকার হন।
এ ঘটনার পর, কয়েকদফা হামলার ঘটনার ঘটে। এক পর্যায়ে শিবির ও ছাত্রশক্তির নেতাদের ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেন ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা।
এতে আহত হন জকসুর ভিপি রিয়াজুল, জিএস আব্দুল আলিম আরিফ, এজিএস মাসুদ রানা, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পাদম নূর মোহাম্মদ, সদস্য আব্দুল্লাহ আল ফারুক, মেহেদী হাসান। আরো আহত হন জবি ছাত্রশক্তির সভাপতি শাহীন মিয়া, সেক্রেটারি ফেরদৌস শেখ, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সভাপতি ইভান তাহসিব, সাংবাদিক কামরুজ্জামান কায়েস, আব্দুল্লাহ আল মামুন সহ আরো অনেকে।
অন্যান্যদের মধ্যে আরো আহত হয়েছে শিবির নেতা রাকিবুল, ছাত্রদল নেতা আরমান, ছাত্রশক্তির নেতা জাবির খান সহ অন্তত ৭০ জন।
পরবর্তী দুপুর আড়াইটা থেকে বিকেল সাড়ে চারটার মধ্যে কয়েক দফা ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ঢুকে পড়েন ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা। এসময় হাসপাতালের ইমার্জেন্সি কক্ষে ঢুকে এলোপাতাড়ি পেটাতে থাকেন তারা। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত, হাসপাতালের সামনে বাড়তি পুলিশ মোতায়েন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে পুলিশ।
জকসুর জিএস ও জবি ছাত্রশবিরের সভাপতি আব্দুল আলিম আরিফ বলেন, ছাত্রদল শিক্ষার্থীদের উপর নগ্নভাবে হামলা চালিয়েছে। সাধারণ শিক্ষার্থী, জকসু নেতা, শিবির, ছাত্রশক্তির নেতাদের উপর ন্যাক্কারজনক হামলা চালিয়েছে। তারা এভাবে ক্যাম্পাসগুলোতে ত্রাসের রাজনীতি কায়েম করতে চায়।
এমনকি চিকিৎসা নিতে আসা আহতদের উপরও তারা ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে ঢুকে নগ্নভাবে হামলা চালানো হয়েছে। দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজ সেনাবাহিনী করলে তাদের টেন্ডারবাজির রাজনীতি বিঘ্ন হবে তার জন্য এই হামলা করেছে তারা।
ছাত্রশক্তির কেন্দ্রীয় নেতা ও জবি শিক্ষার্থী জাবির খান বলেন, ইনকিলাব মঞ্চের নেতারা প্লাকার্ড প্রদর্শন করতে গেলে ছাত্রদল বাধা দেয়। তারা যখন বাইরে এটা নিয়ে বসে তখন হামলা চালায়। জুলাই পরবর্তী বাংলাদেশে আমরা এটা চাইনি। টোকাই বাহিনী নিয়ে ইমার্জেন্সির ভেতরে ঢুকে মারছে। আহত চিকিতসাও নিতে দেয়নি তারা।
এদিকে এঘটনায় জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে শাখা ছাত্রদল। ছাত্রদল বলছে, বেরোবিতে ছাত্রদলের উপর পরিকল্পিত মব কবে শিবির। একই মব জবিতে করতে চেয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধের সম্মুখীন হয় শিবির। তারা দীর্ঘ অর্ধ বছর পরিকল্পিত কারচুপির মাধ্যমে জকসুর একাংশ দখল করে শীতনিদ্রায় যায়। শিক্ষার্থীদের উন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের স্বার্থ এবং শিক্ষার্থীদের পক্ষে না দাঁড়িয়ে আবাসন সংকট নিরসনের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় এবং মব করার চেষ্টা করে। আবাসন সংকট নিরসন জবি শিক্ষার্থীদের প্রাণের দাবি।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে আরো বলা হয়, যখন দুটি হলের কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর তৃতীয় আরেকটি হল জেলখানার বিপরীত পাশে বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ করার চেষ্টা চালাচ্ছে, ঠিক তখনই শিবির শিক্ষার্থীদের প্রাণের দাবির বিরুদ্ধে মব করার চেষ্টা করে। শিক্ষার্থীবৃন্দ ছাড় পোকার কামড় খেয়ে এবং মেসে মানবেতর জীবনযাপন করে মারাত্মকভাবে হতাশ এবং জকসুর একাংশের প্রতি ব্যাপকভাবে ক্ষুব্ধ। যখন তারা মব করতে যায়, শিক্ষার্থীবৃন্দ তাদেরকে সরাসরি প্রতিরোধ করে।
এ বিষয়ে শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব সামছুল আরেফিন বলেন, হলের অধিকার থেকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বঞ্চিত করতে পুরোনো মব কালচার আমদানির চেষ্টা করছে শিবির। শিক্ষার্থীবৃন্দ তা রুখে দিয়েছে।
তিনি আরো বলেন, জকসুর ব্যর্থতা ও সারা বাংলাদেশের জামায়াত-শিবিরের অপকর্ম ঢাকার জন্য তারা এসব করছে। আমরা যখন দেখি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) তারা মব করার চেষ্টা করছে, একইভাবে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়েও তারা মব করার চেষ্টা করছে।
এদিকে এঘটনায় অফিসিয়াল বিবৃতি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তারা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিবাচক ভাবমূর্তি ও উন্নয়নের স্বার্থে সকলের সংযত, দায়িত্বশীল ও শৃঙ্খলাপূর্ণ আচরণ প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে লক্ষ করা যায় যে, অনুষ্ঠান চলাকালে কতিপয় শিক্ষার্থীদের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও হামলার ঘটনা ঘটে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ ধরনের ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে।
ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সমাজকর্ম বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোস্তফা হাসানকে আহ্বায়ক করে চার সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তদন্ত কমিটিকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।