১৭ জুলাই ২০২৬, ২০:৩৫

এসএসসি পরীক্ষার ফল ভবিষ্যতের কতটা পথ নির্ধারণ করে?

ফল পেয়ে শিক্ষার্থীদের উল্লাস  © ফাইল ছবি

মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট বা এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যেই উদ্বেগ কাজ করে। জীবনের প্রথম এই পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল পরবর্তী শিক্ষা ও কর্ম জীবনের 'মৌলিক ভিত্তি' হিসেবেও কাজ করে।

এবছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল সামনের সপ্তাহে প্রকাশিত হতে পারে বলে ধারণা পাওয়া গেছে। আগামী ২০শে ‍জুলাইকে লক্ষ্য করে ফল প্রস্তুতের কাজ চলছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পরবর্তী ধাপের শিক্ষা গ্রহণের জন্য যেমন এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি কিছু ক্ষেত্রে সরকারি চাকরিতে আবেদনের জন্যেও প্রয়োজন ন্যূনতম একটি ফলাফল।

এই পরীক্ষাটির ফল পরবর্তী জীবনের পাথেয় নির্ধারণে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলেই মত শিক্ষাবিদদের। তবে অনেক সময় নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল না এলেও শিক্ষার্থীদের নিরুৎসাহিত না হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা।

তারা বলছেন, নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে পরীক্ষার ফলাফল জরুরি হলেও, বিশেষ উদ্দেশ্য সামনে রেখে নিজেকে গড়ে তোলার জন্য অন্যান্য দক্ষতা অর্জনে মনোযোগ ও পরিশ্রম দেওয়া গেলে লক্ষ্য পূরণ সম্ভব।

উচ্চাশিক্ষার ক্ষেত্রে জরুরি
শিক্ষাবিদরা বলছেন, বাংলাদেশে স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে পরবর্তী সব শিক্ষার ভিত্তি হিসেবে এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই পরীক্ষার রেজাল্টের মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থীকে মূল্যায়ন করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, টেন্ডেসিটা দেখা হয় যে সে (শিক্ষার্থী) কোন জায়গায় ভালো করছে বা কোন বিষয়ে আগ্রহ আছে, কোন জায়গায় দুর্বলতা আছে। বাংলাদেশে মাধ্যমিক ও এসএসসি বা সমমান পরীক্ষার ফলাফলের ওপর নির্ভর করে যে একজন শিক্ষার্থী পরবর্তী ধাপে কোন প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষালাভ করতে পারবে।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বর্তমানে বাংলাদেশে একাদশ শ্রেণির ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অনলাইনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। সেক্ষেত্রে উচ্চমাধ্যমিকে কোনো শিক্ষার্থী কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ পাবে তা নির্ধারণ করা হয় তার ফলাফলের স্কোরের ভিত্তিতে।

এসএসসি বা সমমান পরীক্ষার প্রাপ্ত জিপিএ ও মোট নম্বরের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের মেধা তালিকা তৈরি করা হয়, আর সেই নম্বর ও শিক্ষার্থীর পছন্দের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকা থেকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসন বরাদ্দ দেওয়া হয়। অর্থাৎ, একজন শিক্ষার্থীর কাছে তখনই তার পছন্দের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্বাচনের সুযোগ বেশি থাকবে যখন তার ফলাফল অন্যদের চেয়ে এগিয়ে থাকবে।

একইভাবে উচ্চ মাধ্যমিক বা এইচএসসি পরীক্ষার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য উচ্চ মাধ্যমিকের ফলাফল যেমন জরুরি, তেমনি এসএসসি পরীক্ষার নম্বরও এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি প্রক্রিয়ায় মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক এই দুই পরীক্ষার ফলাফল বা জিপিএ'র ওপর নির্দিষ্ট নম্বর যুক্ত হয়। যেমন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার আবেদনের জন্য দুই পরীক্ষার জিপিএ'র যোগফল বিজ্ঞান শাখায় ন্যূনতম আট, আর মানবিক ও বাণিজ্য শাখায় ন্যূনতম সাড়ে সাত হওয়া জরুরি। আবার বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) বা মেডিক্যালে পড়ার আবেদন করতে হলে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে মোট জিপিএ ১০ থাকতে হয়।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. আবদুস সালাম বলেন, এক হলো যে তাদের মৌলিক শিক্ষার ভিত্তি গড়ে ওঠা, একইসাথে তারা আবার কলেজ জীবনে উত্তীর্ণ হয় এবং উচ্চশিক্ষার মধ্যে প্রবেশ করে।

ফলে বোঝাই যাচ্ছে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পরবর্তী ধাপের শিক্ষা জীবনের জন্য এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এছাড়াও এসএসসি পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীরা সরকারি ও বেসরকারি বৃত্তিও পায়।

ডিপ্লোমা ও কারিগরি শিক্ষার ক্ষেত্রে
অনেক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা না নিয়ে কারিগরি দিকে দক্ষতা অর্জনে আগ্রহী থাকেন। তাদের জন্য বাংলাদেশে ডিপ্লোমা ও কারিগরি শিক্ষার সুযোগ আছে। তবে সেক্ষেত্রেও থাকে এসএসসি পরীক্ষায় ন্যূনতম ফলাফলের বিধি।

নিয়ম অনুযায়ী, কারিগরি বোর্ডে চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা পর্যায়ের ভর্তির আবেদনের জন্য এসএসসি বা সমমান পরীক্ষায় ন্যূনতম জিপিএ দুই দশমিক পাঁচ থাকতে হয়। যদিও কোর্স অনুযায়ী ফলাফলের চাহিদা কখনও কখনও বাড়তে বা কমতে পারে।

আবার সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ভর্তির জন্য প্রার্থীর সামগ্রিক জিপিএ এবং গণিতে আলাদা জিপিএ তিন বা তার বেশি প্রয়োজন হতে পারে। সেক্ষেত্রে সাধারণ ও কোটার পার্থক্যও আবার একটি ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে।

কর্মজীবনে গুরুত্ব
শিক্ষাখাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে শিক্ষাজীবনের সাথে কর্মজীবনের সংস্পর্শ কম। ফলে কর্মজীবনে এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলের সরাসরি ভূমিকা 'সীমিত'। তা সত্ত্বেও এটি একটি 'ভিত্তি' হিসেবে কাজ করে বলে মনে করেন খাত সংশ্লিষ্টরা। কারণ এই ভিত্তি না থাকলে শিক্ষার্থীরা কর্মসংস্থান করতে পারবে না।

অধ্যাপক সালাম বলেন, গবেষণায়ও দেখা গেছে যে মৌলিক শিক্ষার ক্ষেত্রে অর্জন পরবর্তীতে কর্মজগতেও বড় প্রভাব রাখে। তবে, শিক্ষাজীবনের মতো কর্মজীবনে এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল সরাসরি ভূমিকা না রাখলেও নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে এসএসসির ন্যূনতম ফলাফল প্রয়োজন হয়। যেমন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার ক্ষেত্রে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার জন্য জারিকৃত বিজ্ঞপ্তিতে সাধারণত এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ন্যূনতম একটি ফলাফল চাওয়া হয়। তবে বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভাগভেদে এই চাহিদা কমবেশি হয়ে থাকে। তবে প্রায়ই আলোচনায় থাকা বাংলাদেশে সরকারি কর্ম কমিশন বা বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্যে এসএসসি পরীক্ষার ন্যূনতম কোনো ফলাফল থাকা জরুরি নয়।

২০২৫ সালের নভেম্বরে ৫০ তম বিসিএস পরীক্ষার জন্য দেওয়া বিজ্ঞপ্তিতে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার জন্য সুনির্দিষ্ট ফলাফল চাওয়া হয়নি। তবে বলা হয়েছে, ‘কোনো প্রার্থীর শিক্ষা জীবনে একাধিক তৃতীয় বিভাগ/শ্রেণি বা সমমানের জিপিএ থাকলে তিনি যোগ্য বিবেচিত হবেন না’।

শিক্ষাগত যোগ্যতার পরিমাপক
বাংলাদেশের যেকোনো শ্রেণি-পেশার মানুষের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতার পরিমাপক এই এসএসসি পরীক্ষার সনদ। ফলে, এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল যেমন অনেক শিক্ষার্থীর পরবর্তী জীবনে ভূমিকা রাখে, তেমনি এই পরীক্ষার সার্টিফিকেটটিও 'ব্লু কলার জব' বা তথাকথিত শহুরে খেটে খাওয়া মানুষের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রমাণপত্রেরও কাজ করে। বিভিন্ন ধরনের কাজের লাইসেন্স বা সনদের জন্যেও এই পরীক্ষার ফলাফল কাজে লাগে।

এ বিষয়ে অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেন, এসএসসি ফলাফল কাগজে-কলমে বেসিক (মৌলিক) শিক্ষার প্রাথমিক ধাপ পূরণ হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হয়। যদিও আদৌ সেটা কতটুকু পেল কিংবা পেল না, সেটা ভিন্ন আলাপ। যেমন তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির চাকরিতে পরীক্ষা দেওয়ার জন্য এসএসসির ফলাফল কাজে লাগে।

এছাড়া বাংলাদেশের বৈদেশিক আয়ের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন প্রবাসী কর্মীরা, যাদের অনেকেই শ্রমিক হিসেবে বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করেন। তাদের জন্যেও সরকারিভাবে শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রমাণপত্র হিসেবে কাজ করে এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল। প্রাথমিক এন্ট্রি তো পায়ই, সাথে প্রমাণ করতে পারে যে সে শিক্ষিত।

এসএসসি বা সমমানের পরীক্ষা বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে অনুষ্ঠিত হয়। লাখ লাখ শিক্ষার্থী সেই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। কিন্তু সব শিক্ষার্থীর পক্ষে একই পরিবেশ-পরিস্থিতিতে পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব না। বিশেষ করে অনেক শিক্ষার্থীর জন্যেই এটি জীবনের প্রথম কোনো পাবলিক পরীক্ষায় বসার অভিজ্ঞতা থাকে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এক ধরনের মানসিক চাপও থাকে।

ফলাফলের বিষয়ে অধ্যাপক মো. আবদুস সালাম বলেন, পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ও ফল মেনে নেওয়ার বিষয়গুলোকে উৎসাহের পর্যায়ে না নিয়ে গেলে শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়, যেটা অনেক সময় তাদের নেতিবাচক আচরণের দিকে নিয়ে যেতে পারে। পরীক্ষার কাঙ্ক্ষিত ফলাফল না এলেও শিক্ষার্থীদের যেমন ধৈর্য ধরা প্রয়োজন, অভিভাবকদেরও তাদের পাশে থাকা উচিত।

তিনি আরও বলেন, অনেক সময় শারীরিক, পারিবারিক বা পারিপার্শ্বিক নানা কারণে কোনো কোনো শিক্ষার্থীর পরীক্ষা ভালো দিতে না পারা এবং ফলাফলে তার ছাপ পড়ার শঙ্কা থাকে। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের হতাশ বা নিরুৎসাহিত হওয়া যাবে না। শিক্ষাক্ষেত্রের পরবর্তী ধাপে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকে।
অনেকেই আছে এসএসসিতে একটু খারাপ ফলাফল হলেও ইন্টারমিডিয়েটে গিয়ে আরও ভালো ফলাফল করে। আবার অনেকে এসএসসিতে ভালো ফল করলেও পরবর্তী জীবনে সফল নাও হতে পারে।

নির্দিষ্ট লক্ষ্য সামনে রেখে পড়াশোনার পাশাপাশি পাঠ্যক্রমের বাইরেও নানা কার্যক্রমের সাথে যুক্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা, নানা রকম দক্ষতা অর্জন কর্মজীবনে বিশেষ সুবিধা দিতে পারে। এমনকি দেশের বাইরে পড়তে যাবার ক্ষেত্রেও এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিস বা লেখাপড়ার বাইরে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ভূমিকার বিষয়টি উঠে এসেছে বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীদের অনেকের প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা